নীচ হইতে মানদা ডাকিতেছিল, সুনীতি ত্রস্ত হইয়া দোতালার বারান্দায় নামিয়া আসিলেন। নীচের উঠান হইতে মানদা বলিল, এক-এক সময় আপনি ছেলেমানুষের মত অবুঝ হয়ে পড়েন মা। বললাম, রাত আটটা-নটার আগে কেউ ফিরবে না আর না ফিরলে খবর আসবে না। টেলিগিরাপ তো নাই মা আপনার শ্বশুরের গাঁয়ে যে, তারে তারে খবর আসবে!
সুনীতি!-ঘরের ভিতর হইতে রামেশ্বর ডাকিতেছিলেন। শান্ত মনেই সুনীতি ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন, রামেশ্বর বালিসে ঠেস দিয়া অর্ধশায়িতের মত বসিয়া আছেন, সুনীতিকে দেখিয়া স্বাভাবিক শান্ত কণ্ঠেই বলিলেন, অহীনকে লিখে দাও তো, রবীন্দ্রনাথ বলে যে বাংলা ভাষার কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থ যেন সে নিয়ে আসে। তা হলে তুমি পড়বে, তাতে কাব্যের রস পুরোটাই পাওয়া যাবে। হ্যাঁ, আর যদি কাদম্বরীর অনুবাদ থাকে, বুঝলে?
সংবাদ যথাসময়ে আসিল এবং শ্রীবাস ও মজুমদারের কল্যানে উচ্চরবেই তাহা তৎক্ষণাৎ রীতিমত ঘোষিত হইয়া প্রচারিত হইয়া গেল। সেই রাত্রেই সর্বরক্ষা-দেবীর স্থানে পূজা দিবার অছিলায় গ্রামের পথে পথে তাহারা ঢাক ঢোল লইয়া বাহির হইল। ইন্দ্র রায়ের কাছারিতে রায় গম্ভীর মুখে দাঁড়াইয়া ছিলেন। তাঁহার কাছারির সম্মুখে শোভাযাত্রাটি আসিবামাত্র তিনি হাসিমুখে অগ্রসর হইয়া আসিয়া পথের উপরেই দাঁড়াইলেন।
শোভাযাত্রাটির গতি স্তব্ধ হইয়া গেল।
রায় বলিলেন, এ আমি জানতাম মজুমদার! তারপর, নবেনটাকে দিলে লটকে?
মজুমদার বিনীত হাসি হাসিয়া বলিল, আজ্ঞে না, নবীনের ছ বছর দ্বীপান্তর হল, আর দুজনের দু বছর করে জেল।
রায় হাসিয়া বলিলেন, তবে আর করলে কি হে? এস এস একবার ভেতরেই এস, শুনি বিবরণ; কই শ্রীবাস কই? এস পাল, এস।
কৃত্রিম শ্রদ্ধার সমাদরের আহ্বানে শ্রীবাস ও মজুমদার উভয়েই শুকাইয়া গেল। সভয়ে মজুমদার বলিল, আজ্ঞে, আজ মাপ করুন, পুজো দিতে যাচ্ছি।
ঢাক বাজিয়ে পুজা দিতে যাচ্ছ, কিন্তু বলি কই হে? চরে বলি হয়ে গেল, আর মা সৰ্বরক্ষার ওখানে বলি দেবে না? মায়ের জিভ যে লকলক করছে, আমি দিব্যচক্ষে দেখছি।
মজুমদার ও শ্রীবাসের মুখ মুহর্তে বিবর্ণ হইয়া গেল। সমস্ত বাজনাদার ও অনুচরের দল সভয়ে শ্বাসরোধ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। রায় আর দাঁড়াইলেন না, তিনি আবার একবার মৃদু হাসিয়া ছোট একটি ‘আচ্ছা’ বলিয়া কাছারির ফটকের মধ্যে প্রবেশ করিলেন।
কিছুক্ষণ পর স্তব্ধ শ্রীবাস ও যোগেশ মজুমদার অনুভব করিল, আলো যেন কমিয়া আসিতেছে। পিছনে ফিরিয়া মজুমদার দেখিল, শ্রীবাসের হাতের আলোটি ছাড়া আর একটিও আলো নাই, বাজনদার অনুচর সকলেই কখন নিঃশব্দে চলিয়া গিয়াছে।
ওদিকে চক্রবর্তী-বাড়িতে সুনীতি স্তব্ধ হইয়া দাওয়ার উপর বসিয়াছিলেন, চোখ দিয়া জল ঝরিতেছিল অন্ধকারের আবরণের মধ্যে। তাঁহার সম্মুখে নাতিকে কোলে করিয়া দাঁড়াইয়া নবীনের স্ত্রী। সেও নিঃশব্দে কাঁদিতেছিল। বহুক্ষণ পরে সে বলিল, সদরে সব বললে হাইকোর্টে দরখাস্ত দিতে।
সুনীতি কোনমতে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিলেন, দরখাস্ত নয়, আপীল।
খালাস যদি না হয় রাণীমা, তবে আপনকারা ছাড়া আমরা তো কাউকে জানি না।
কিন্তু খরচ যে অনেক মা; সে কি তোরা যোগাড় করতে পারবি?
নবীনের স্ত্রী চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। সুনীতি খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, তাও পরামর্শ করে দেখব বাগদী-বউ; অহীন আসুক, আর পাঁচ-সাত দিনেই তার পরীক্ষা শেষ হবে, হলেই সে আসবে
মতি বাগদিনী ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল, আপনকারা তাকে কাজে জবাব দিয়েছিলেন; কিন্তু আমাকে যে আপুনি না রাখলে কেউ রাখবার নাই রাণীমা।
***
অহীন্দ্র বাড়ি আসিতেই সুনীতি তাহাকে ইন্দ্র রায়ের নিকট পাঠাইলেন। মনে গোপন সঙ্কল্প ছিল, চল্লিশ পঞ্চাশ টাকায় হইলে আপনার অবশিষ্ট অলঙ্কার হইতেও কিছু বিক্রয় করিয়া খরচ সংস্থান করিয়া দিবেন। কিন্তু রায় নিষেধ করিলেন, বলিলেন, খরচ অনেক, শতকের মধ্যেও কুলোবে না বাবা। তা ছাড়া, অকস্মাৎ তিনি হাসিয়া বলিলেন, তোমরা আজকালকার, কি বলে, ইয়ংমেন, তোমরা ভাববে, আমরা প্রাচীন কালের দানব সব; কিন্তু আমরা বলি কি, জান? ছ বছর জেল খাটতে নবীনের মত লাঠিয়ালের কোন কষ্টই হবে না। বংশানুক্রমে ওদের এ-সব অভ্যাস আছে।
অহীন্দ্র চুপ করিয়া রহিল। রায় হাসিয়া বলিলেন, তুমি তো চুপ করে রইলে। কিন্তু অমল হলে একচোট বক্তৃতাই দিয়ে দিত আমাকে। এখন একজামিন কেমন দিলে, বল?
এবার স্মিতমুখে অহীন্দ্র বলিল, ভালই দিয়েছি আপনার আশীর্বাদে। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া রায় বলিলেন, আশীর্বাদ তোমাকে বার বার করি অহীন্দ্র। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়
অহীন্দ্র কথাটা সমাপ্তির জন্য প্রতীক্ষা করিয়া রহিল। রায় বলিলেন, তোমার বাবাকে এবার কেমন দেখলে বলো তো?
ম্লান কণ্ঠে অহীন্দ্র বলিল, আমি তো দেখছি, মাথার গোলমাল বেড়েছে।
রায় কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, যাও, বাড়ির ভেতর যাও, তোমার- মানে, অমলের মা এরই মধ্যে চার-পাঁচ দিন তোমার নাম করেছেন।
অহীন্দ্রকে বাড়ির মধ্যে দেখিয়া হেমাঙ্গিনী আনন্দে যেন অধীর হইয়া উঠিলেন। অহীন্দ্র প্রণাম করিতেই উজ্জ্বল মুখে প্রশ্ন করিলেন, পরীক্ষা কেমন দিলে বাবা?
