একটি মেয়ে বলিল, ই গান বুলতে হবে রাঙাবাবুকে।
কমলের নাতনী বলিল, হু বুলব। বেশী করে খাজনা লিবে কেনে রাঙাবাবু? যাব আমরা উয়ার কাছে
এখুনি?
উঁ-হুঁ, মোড়ল মাঝি ক্ষেপে যাবে। বাবা রে!
তবে?
বিকালে আমরা ডাকব বাবুকে। হাঁড়িয়া জম করব, লাচব। উয়াকে ডেকে আনব।
নিতান্ত আকস্মিকভাবেই একটা মেয়ে বিস্ময়মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, কেমন বরন বল্ দেখি রাঙাবাবুর? রাঙা লালা ঝক ঝক করছে!
কমলের নাতনী বলিল, আগুনে-র পারা! রাঙাঠাকুরের লাতি, উ ঠাকুর বেটে।
একটি মেয়ে কি উত্তর দিবার জন্য উদ্যত হইয়াছিল, কিন্তু আবার মোড়ল মাঝির ক্রুদ্ধ চীৎকারে তাহারা চমকিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজনের উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
এবার বচসা হইতেছিল কমল মাঝির সহিত রংলাল এবং নবীনের দলের। সাঁওতালদের জমির পরই পূর্ব দিকে প্রায় বিঘা পঞ্চাশেক চর পড়িয়া আছে, সেই জমিটা পছন্দ করিয়া রংলাল এবং নবীন মাপিতে উদ্যত হইল। কমল মাঝি বলিল, উ জমি তুরা লিবি না মোড়ল, উ আমি দিব না।
রংলাল বিরক্তির সহিত বলিল, দিবি না? কেন?
আমরা তবে আর জমি কুথাকে পাব? আমাদের ছেলেগুলা কি করবে?
তাদের আবার ছেলে হবে, তাদের ছেলে হবে, তাই বলে গোটা চরটাই তোরা আগলে থাকবি নাকি? মাপ হে, মাপ নবীন, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন?
নবীন মাপিতে উদ্যত হইবামাত্র কমল তাহার হাতের দাঁড়া চাপিয়া ধরিয়া ক্রুদ্ধ উচ্চ চীৎকারে চীৎকারে বলিয়া উঠিল না, দিব না।
রংলালও এবার যেন ক্ষেপিয়া উঠিল। এই পূর্ব দিকের চরের মাটি সকল দিকের মাটি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, ভাঙিলে ভুরার মত গুঁড়া হইয়া যায়, ভিতরের বালির ভাগ ময়দার মত মিহি, আলু ও আখের উপযোগী এমন মাটি আর বুঝি হয় না। সে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, এই দেখ মাঝি, ফাটাফাটি হয়ে যাবে বলছি! খবরদার তুই দাঁড়া ধরিস না, বললাম।
একটা ভয়াল হিংস্র হাসি হাসিয়া কমল বলিল, তুকে ধরে আমি মাটিতে পুঁতে দিব।
বার বার এমন অবাঞ্ছনীয় ঘটনার উদ্ভব হওয়ার জন্য অহীন্দ্রের মনে আর বিরক্তির সীমা রহিল না। সে তাহার কিশোর কণ্ঠের তীক্ষ্ণ কঠিন স্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল, ছাড়, ছাড় বলছি, ছাড়।
কমল এবং রংলাল দুইজনেই এবার সরিয়া দাঁড়াইল।
অহীন্দ্র বলিল, অন্যদিকে জমি পছন্দ করে মেপে নাও নবীন। এ জমি তোমরাও পাবে না, সাঁওতালরাও পাবে না। এদিকটা আমাদের খাসে থাকবে। খাসে চাষ হবে আমার।
জমির মাপ-জোক শেষ করিয়া অহীন্দ্র ফিরিবার সময় বলিল, দেখো, আর যেন ঝগড়া করো না।
একজন মাঝি ছাতাটা লইয়া তাহার সঙ্গে গেল, জৈষ্ঠের রৌদ্রে তখন আগুন ঝরিতে শুরু করিয়াছে। সেই রৌদ্রের মধ্যেই রংলাল, নবীন এবং তাহার সঙ্গী কয়েকজন আপন আপন সীমানা চিহ্নিত করিয়া চারি কোণে চারিটা মাটির ঢিপি বাঁধিতে শুরু করিয়া দিল। সাঁওতালেরা আবার দল বাঁধিয়া আপনাদের হিসাবমত জমি ভাগ করিতে আরম্ভ করিল।
প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করিয়া জলহীন কঠিন মাটিতে কোপ মারিতে মারিতে রংলাল বলিল, থাক শালারা, কদিন তোরা এখানে থাকিস, সেও তো আমি দেখছি!
.
১২.
সেই দিনই অপরাহ্নে সাঁওতালেরা খাজনার টাকা পাই পাই পয়সা হিসাব করিয়া মিটাইয়া দিল। কিন্তু গোল বাধাইল রংলাল-নবীনের দল। তাহারাও ধরিয়া বসিল, খাজনা ছাড়া সেলামি তাহারা দিতে পারিবে না। সাঁওতালদের চেয়েও কি তাহারা চক্রবর্তী-বাড়ির পর? অহীন্দ্র চুপ করিয়া রহিল, কোন উত্তর দিতে পারিল না। রংলাল-নবীনের যুক্তি খণ্ডন করিবার মত বিপরীত যুক্তি খুঁজিয়া সে সারা হইয়া গেল। অনেকক্ষণ নীরবে উত্তরের অপেক্ষা করিয়া রংলাল বলিল, দাদাবাবু, তাহলে হুকুমটা করে দিন আজ্ঞে।
অহীন্দ্র কিন্তু সে হুকুমও দিতে পারিল না। বিঘা পিছ পাঁচ টাকা সেলামি আদায় হইলেও পঞ্চাশ বিঘার আড়াই শত টাকা আদায় হইবে। তাহাদের সংসারের বর্তমান অবস্থা সে শুধু চোখেই দেখিতেছে না, মর্মে মর্মে অনুভব করিতেছে। তাহার মা যখন রান্নাশালে বসিয়া আগুনের উত্তাপ ভোগ করেন, তখন সেও গিয়া উনানের কাছে বসিয়া উনানে কাঠ ঠেলিয়া দেয়। সে যে কি উত্তাপ, সে তো তাহার অজানা নয়। উত্তাপ ও কষ্টের কথা ছাড়িয়া দিয়াও তাহার মাকে নিজে-হাতে রান্না করিতে হয়-ইহারই মধ্যে কোথাও আছে অসহনীয় অপরিসীম লজ্জা, যাহার ভয়ে তাহার মাথা হেঁট হইয়া পড়ে, তাহার চোখ ফাটিয়া জল আসে। তাহার মা অবশ্য বলেন, যখন যেমন তখন তেমন না পারলে হবে কেন? অম্লান হাসিমুখেই তিনি বলেন। কিন্তু তাহার মনে পড়ে কালিন্দী নদীর বানের জল আটক দিবার জন্য ঘাসের চাপড়া-বাঁধা বাঁধটার কথা; বাঁধটার ও-পারে থাকে অথই জল, আর এ-পারে বাঁধের গায়ে সবুজ ঘাস তেমনই তাহার মায়ের মুখে সুশ্যাম হাসির ও-পারে আছে অথই দুঃখের বন্যা; কালিন্দীর বন্যায় ভাটা পড়ে; বর্ষার শেষে সে শুকাইয়া যায়, কিন্তু মায়ের বুকের দুঃখের বন্যা শুকায় না, ও যেন শুকাইবার নয়! এ ক্ষেত্রে কেমন করিয়া সে এতগুলি টাকা ছাড়িয়ে দিবে?
নবীন বলিল, তা পাঁচ টাকা করে জনাহি লজর কিন্তুক দিতে হবে মোড়ল। তা লইলে সেটা ধর আমাদেরও অপমান। সাঁওতালরা না হয় দেয় নাই, ওরা ছোট জাত। আমাদিগে তো রাজার সম্মান একটা করতে হয়।
