দেশবিভাগের পর থেকে বছরের মধ্যে ছেড়ে আসা গ্রাম-এর প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এ দু-খন্ড বইকে সে-দেশে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে। ফলে, চাহিদা থাকতেও পূর্ববঙ্গে সে-সময়ে এ বই যেতে পারে না। তবু উভয় খন্ডই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-পড়া উদবাস্তু বাঙালিদের চাহিদায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে নিঃশেষিত হয়ে যায়। তারপর পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে গিয়ে সেদিন ও এদিনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ নিজ পিতৃপুরুষের ভিটে বা জন্মগ্রামকে মিলিয়ে দেখবার বাসনায় ছেড়ে আসা গ্রাম গ্রন্থ ক্রয়ে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন ছিন্নমূল বাঙালিরা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকরাও এই গ্রন্থখানি পাওয়ার জন্যে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকেন। সবারই ইচ্ছে, একখন্ডেই গ্রন্থটি প্রকাশিত হোক। বহু বাঙালি পাঠকের সেই আগ্রহ-পূরণে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা’-কতৃপক্ষ যে-সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এই দলিল-গ্রন্থখানি প্রকাশ করতে পারলেন, সেজন্যে তাঁদের আন্তরিক প্রয়াস সত্যি প্রশংসাহ। পাঠকগণ এই গ্রন্থের প্রতিটি কাহিনির অন্তরালবর্তী ভাগ্যবিড়ম্বিত ছিন্নমূল বাঙালির বেদনার্ত অন্তরের স্পর্শ অনুভব করতে পারবেন, আশা করি।
দক্ষিণারঞ্জন বসু
বড়োদিন
১৩৮২
.
সূচিপত্র
ঢাকা জেলা – বজ্রযোগিনী সাভার ধামরাই খেরুপাড়া ধামগড় আনরাবাদ শুভাঢ্যা নটাখোলা সোনারং
ময়মনসিংহ জেলা – নেত্রকোণা বিন্যাফৈর কমলপুর খালিয়াজুরি বারোঘর কালীহাতী সাঁকরাইল নাগেরগাতী সাখুয়া
বরিশাল জেলা – বাণারিপাড়া গাভা কাঁচাবালিয়া মাহিলাড়া চাঁদসী সৈওর নলচিড়া
ফরিদপুর জেলা – কোটালিপাড়া রামভদ্রপুর কাইচাল খালিয়া চৌদ্দরশি খাসকান্দি কুলপদ্দি
চট্টগ্রাম – সারোয়ালি ধলঘাট ভাটিকাইন গোমদন্ডী
নোয়াখালি – দরাপনগর সন্দীপ
ত্রিপুরা – বায়নগর চান্দিসকরা বালিয়া কালীকচ্ছ।
শ্রীহট্ট – পঞ্চখন্ড রামচন্দ্রপুর
যশোহর – অমৃতবাজার সিঙ্গিয়া
খুলনা – সেনহাটী শ্রীপুর ডাকাতিয়া
রাজসাহী – হাজরা নাটোর তালন্দ বীরকুৎসা
পাবনা জেলা – গাড়াদহ পঞ্চকোশী ঘাটাবাড়ি সাহজাদপুর
কুষ্টিয়া – শিলাইদহ ভেড়ামারা
মালদহ – কালোপুর
রংপুর – হরিদেবপুর
বগুড়া – ভবানীপুর
দিনাজপুর – ফুলবাড়ি রাজারামপুর
জলপাইগুড়ি – বোদা
মালদহ – কালোপুর
গম্ভীরার আসর বসেছে গ্রামে। ওস্তাদ পরাণ মাঝি সুললিত কণ্ঠে গাইছে, ‘শিব হে, এবার পূজা বুঝি তোমার হইল না। অনেকদিন শুনেছি এই গান, প্রতিবারই শুনেছি। কিন্তু কোনোদিন কি ভেবেছি এমন একদিন আসবে যেদিন সত্যিই শিবের পুজো আর হবে না গ্রামে।
ভীতস্ত আশঙ্কাম্লান একদল লোকের মিছিল চলেছে গ্রাম থেকে বাইরে, কোথায় কেউ জানে না। একা তাদের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল দোস্ত মহম্মদ–জোয়ান লাঠিয়াল দোস্ত মহম্মদ। বলেছিল, ‘কুণ্ঠে যাবে, যে যাবে তার মাথা লিয়ে লিব। তাকেও পথ ছাড়তে হল। লাঠি ফেলে দিয়ে কেঁদে উঠল দোস্ত মহম্মদ। মালদহ জেলার অখ্যাত কালোপুরে ইতিহাসে আর-একটি নতুন অধ্যায় শুরু হল। দোস্ত মহম্মদ কাঁদছে, দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল দোস্ত মহম্মদ কাঁদছে! কেন? এ প্রশ্নের জবাব নেই। ওপরে নির্বাক আকাশ। পায়ের নীচে পাতাজড়ানো তামাটে রঙের পথ কথা কয় না।
উত্তরবঙ্গের মালদহ জেলার ছোটো একটি গ্রাম কালোপুর। গ্রাম নয়, যেন একটি দ্বীপ। সভ্যজগতের কলকোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন শান্তিপ্রিয় আত্মসুখী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত সে দ্বীপ। ছোটো ছোটো মানুষ ছোটো ছোটো তাদের আশা-আনন্দ, সুখ-দুখ। প্রাচীন গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ আজও যেখানে দেখা যায়, সেখান থেকে খুব দূরে নয়, মাইল দশেকের মধ্যেই। কিন্তু কী সেকালে, কী ইংরেজ আমলে, ইতিহাসের ওঠাপড়ায়, রাজা-উজিরের আসা-যাওয়ায় কেমন একটা অপরিবর্তনীয়তা গ্রামটিকে পেয়ে বসেছিল! হঠাৎ এল আঘাত-অপ্রত্যাশিত, অভাবিত। বিমূঢ় মানুষগুলো একান্তই গেয়ো, বুঝেই উঠতে পারেনি কত বড়ো ঝড় তাদের আম-জামের ছায়ায় ঘেরা ঘরগুলোর ওপর নেমে এল। সর্বনাশ যখন এল, তখন তারা বুঝল কী তাদের ছিল, কী তারা হারাল।
মালদহ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের শিবগঞ্জ থানার এলাকায় পড়ে গ্রামটি। আমবাগানের ঘনবিস্তৃত ছায়ায় এলোমোলা ঘরগুলো। খড়ের চালা, মাটির দেওয়াল। ছোট্ট একটুকরো উঠোন। এ গাঁয়ে যাদের বাস–চাষ-আবাদ করেই চলে তাদের জীবিকা। এরা সকলেই প্রায় মুসলমান।
গাঁয়ের দক্ষিণে কয়েক ঘর হিন্দুর বাস। তাদের কেউ কামার, কেউ কুমোর, কেউ তাঁতি। কৈবর্ত আর তাঁতিদের সংখ্যাই বেশি। কেউ কেউ জাতব্যাবসা করে বটে, কিন্তু চাষ সবাইকেই করতে হয়–না হলে চলে না। আমাদের বাড়িটা একেবারে মুসলমান পাড়ায়। ডাইনে-বাঁয়ে তাদের ঘর। সামনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ধুলোটে রাস্তা। ভোরবেলা থেকেই গোরুর গাড়ির চাকার শব্দে ঘুম ভাঙত গ্রামের। ভিনগাঁয়ের লোকেরা আসা-যাওয়ার পথে এই ছোট্ট গাঁয়ের দিকে কেউ-বা তাকাত–কেউ-বা তাকাত না।
গাঁয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে গঙ্গা নদী। অপ্রশস্ত শীর্ণ। শীতের সময় চর পড়ে–বর্ষায় থইথই করে। উত্তর বাংলার অন্য সব গ্রামের মতোই কালোপুরেও নেই ষড়ঋতুর বিপুল ঐশ্বর্য। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আভরণহীন প্রকৃতি ক্ষতিপূরণ করে আম-জাম দিয়ে। তারপর বর্ষা। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ধুলোভরা রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে যায়, নীচু জমির জল উপচে ওঠে। কিন্তু তবু গোরুর গাড়িই প্রধান বাহন–নৌকো নয়। নৌকো যা চলে তা গঙ্গায়। বড়ো বড়ো পালতোলা নৌকোগুলো এ গাঁয়ের কাছে ক্কচিৎ নোঙর ফেলে। বর্ষা এ গাঁয়ে আসে অভিসম্পাতের মতো, পুরোনো খড় চুঁইয়ে ঘরে জল ঝরে। বর্ষার পর শরৎ। কত নাম-না জানা ফুল ফোটে–ঝোঁপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে মিঠে রোদ উঁকি মারে। কিন্তু এ সময় প্রকৃতি তার ক্ষতিপূরণ আদায় করে নেয়। পুজোর আনন্দের হাসি মিলিয়ে যেতে না যেতেই ম্যালেরিয়া দেখা দেয়। হেমন্ত আর শীত কেটে গেলে পর ম্যালেরিয়ার মেঘও কেটে যায়। বসন্তই এ গ্রামে সত্যিকারের ঋতু। আমের পাতায় নতুন রং ধরে–গাছে গাছে থোকা থোকা মুকুলের গন্ধে গ্রাম-পথ মেতে ওঠে। জানা-অজানা পাখির ডাকে গ্রামের আকাশ মুখর। সে কী আকর্ষণ!
