নবীন অর্থও বুঝিল না, উদ্দেশ্যও বুঝিল না, কিন্তু গম্ভীরভাবে কথাটাকে সমর্থন করিয়া বলিল, নিচ্চয়।
অহীন্দ্র কৌতুকে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।
রংলাল বলিল, হাসবেন না দাদাবাবু, হাসির কথা লয়। আমার পিলুই বলে চমকে উঠেছিল! বুঝলে লবীন, দাদাবাবু হাঁকলেন, কে, কে তুমি? বললে না পেত্যয় যাবে ভাই, আমার ঠিক মনে হল কর্তাবাবু উঠে পড়েছেন- একেবারে অবিকল।
নবীন বলিল, ইটি তুমি ঠিক বলেছ মোড়ল, অবিকল। আমিও ভেবেছিলাম ঠিক তাই। রংলাল উৎসাহিত হইয়া বলিল, তাই তো বলছি হে, বাঘের বাচ্চা বাঘই হয়। আমি এক এক সময় ভাবতাম, আঃ, দাদাবাবু কি করে আমাদের জমিদার সেজে বসবে? তা সে ভাবনা আজ আমার গেল।
অহীন্দ্র গম্ভীরভাবে মাথাটি অল্প নীচু করিয়া নীরবে চলিতেছিল, মনে মনে লজ্জা অনুভব না করিয়া সে পারিতেছিল না। তাহার মনে হইতেছিল দেশ-বিদেশের কত মহাপুরুষের কথা। তাঁহাদের আদর্শের তুলনায় জমিদার! ছিঃ!
রংলাল আবার বলিল, সাঁওতালদের জমি আমি দেখেছি, মোটমাট তা তোমার বিঘে পঞ্চাশেক, তার বেশি হবে না। আর ধর আমাদের পাঁচজনের দশ বিঘে করে পঞ্চাশ বিঘে, এই পঞ্চাশ বিঘে মাপতে আর কতক্ষণ লাগবে? পহরখানেক বেলা না হতেই হয়ে যাবে। অ্যাঁ, ও লবীন?
নবিন বলিল, তা বইকি। আমি তোমার চারখানা দাঁড়া নিয়ে এসেছি। চারজনাতে মাপলে কতক্ষণ?
রংলাল বলিল, বুঝলেন দাদাবাবু, আমরা পাঁচজনায় জমি নেবার খবর একবার ছড়ালে হয়; দেখবেন, গাঁয়ের যত চাষী সব একেবারে হত্যে দিয়ে পড়বে।
অহীন্দ্র বিস্মিত হইয়া বলিল, তোমরাও জমি নেবে নাকি? কই, সে কথা তো বল নি?
রংলাল বলিল, এই দেখেন, ইয়ের মধ্যে ভুলে গিয়েছেন দাদাবাবু? সেই দেখেন, পেথম দিনই কাছারিতে আপনার সঙ্গে দেখা, আপুনি নিয়ে গেলেন বাড়িতে, গিন্নীমায়ের কাছে। আমাদের চাষীরা সব রব তুলেছিল, জমি আমাদের, জমি আমাদের। আমিই তো আজ্ঞে বলে দিলাম, চক আফজলপুরের সঙ্গে লাগাড় হয়ে যখন চর উঠেছে, তখন আজ্ঞে, ও চর আপনাদের। ই আইন আমার বেশ ভাল করে জানা আছে। তবে হ্যাঁ, ধর্ম যদি ধরেন, ধরে না তো কেউ আজকাল, তা হলে অবশ্যি আমরাও পাই। গিন্নীমাও কথা দিয়েছিলেন, মনে করে দেখেন।
অহীন্দ্র অনেক কিছু ভাবিতেছিল। ইহারা যাহা বলিতেছে তাহা সত্য, এ সত্য সে অস্বীকার করিতেও চাহে নাই। সে বলিতে চাহিতেছিল, আজই যে সেই কথা অনুযায়ী বিলি-বন্দোবস্ত করা হইবে, এ কথা তো হয় নাই। ইহার মধ্যে অনেক কথা আছে যে-সেলামী, খাজনা, পাট্টা, কবুলতি, অনেক কথা। সাঁওতালদের কথা স্বতন্ত্র। আজ তাহারা বসিয়াছে, দশ বৎসর, পনেরো বৎসর বা বিশ বৎসর পরে হয়তো তাহারা চলিয়া যাইবে। তাহাদের জমি জমিদারের খাসে আসিবে। আর ইহাদের স্বত্ব, বংশানুক্রমে দান বিক্রয় সকল রকমের অধিকার ইহারা কায়েমী করিয়া লইবে। তা ছাড়া, সাঁওতালরাই ওই চরকে পরিস্কার করিয়া ফলপ্রসবিনী করিয়াছে। তাহাদের দাবির সহিত কাহারও দাবি সমান হইতে পারে না।
রংলাল বলিল, জুতো খুলতে হবে না দাদাবাবু, আসুন, কাঁধে করে আমি পার করে দিই।
কালীন্দির ঘাটে সকলে আসিয়া পড়িয়াছিল। অহীন্দ্র রংলালকে নিরস্ত করিয়া বলিল, থাক।–বলিয়া জুতা জোড়াটি খুলিয়া নিজেই তুলিয়া লইতেছিল।
কিন্তু তাহার পূর্বেই রংলাল খপ করিয়া তুলিয়া লইয়া একরূপ মাথার উপর ধরিয়া বলিল, বাবা রে, আমরা থাকতে আপনি জুতো বয়ে নিয়ে যাবেন! সর্বনাশ!
নদীর ওপারে চরের প্রবেশ-পথে সাঁওতালেরা দল বাঁধিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। তাহারাও সাগ্রহে প্রতীক্ষা করিয়া আছে। কিশোরবয়স্ক ছেলেগুলি পর্যন্ত আজ গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া চরাইতে যায় নাই।
রংলাল বলিল, ওঃ, ই যি ছা-ছামুড়ি পর্যন্ত হাজির রে সব। আজ তোদের ভারী ধূম, না কি রে মাঝি?
কমল মাঝি গম্ভীরভাবে বলিল, তা বেটে বৈকি গো। জমিগুলা আজ সব আমাদের হবে। রাজাকে সব খাজনা দিব, বোঙাকে পূজা দিব।
নবীন রংলালের দিকে চাহিয়া বলিল, দেখ, আমরা বলি সব বুনো বোঙার জাত। তা দেখ, বুদ্ধি দেখ। লক্ষণ-কল্যাণগুলি তো সব বোঝে ওরা!
মোড়ল মাঝি আবার বলিল, হুঁ, বুদ্ধি আছে বৈকি গো। লইলে ধরমটি আমাদের থাকবে কেনে? পাপ হবে যি।
নদীর জলে মুখ ধুইবার জন্য অহীন্দ্র একটু পিছাইয়া পড়িয়াছিল, সে আসিয়া উপস্থিত হইতেই আলোচনাটা বন্ধ হইয়া গেল, অহীন্দ্র ব্যস্ত হইয়া বলিল, তা হলে তাড়াতাড়ি কাজ আরম্ভ কর, নইলে রোদ্র হবে।
মোড়ল মাঝি আপন ভাষায় কি বলিল। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই একটা ছেলে প্রকাণ্ড একটা ছাতা আনিয়া হাজির করিল। বাঁশের বাখারি ও শলা দিয়ে তৈয়ারি কাঠামোর উপরে নিপুণ করিয়া গাঁথা শালপাতার ছাউনি; ছাউনির উপরে কোন গাছের বল্কলের সুতায় আলপনার মত কারুকার্য; অহীন্দ্র ছাতাটি দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গেল।
বলিল, বাঃ, ভারী সুন্দর ছাতা তো মাঝি। তোমরা তৈরী করেছ?
হু গো। আমরা সব করতে পারি গো বাবু। অ্যানে- ক পারি। ই ছাতাটি তুর করলে যেয়ে আমাদের মাঝিন। আমি খুব বড়মানুষ কিনা, তাথেও ইটিও করলে এ-ত বড়!
***
প্রথমেই নবীন চরের চারটি কোণ বাছিয়া চার কোণে লাল পতাকা চারিটা পুঁতিয়া দিয়া আসিল। তারপরই আরম্ভ হইল জরিপ। দেশীয় মতে চার হাত লম্বা বাঁশের দাঁড়া দিয়া মাপ আরম্ভ হইল।
