মনে পড়ে গ্রামের ডাকঘরটিকে। সারাদুনিয়ার পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র ঘরটি। তার পাশেই দাঁতব্য চিকিৎসালয়, ছেলে-মেয়েদের হাই স্কুল, মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়। সংস্কৃত শিক্ষার্থীদের জন্যে টোল। তা ছাড়াও আছে পল্লি পাঠাগার ও ক্লাব। গ্রামটি স্বয়ংসম্পূর্ণ।
মাঝখানে একবার গিয়েছিলাম আমার ছেড়ে-আসা গ্রামের লাল মাটিতে। নজরে পড়ে গেল বাঁশবাগানের মাঝে পুরোনো মসজিদটার ওপর। দু-ধারের দুটি অশ্বত্থ গাছের চাপে অবস্থা তার বিপর্যস্ত। মনে হয় মুসলমানরাই এখানে প্রাচীন। পরে ক্রমশ হিন্দুপল্লি গড়ে উঠেছে এবং হিন্দুধর্মের নিদর্শন ছড়িয়ে পড়েছে এধারে-ওধারে। তালন্দের শিবমন্দিরের নাম ডাক আছে–তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি জনশ্রুতিতে,
বিল দেখিস তো ‘চলন’
আর শিব দেখিস তো ‘তালন’।।
গ্রামের মুসলমানরাও ছিল আমাদের আপনজন। পুজো-পার্বণে এদের অনেক সাহায্য পেয়েছি। গ্রামের কাজে এরা করেছে সহযোগিতা। কিন্তু আজ? একসুরে বাঁধা বীণার তার কোথায় যেন ছিঁড়ে গেছে। তাই আজ সুরহীন হয়ে পড়েছে সব। প্রাণমাতানো সংগীতের মীড়ে কোথায় যেন ঘটেছে ছন্দপতন। যে ক-দিন ছিলাম গ্রামে, গমকে গমকে এই কথাটাই প্রাণের ভেতর বেজেছে বেশি করে।
স্কুল দুটি প্রাণহীন, পাঠাগার অগোছালো, ক্লাবঘর স্তব্ধ; হাট, ঘাট ও মাঠে বিষাদের সুর। সারাগ্রামখানিই যেন ছেড়ে-যাওয়া একটা বাড়ি, স্থানে স্থানে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া কাগজ, জিনিসপত্রের টুকরো–উঠে-যাওয়া বাসিন্দাদের অবস্থানের চিহ্ন।
শুধু একজনকে দেখলাম গ্রাম ছেড়ে চলে যাননি। তিনি হচ্ছেন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ দাদু। মাটি-মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার তুলনা হয় না। প্রাণের মায়ায় মাটি ছেড়ে গিয়ে জন্মভূমিকে যারা ব্যথিত করেছে, তাদের দলে দাদু নন। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন মানুষের শুভবুদ্ধির আশায়। তিনি যে দেশকে ভালোবাসেন।
তাঁর সম্বন্ধে অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা মনে পড়ে। মনে পড়ে রাস্তা ছায়াচ্ছন্ন করবার জন্যে নিজের হাতে তাঁর গাছ লাগানোর কথা। যাতায়াতের সুবিধের জন্যে নিজের জমি কেটে রাস্তা করার কথা। গরিব কৃষকদের জন্যে কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার কথা। জনসাধারণের প্রত্যেকটি ভালো কাজে দেখেছি তাঁর মঙ্গল হস্তের স্পর্শ। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে একবার ঠিক হয়েছিল, কিছু চাঁদা তুলে তাঁর স্মৃতিভান্ডারে পাঠানো হবে। দাদু শুনে বললেন—’টাকা পাঠাবে সে তত ভালো কথা। কিন্তু সেখানে টাকা পাঠাবার জন্যে অনেক বড়োলোক রয়েছেন। তোমাদের এই সামান্য টাকা সেখানে না পাঠিয়ে, তাই দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বই কিনে সবাইকে পড়াও। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। তবেই তো এরা বুঝবে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কী ছিলেন।’ তাঁর কথা তখন কেউ শোনেননি। আত্মকেন্দ্রিক বলে সবাই তাঁর কথা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ কিন্তু তাঁর সে-কথার মর্মার্থ বেশ বুঝতে পারছি।
তিনি আধুনিক বাণীসর্বস্ব নেতাদের মতো বিশ্বপ্রেমিক না হতে পারেন, কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম যে খাঁটি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
গ্রামের দেওয়ালে দেওয়ালে বর্ণপরিচয়ের প্রথম পাঠ তিনি লিখে দিয়েছিলেন জবাফুলের সাহায্যে। সংখ্যাতত্ত্বের পাঠও ছিল তার সঙ্গে। উদ্দেশ্য গণশিক্ষার প্রসার। গরিব কৃষকদের বই কিনে স্কুলে পড়া না হতে পারে, কিন্তু দেওয়ালের বড়ো বড়ো অক্ষরগুলো পড়ে অনায়াসেই তারা শিখতে পারবে মাতৃভাষা। পাঠাগারের গায়ে তিনি লিখে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের মাতৃমন্ত্র–বন্দেমাতরম। রাস্তার ওপরেই ছিল তাঁর বাড়ির চওড়া দেওয়াল। ওটাই হল দাদুর প্রচারকেন্দ্র। প্রায় দিনই দেখা যেত পঞ্চমুখী জবাফুল দিয়ে দাদু ওই দেওয়ালের গায়ে প্রাণ ঢালা ভাষায় লিখে চলেছেন গ্রামের খবর। সেই সঙ্গে থাকত কোথায় রাস্তা করতে হবে, গ্রামের কোন পুলটার মেরামত প্রয়োজন, কৃষকরা ঋণ পেয়ে কী করবে ইত্যাদি। এ ছাড়াও ছিল তাঁর চিঠিপত্র লেখা ও বৈঠকে ছোটো ছোটো বক্তৃতা দেবার বাতিক। এমনি করেই দেশসেবায় তিনি নিমগ্ন থাকতেন সবসময়, আর থাকবেনও জীবনের বাকি ক-টা দিন। দাদুর অর্থপ্রাচুর্য নেই, দল নেই, দলীয় প্রচারপত্রও নেই, কিন্তু যে-জিনিসের তিনি অধিকারী সে-জিনিসেরই আজ বড়ো বেশি অভাব। সে হচ্ছে তাঁর হৃদয়। বাংলার গ্রামের মানুষের সেই হৃদয় আজ হারিয়ে গেছে। সেই হৃদয়কে আবার উদ্ধার করতে হবে।
.
বীরকুৎসা
বীরকুৎসা কি কোনো গ্রামের নাম হতে পারে? যদিও-বা হয় তাহলে কী করে এ নাম হল সে-সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের জবাব হয়তো দিতে পারতেন গ্রামের প্রাচীন প্রাজ্ঞরা। কিন্তু আমার তা জানা নেই। তবু আমার গ্রামের নাম বীরকুৎসা। রাজসাহী জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আজ তার ইতিবৃত্ত বলতে বসে কেবলই মনে প্রশ্ন যাগে, সে গ্রাম কী করে এরই মধ্যে এত দূরের হয়ে গেল! ভাবতে কষ্ট হয়, তবু ভাবি। এখনও যেন স্পষ্ট দেখতে পাই ভোর হয়ে আসছে গ্রামের দিগন্তে। জেগে উঠেই দেখতাম তছির সর্দার আর শুকাই প্রামাণিক লাঙল কাঁধে নিয়ে সেই কুয়াশা-ছড়ানো নরম ভোরের আলো-আঁধারিতে গোরু নিয়ে চলেছে মাঠে। ওপাড়ার নলিন জেলে জনকয় সঙ্গী নিয়ে খুব বড়ো একটা বেড়াজাল কাঁধে ফেলে শীতে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে চলেছে আত্রাই নদীর দিকে। এ সবই আজ আমার কাছে অতীত। অনেক দূরের ব্যাপার। তবু তো থেকে থেকে মন বলে, চলো সেখানেই যাই।
