এতক্ষণে সচকিত হইয়া সুনীতি গন্ধের কটুত্ব অনুভব করিয়া ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। চারিপাশে চাকিয়া দেখিয়া বলিলেন, ওই যা, সাঁড়াশিটা আবার আনি নি। আন তো মানদা।
মানদা অল্প বিরক্ত হইয়াই বলিল, ওই যে সাঁড়াশি-ওই যে গো বাঁ হাতের নীচেই যে গো।
সুনীতি এবার দেখিতে পাইলেন, সাঁড়াশিটার উপরেই বাঁ হাত রাখিয়া তিনি বসিয়া আছেন। তাড়াতাড়ি তিনি কড়াটা নামাইয়া ফেলিলেন, কিন্তু হাতেও যেন কেমন সহজ শক্তি নাই, হাতখানা থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। মানদার সতর্ক দৃষ্টিতে সেটুকু এড়াইয়া গেল না, সে এবার উৎকণ্ঠিত হইয়া বলিয়া উঠিল, কর্তাবাবু আজ কেমন আছেন মা?
ম্লান হাসিয়া সুনীতি বলিলেন, তেমনিই আছেন।
বাড়ে নাই তো কিছু, তাই জিজ্ঞাসা করছি।
না। কদিন থেকে বরং একটু শান্ত হয়েই আছেন।
তবে?-মানদা আশ্চর্য হইয়া প্রশ্ন করিল।
সুনীতিও এবার বিস্ময়ের সহিত বলিলেন, কি রে? কি বলছিস তুই?
মানদা বলিল, এমন মাটির পিতিমের মত বসে রয়েছেন যে?
গভীর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সুনীতি বলিলেন, নবীনদের মামলায় আজ রায় বেরুবে মানদা। কি হবে বল তো ওদের? যদি সাজা হয়ে যায়-! আর তিনি বলিতে পারিলেন না, তাঁহার রক্তাভ পাতলা ঠোঁট দুইটি বিবর্ণ হইয়া থরথর করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল, কোমল দৃষ্টিতে চোখ দুইটি জলে ভাসিয়া বেদনায় যুগ্ম-সায়রের মত টলমল করিয়া উঠিল।
মানদাও একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস না ফেলিয়া পারিল না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে বলিল, সে আর আপনি-আমি কি করব বলুন? মানুষের আপন আপন অদেষ্ট; অদেষ্টর লেখন কি কেউ মুছতে পারে মা?
অসহায় মানুষের মামুলী সান্তনা ছাড়া আর মানদা খুঁজিয়া কিছু পাইল না; কিন্তু সুনীতির হৃদয়ের পরম অকৃত্রিম মমতা চিরদিনের মতই আজও তাহাতে প্রবোধ মানিল না। জলভরা চোখে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে তিনি বলিলেন, মানুষ মরে যায়, বুঝতে পারি মানদা-তাতে মানুষের হাত নেই। কিন্তু এ কি দুঃখ বল তো? এক টুকরো জমির জন্যে মানুষে মানুষে খুন করে ফেললে, আর তারই জন্যে, যে খুন করলে তাকে রেখে দেবে খাঁচায় পুরে জানোয়ারের মত, কিম্বা হয়তো গলায় ফাঁসি লটকে-! কথা আর শেষ হইল না, চোখের জলের সমুদ্র সর্বহৃদয়ব্যাপী প্রগাঢ় বেদনায় অমাবস্যা-স্পর্শে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল-হু হু করিয়া চোখের জল ঝরিয়া মুখ-বুক ভাসাইয়া দিল।
মানদার চোখও শুষ্ক রহিল না, তাহারও চোখের কোণ ভিজিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া, সে আক্রোশভরা কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, তুমি ভেবো না মা, ভগবান এর বিচার করবেনই করবেন। গায়ে আগুন লাগবে, নিব্বংশ হবে
বাধা দিয়া সুনীতি বলিলেন, না না মানদা, শাপ-শাপান্ত করিস নে মা। কত বার তোকে বারণ করেছি, বল তো?
মানদা এবার সুনীতির উপরেই রুষ্ট হইয়া উঠিল; সুনীতির এই কোমলতা সে কোনমতেই সহ্য করিতে পারে না। ক্রোধ নাই, আক্রোশ নাই, এ কি ধারার মানুষ। সে রুষ্ট হইয়াই সে স্থান হইতে অন্যত্র সরিয়া গেল।
সুনীতি বেদনাহত অন্তরেই আবার রান্নার কাজে ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। রামেশ্বরের স্নান-আহারের সময় হইয়া আসিয়াছে। সেই ঘটনার পর হইতে রামেশ্বর আরও স্তব্ধ হইয়া গিয়াছেন; পূর্বে আপন মনেই অন্ধকার ঘরে কাব্য আবৃত্তি করিতেন, ঘরের মধ্যে পায়চারিও করিতেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই স্তব্ধ হইয়া ওই খাটখানির উপর বসিয়া থাকেন, আর প্রদীপের আলোয় হাতের আঙুলগুলি ঘুরাইয়া দেখেন। কখনও কখনও সুনীতির সহিত কথার আনন্দের মধ্যে খাট হইতে নামিতে চাহেন, সুনীতি হাত ধরিয়া নামিতে সাহায্য করেন। অন্ধকার রাত্রে জানালার ধারে দাঁড়াইয়া অতি সন্তর্পণে মুক্ত পৃথিবীর সহিত অতি গোপন এবং ক্ষীণ একটি যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেন। আপনার দুর্ভাগ্যের কথা মনে করিয়া সুনীতি ম্লান হাসি হাসেন, তখন চোখে তাঁহার জল আসে না।
পিতলের ছোট একটা হাঁড়িতে মুঠাখানেক সুগন্ধি চাল চড়াইয়া দিয়া স্বামীর স্নানের উদ্যোগ করিতে সুনীতি উঠিয়া পড়িলেন। এই বিশেষ চালটি ছাড়া অন্য চাল রামেশ্বর খাইতে পারেন না।
অপরাহ্নের দিকে সুনীতির মনের উদ্বেগ ক্রমশ যেন বাড়িয়াই চলিয়াছিল; সংবাদ পাইবার জন্য তাঁহার মন অস্থির হইয়া উঠিল। অন্য দিন খাওয়া-দাওয়ার পর তিনি স্বামীর নিকট বসিয়া গল্পগুজবে তাঁহার অস্বাভাবিক জীবনের মধ্যে সাময়িকভাবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করেন; কোন কোন দিন রামায়ণ বা মহাভারত পড়িয়া শুনাইয়া থাকেন। আজ কিন্তু আর সেখানেও স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে পারিলেন না। আজ তিনি বই লইয়াই বসিয়া ছিলেন, কিন্তু পাঠের মধ্যে পাঠকের অন্তরে যে তন্ময়যোগ থাকিলে শ্রোতার অন্তরকেও তন্ময়তায় বিভোর করিয়া আকর্ষণ করা যায়, আপন অন্তরের সেই তন্ময়যোগটিকে তিনি আজ আর কোনমতেই স্থাপন করিতে পারিলেন না।
একটা ছেদের মুখে আসিয়া সুনীতি থামিতেই রামেশ্বর বলিলেন, তুমি যদি সংস্কৃতটা শিখতে সুনীতি, তোমার মুখে মূল মহাকাব্য শুনতে পেতাম। অনুবাদ কিনা, এতে কাব্যের আনন্দটা পাওয়া যায় না।
সুনীতি অপরাধিনীর মত স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, আজ তা হলে এই পর্যন্তই থাক।
