হেমাঙ্গিনী চলিয়া গেলেন। রামেশ্বর বলিলেন, পড় তো মা, মৃত্যু সম্বন্ধে তোমাদের কবির কোন কবিতা যদি থাকে, তবে তাই পড়ে আমাকে শোনাও।
উমা বাছিয়া বাছিয়া বাহির করিল—
অত চুপি চুপি কেন কথা কও
ওগো মরণ, হে মোর মরণ।
প্রথমে লজ্জায় সঙ্কোচে ঈষৎ মৃদু সুরেই উমা আরম্ভ করিল, কিন্তু পড়িতে পড়িতে কাব্যের প্রভাবে অভিভূত হইয়া স্থানকালকে অতিক্রম করিয়া সে স্বচ্ছন্দ হইয়া উঠিল, কণ্ঠস্বরে সঙ্কোচের জড়তা রহিল না, আবেগপূর্ণ অকুণ্ঠিত কণ্ঠে ছন্দে ছন্দে তালে তালে সঙ্গীতের মাধূর্য্য ফুটাইয়া তুলিয়া আবৃত্তি করিয়া চলিল–
তব পিঙ্গল ছবি মহাজট
সে কি চূড়া করি বাঁধা হবে না।
তব বিজয়োদ্ধত ধ্বজপট
সে কি আগে-পিছে কেহ ববে না!
তব মশাল-আলোকে নদীতট
আঁখি মেলিবে না রাঙাবরন
ত্রাসে কেঁপে উঠিবে না ধরাতল,
ওগো মরণ, হে মোর মরণ?
বিস্ফারিত চক্ষে রামেশ্বর স্তব্ধ হইয়া শুনিতেছিলেন, আবেগে নাকের প্রান্তভাগ বার বার ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছিল। কবিতা শেষ হইয়া গেল, উমা নীরব হইল। কিন্তু সমস্ত ঘরখানা তখনও যেন আবৃত্তির ঝঙ্কারে পরিপূর্ণ বলিয়া বোধ হইতেছিল। অকস্মাৎ রামেশ্বর বলিলেন, ওখানটা আর একবার পড় তো মা, ওই যে- তবে শঙ্গে তোমার তুলো নাদ, তারপর কি মা?
উমা পড়িয়া বলিল–
তবে শঙ্খে তোমার তুলো নাদ
করি প্রলয়শ্বাস ভরণ,
সঙ্গে সঙ্গে রামেশ্বর আবৃত্তি করিলেন—
তবে শঙ্খে তোমার তুলো নাদ
করি প্রলয়শ্বাস ভরণ,
আমি ছুটিয়া আসিব ওগো নাথ,
ওগো মরণ, হে মোর মরণ।
ইহার পর রামেশ্বর যেন কাব্যের মোহে স্তব্ধ হইয়া রহিলেন, উমার উপস্থিতি পর্যন্ত ভুলিয়া গেলেন। কিছুক্ষণ পর হাত দুইটি তুলিয়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিতে আরম্ভ করিলেন। মৃদুস্বরে বলিলেন, তোমার শঙ্খনাদ আমি শুনতে পাচ্ছি, প্রলয়শ্বাসের ঢেউ আমার অঙ্গে এসে লাগছে। এঃ, একেবারে জীর্ণ করে দিয়েছে আঙুলগুলো!
উমা শঙ্কিত হইয়া উঠিল, সে ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইবার জন্য সন্তর্পণে উঠিয়া দাঁড়াইল। ঘরের প্রদীপের আলোর তাহার ছায়াখানি দীর্ঘ হইয়া মেঝের উপর চঞ্চল হইয়া জাগিয়া উঠিল।
রামেশ্বর চমকাইয়া উঠিয়া বলিলেন, কে?
উমা শঙ্কিত ও কুণ্ঠিত স্বরে বলিল, আমি।
তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রামেশ্বর যেন স্মরণ করিয়া বলিলেন, ও, মা, আমার মা জননী। তোমাকে আশীর্বাদ করি মা
আখগুলো সমো ভর্তা জয়ন্ত প্রতিমঃ সুতঃ
আশীরণ্যা ন তে যোগ্যা পৌলমী মঙ্গলা ভব।।
উমা আবার তাঁহাকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইয়া সন্তর্পণেই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
রামেশ্বরের ঘর হইতে বাহির হইয়া অন্দরমহলের দিকে টানাবারান্দা দিয়া উমা সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হইল। খানদুয়েক ঘর পার হইয়াই সে দেখিল, অহীন্দ্র আপনার ঘরে খোলা জানালার ধারে বাহিরের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছে। এদিকে ওদিকে চাহিয়া উমা মৃদুস্বরে বলিল, গুড-আফটারনুন সায়েব।
অহীন্দ্র চকিত হইয়া হাসিমুখে দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিল, নমস্কার শ্রীমতী উমা দেবী।
তাহাদের উভয়ের এই সম্বোধনের একটু ইতিহাস আছে।
কয়েক বৎসর পূর্বে এই চক্রবর্তী-বাড়িতেই বালিকা উমা একদিন অহীন্দ্রকে বলিয়াছিল, আপনাকে দেখলেই লোকে চিনতে পারবে এ-ই স্কলারশিপ্ পেয়েছে। যে সায়েবদের মত ফরসা রং!
তারপর অহীন্দ্র কলিকাতায় গেলে অমল উমাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, কে বল্ দেখি?
উমার স্কুলের তখন বাস দাঁড়াইয়া, সে দীর্ঘ বেণীটি দোলাইয়া বলিয়াছিল, সায়েব। পরক্ষণেই খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিয়াছিল, জিজ্ঞেস করনা সায়েবকে, রায়হাটে ওঁদের বাড়িতেই ওঁর নাম দিয়েছি সায়েব। গুড মর্নিং সায়েব।
অহীন্দ্র হাসিয়া বলিয়াছিল, নমস্কার শ্রীমতি উমা দেবী। আমি কিন্তু তোমাকে বাঙালিনীই দেখতে চাই।
উমা মাথাটি ঈষৎ নত করিয়া বলিয়াছিল, বাঙালী কালো মেয়ের স্কুলের দেরী হয়ে যাচ্ছে, অতএব বলিয়াই বেণী দোলাইয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল।
আজ উমা বলিল, এমন ধ্যানমগ্নের মত বসে যে?
অহীন্দ্রের জানলা হইতে চরটা স্পষ্ট দেখা যায়, সে চরটার দিকে আঙুল দেখাইয়া বলিল, চরটাকে দেখছি। ইন্দ্রজালের মত ময়দানবের পুরী গড়ে উঠল। এই এবার পুজোর সময়েও দেখেছি, সবুজ ঘাসে ঢালা শান্ত এক টুকরো ভূখণ্ড, মধ্যে ছোট্ট একটা সাঁওতালপল্লী। একেবারে এক প্রান্তে কটা ইঁটের ভাটি।
উমা বলিল, চরটা তো তোমাদের?
অহীন্দ্র হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ, তোমাদের?
উমার মুখ লাল হইয়া উঠিল, লজ্জায় এবার আর সে জবাব দিতে পারিল না। অহীন্দ্র বলিল, জান, ওই চরের ওপর আমার এক দল পূজারিণী আছে। তারা আমাকে দেখে লজ্জায় রাঙা হয় না, অসঙ্কোচ আনন্দে একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে।
উমা বলিল, জানি, একটি মেয়ে আজ আমাকে দেখতে এসেছিল। আমাকে বললে- রাঙাঠাকরুণ। বললে, বাবুকে বলি রাঙাবাবু, তোমাকে বলব-রাঙাঠাকরুন।
অহীন্দ্র একটু উচ্ছ্বসিত হইয়াই বলিল- চমৎকার নাম দিয়েছে।
উমা বলিল, তার নিজের নামটিও বেশ-সারী, সারী।
সবিস্ময়ে ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া অহীন্দ্র বলিল, সারী? খুব লম্বামত মেয়েটি?
হ্যাঁ। একটু বেশী লম্বা। কিন্তু আর নয়, চললাম। মা-রা হয়তো এক্ষুনি ওপরে চলে আসবেন। পালাচ্ছি আমি। সে আর উত্তরের অপেক্ষা করিল না, ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িল।
