মা আরও কিছু বলতে পারত। এমন কিছু যা শুনলে শুচু আত্মহত্যাও করতে পারত। কিংবা যা শোনা, ভাবা, বলা অন্যায়ঘোর অন্যায়। শুভদীপের গলার কাছে যন্ত্রণায় ব্যথা ব্যথা করে। কিন্তু কিছু বলে
সে। মা আর কী যুক্তি দেয়, শোনার জন্য সে অপেক্ষা করে। কিন্তু বিশ্বদীপ ধমকে থামিয়ে দেয় মাকে। বলে, শুধু শুচু কেন প্রত্যেকেই তারা এক-একটি পেট। চাল আনতে ডাল ফুরনো সংসারে সকলেই বাড়তি তারা তিন ভাইবোনই মরে যাক তা হলে রাস্তার অবসরভাতার টাকায় বাবার ওষুধ কেনা হলেও মা-বাবার দুটি পেটাতে চলে যাবে। পেট নিয়ে বেঁচে থাকুক তারা আর শতবর্ষ পার করে দিক।
কঠোরতম এই শব্দসমূহ শুনেও কিন্তু মা তেমনই স্বাভাবিক থাকে। এবং শান্তভাবে একটি আশ্চর্য কথা বলে। বলে যে পেট সকলের থাকলেও এ সংসারে মেয়েমানুষের পেট বড় শত্রু। কারণ তাদের কোনও মূল্য নেই। বিশেষ করে রুগণ ও অকর্মণ্য যদি হয়ে থাকে কোনও মেয়েমানুষ তার মূল্য কানাকড়ি। মেয়েমানুষের হল–যতক্ষণ গতর ততক্ষণ কতর। মানে কদর। সংসারে ব্যয় কমানোর জন্য মা মৃত্যুর কথা বলতে চায়নি। বললে তো পেটের সন্তানদের ভার লাঘব করার জন্য সে নিজেই আগে গলায় দড়ি দিত। কিন্তু সে তা করেনি। মৃত্যুর মধ্যে কোনও কল্যাণ থাকে না কখনও। কল্যাণ মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার মধ্যে। সুতরাং, মৃত্যু নয়, মা বাস্তবে উপস্থিত একটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছে মাত্র।
শুভদীপ বিশ্বদীপের দিকে তাকায়। বিশ্বদীপ তাকে মেনে নিতে ইশারা করে। কিন্তু শুভদীপ তখন সকলের ব্যাখ্যা অমান্য করে শক্ত হয়ে যায়। তার কপালের শিরা দপদপ করে। সে অসহিষ্ণু ঘোষণা করে শুচুর অকালমৃত্যুর সম্ভাবনার কথা। যেকথা সকলেই জানে এবং ভুলে গেছে, তার কথা আবার মনে করিয়ে দেয় সে।
মা কোনও কথা না বলে কেঁদে ফেলে হঠাৎ। তার স্বভাববিরুদ্ধভাবে কেঁদে ফেলে। বিশ্বদীপ তুলসীমঞ্চ থেকে নেমে দাঁড়ায়। দৃঢ় ছুড়ে দেয় শুভদীপের দিকে। কোনও মানুষ মারা যাবে যে কোনও সময় জানা গেলে–সারাক্ষণ তার পরিপার্শ্বে মৃত্যুরই আয়োজন রাখা যুক্তিযুক্ত, নাকি জীবনের।
শুভদীপ জবাব দেয় না। সভা ভেঙে ঘরের দিকে যায়। মা আঁচলে চোখ মুছে তাকে অনুসরণ করে। খেতে দিতে হবে। সারাদিন পরিশ্রম করে ঘরে ফিরেছে অভুক্ত ছেলেটা। বিশ্বদীপ তাদের অনুসরণ করে বলতে বলতে ঢোকে। কোনও মানুষেরই কি শেষ পর্যন্ত জীবনের নিশ্চয়তা আছে? কেউই কি বলতে পারে, সে জবঁচে থাকবে ভরা আয়ুষ্কাল? একটি সুস্থ শরীরের মধ্যে যে বাসা বেঁধে নেই কোনও মারণরোগ–কে দিতে পারে তার নিশ্চিতভরসা?
সে উদাহরণ দিতে থাকে। হঠাৎ ধরা-পড়া কর্কটরোগ, দুর্ঘটনায় মরে যাওয়া বাবা আর মেয়ে, দুকিলো পটল কিনতে গিয়ে সন্ন্যাসরোগে ঢলে পড়া পাড়ার হরজ্যেঠু…
শুভদীপ কথা বলে না। শুনতে শুনতে বিছানায় পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে নেয়। মা হাতে খাবার তুলে দেয়। তিনটে রুটি আর ডাল। ডালে পেঁয়াজ কুচি, লংকা। সে থালা নিয়ে কাগজে রাখে। মা গজর-গজর শুরু করে। বিশ্বসংসারে সমস্তই শকরি হয়ে গেল এমনই উম্মা। এবং যে সংসারে সমস্তই শকরি হয়, কে না জানে, সে সংসার উজায় না কখনও।
শুভদীপ মায়ের নিত্য-নৈমিত্তিক গজগজানি উপেক্ষা করে খায়। রুটি হেঁড়ে। মুখে দেয়। তার পেট ভরে না। সে আরও রুটি চায়। এবং চাইতে চাইতে সে খবরের কাগজের পুরনো হলদে খবর পড়ে। মা তখন রুটি নেই জানায় এবং ইনিয়ে বিনিয়ে নিত্যকার অভাবের কথা শুরু করে। আটা বাড়ন্ত, চাল বাড়ন্ত। এমনকী রোজগেরে ছেলের পাতেও সে তুলে দিতে পারল না পরিমাণ মতো রুটি। আর এই অভিযোগের মধ্যেও মা বিয়ে বিষয়ে তার আপত্তির কথা তোলে। এবং একই সুরে বলে যায়, দেবনন্দন বাড়ির জামাই হতে পারলে দরে-দরকারে, ঠেকায়-বেঠেকায় তার কাছ থেকে কিছু ধার করে নেবার সুবিধা অন্তত পাওয়া যায়।
সে মায়ের দিকে তাকায়। বিশ্বদীপ পাশে শুয়েছিল। চোখ বন্ধ করে আছে। হয়তো তার আর এ বিষয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না। সে মায়ের মুখ দেখে আর অবশিষ্ট ডালে চুমুক দেয়। তার মনে হয়, ভদ্রতাবোধের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে মা। তার রাগ হয় না। ঘৃণাও জাগে না কোনও—যা এখন বড় বেশি হয়ে উঠেছে তার মধ্যে। সে মাকে উপলব্ধি করে। দীর্ঘদিন অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে, দারিদ্র-পীড়নে, অনিশ্চয়তায় ও নিরাপত্তাহীনতায় মরিয়া হয়ে উঠেছে মা। এবং কিছু একটা অবলম্বনের জন্য দেবনন্দনকেই আঁকড়ে ধরেছে। সে জানে, মা যেমন ভাবছে তেমন সঙ্গতি দেবনন্দনের নেই। দানছত্র শুরু করলে বরং সে-ই বিপড়ি পড়বে।
সে তবু মার ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করে না। কিন্তু বিয়ে স্তম্পর্কে নিজস্ব প্রতিরোধ জারি রাখে। আর ভাবতে থাকে মালবিকপর্ক দিয়ে দেওয়া তিনশো টাকার কথা। তিন-শো-ওও-ও-ও! একটুকরো হিমবায়ু শোঁ-শোঁ ঢুকে পড়ে বুকের মধ্যে। আর ঠিক তখনই মা প্রশ্ন করে। অভিযোগ ও অভাবের পর্ব বাদ দিয়ে অমোঘ প্রশ্ন করে ওষুধ কোথায় রাখা আছে। ওষুধ নাও কেনা হতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা তার মনে আসে না। সে মাথা নাড়ে। আনেনি। মা তার মাথা নাড়াকে বিশ্বাস করতে পারে না। ওষুধ বিষয়ে সে সর্বদা নিয়মানুবর্তিতা অভিব্যক্ত করেছে। একবারের বেশি দু’বার তাকে কিছু বলতে হয়নি। সুতরাং মা বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। মুখের হাঁ বন্ধ করতেও ভুলে যায়। সে মায়ের বিস্ময়ের পাশ কাটিয়ে উঠে পড়ে। পালা নামিয়ে রাখে গ্যাসের টেবিলের তলায়। বিস্ময় সামলে মা তখন অবধারিত ওষুধের টাকা ফেরত চায়। সে জানায় খরচ হয়ে গেছে। কাল সে-ই ওষুধ এনে দেবে এমন প্রতিশ্রুতিও দেয়। হয়তো অনেক রাত হয়ে গেছে বলেই মা তাকে ক্ষমা করে দেয় দ্রুত। এবং জানাতে ভোলে নাচাল, ডাল, আটা, চিনি বাড়ন্ত। দেবনন্দনের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা। নেওয়া হয়েছে। নইলে এবেলা কেবল রুটি আর নুন খেয়ে থাকতে হত।
