কেন আপনি মিথ্যা বকছেন?-উকিলের সওয়ালে বাধা দিয়া মহীন্দ্র বলিয়া উঠিল। সে কাঠগড়ায় রেলিঙের উপর ভর দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। উকিলের বক্তব্যের প্রারম্ভ শুনিয়াই সে তৈলহীন রুক্ষ পিঙ্গল-কেশ আসামী পিঙ্গল চোখে তীব্র দৃষ্টি লইয়া মূর্তিমান উগ্রতার মত বলিয়া উঠিল, কেন আপনি মিথ্যা বকছেন? হ্যাঁ, উদ্ধত প্রজা হিসেবেই ওকে আমি গুলি করে মেরেছি।
সরকারি উকিল বলিলেন, দেখুন দেখুন, আসামীর মূর্তির দিকে চেয়ে দেখুন। প্রাচীন আমলের সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবের জ্বলন্ত নিদর্শন।
ইহার পর চরম শাস্তি হওয়াই ছিল আইনসঙ্গত বিধান। কিন্তু বিচারক ওই অপমানের কথাটাকে আশ্রয় করিয়া এবং অল্প বয়সের কথাটা বিবেচনা করিয়া সে শাস্তি বিধানের হাত হইতে মহীকে অব্যাহতি দিলেন। ওদিকে সম্পত্তি তখন নিলামে বসিয়াছে। ডাকিয়াছেন চক্রবর্তী-বাড়ির মহাজন মজুমদার মশায়েরই শ্যালক। লোকে কিন্তু বলিল, শ্যালক মজুমদারের বেনামদার।
মহীন্দ্র অবিচলিত ভাবেই দণ্ডাজ্ঞা গ্রহণ করিল। সকলে বিস্মিত হইয়া দেখিল। রায় দিয়া এজলাস ভাঙিয়া বিচারক বলিলেন, I admire his boldness! সাহসের প্রশংসা করতে হয়।
সরকারি উকিল হাসিয়া বলিলেন, Yes Sir! এর পিতামহ সাঁওতাল-হাঙ্গামার সময় সাঁওতালদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লড়াই ক’রে মরেছিল। সামন্তবংশের খাঁটি রক্ত ওদের শরীরে- true blood!
মহীন্দ্র সম্পত্তি নিলামের কথা শোনে নাই। সে শুধু আপন দণ্ডাজ্ঞাটাকেই তাহাদের সংসারের একমাত্র দুর্ভাগ্য বিবেচনা করিয়া মজুমদারকে ডাকিয়া বলিল, দুঃখ করবেন না। আপীল করবার প্রয়োজন নেই। আমি নিজে যেখানে স্বীকার করেছি, তখন আপীলে ফল হবে না। আর সর্বস্বান্ত হয়ে মুক্তি পেয়ে কি হবে? শেষে কি রায়-বাড়িতে ভিক্ষে ক’রে খেতে হবে?
কোর্টের জনতার মধ্যে একখানা চেয়ারে স্তম্ভিতের মত বসিয়া ছিলেন ইন্দ্র রায়। মহীন্দ্র শেষ কথাটা তাঁহারই দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিল। কথাটা রায়ের কানেও গেল, কিন্তু কোনমতেই মাথা তুলিয়া তিনি চাহিতে পারিলেন না।
মহীন্দ্র আবার বলিল, পারেন তো বাবার কাছে খবরটা চেপে রাখবেন। মাকে কাঁদতে বারণ করবেন। বাবার ভার এখন সম্পূর্ণ তাঁর ওপর। আর অহিকে যেন পড়ানো হয়, যতদূর সে পড়তে চাইবে।
মাথা উঁচু করিয়া হাতকড়ি পরিয়া সে কস্টেবলের সঙ্গে চলিয়া গেল। সকলের শেষে ইন্দ্র রায় মাথা হেঁট করিয়া কোর্ট হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। বাড়ি ফিরিয়া একেবারে অন্দরে গিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। তাঁহার মুখ দেখিয়া হেমাঙ্গিনী শিহরিয়া উঠিলেন, অত্যন্ত কুণ্ঠিত এবং শঙ্কিত ভাবে প্রশ্ন করিলেন, কি হ’ল?
ইন্দ্র রায় কথার উত্তর দিলেন না।
***
সুনীতি সব সংবাদই শুনিলেন। মহীন্দ্রের সংবাদ শুনিলেন সেই দিনই তবে এ-সংবাদটা শুনিলেন দিন দুই পর–অপরের নিকট; গ্রামে তখন গুজব রটিয়া গিয়াছিল। সুনীতি এই দুঃসহ দুঃখের মধ্যেও উদাসীন হইয়া থাকিতে পারিলেন না, তিনি মজুমদারকে ডাকিয়া বলিলেন, ঠাকুরপো, এ কি সত্যি?
মজুমদার নিরুত্তর হইয়া অপরাধীর মত দাঁড়াইয়া রহিল।
সুনীতি বলিলেন, বল ঠাকুরপো বল। ভিক্ষে করতেই যদি হয় তবে বুক আগে থেকেই বেঁধে রাখি, আর গোপন করে রেখো না, বল।
মজুমদার এবার বলিল, কি বলব বউঠাকরুন, আমি তখন মহীর মামলার রায় শুনে—
সুনীতি অসহিষ্ণু হইয়া কথার মাঝখানেই প্রশ্ন করিলেন, সব গেছে?
চোখ মুছিয়া মজুমদার বলিল, আজ্ঞে না, দেবোত্তর সম্পত্তি, আমাদের লাখেরাজ, এই গ্রাম, তারপর চক আফজলপুর, তারপর জমিজেরাত-এসব রইল।
সুনীতি চুপ করিয়া রহিলেন, আর তাঁহার জানিবার কিছু ছিল না। মজুমদার একটু নীরব থাকিয়া বলিল, একটা কাজ করলে একবার চেষ্টা করে দেখা যায়। বিষয় হয়তো ফিরতেও পারে। ওই চরটার জন্য অনেক দিন থেকে একজন ধরাধরি করছে, ওটা বিক্রি ক’রে মামলা করে দেখতে হয়, বিষয়টা যদি ফেরে।
সুনীতি বলিলেন, না ঠাকুরপো, ও চরটা থাক। ওই চরের জন্যেই মহী আমার দ্বীপান্তর গেল, ও চর মহী না ফেরা পর্যন্ত প’ড়েই থাক।
মজুমদার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, তবে থাক। তা হ’লেও আমি ছাড়ব না, যাব একবার আমি রবি ঘোষালের কাছে টাকা নিয়ে সে সম্পত্তি ফিরে দিক।
সুনীতি হাসিলেন, বলিলেন, তিনিও তো অনেক টাকা পাবেন; সে টাকাই বা কোথা থেকে দেবে বল? তুমি তো সবই জান।
মজুমদার আর কিছু বলিল না। যাইবার জন্যই উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু সুনীতি বাধা দিয়া বলিলেন, আর একটু দাঁড়াও ঠাকুরপো। কথাটা কিছুদিন থেকেই বলব ভাবছি, কিন্তু পারছি না। বলছিলাম, তুমি তো সবই বুঝছ; যে অবস্থায় ভগবান ফেললেন, তাতে ঝি, চাকর, রাঁধুনী সবাইকে জবাব দিতে হবে। তোমার সম্মানই বা মাসে মাসে কি দিয়ে করব ঠাকুরপো?
মজুমদার তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, তা বেশ তো বউঠাকরুন, আর কাজই বা এমন কি রইল এখন? লোকের দরকারই বা কি? তবে যখন যা দরকার পড়বে, আমি ক’রে দিয়ে যাব। যে আদায়টুকু আছে, সেও আমি না হয় গোমস্তা হিসেবে ক’রে দেব। সরঞ্জামি কেবল নগদীর মাইনেটাই দেবেন।
সুনীতি আর কোন কথাই বলিলেন না, মজুমদার ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল। সেই দিনই সুনীতি মানদা, বামুনঠাকরুন, এমন কি চাকরটিকে পর্যন্ত জবাব দিলেন। কিন্তু জবাব দেওয়া সত্ত্বেও গেল না শুধু মানদা। সে বলিল, আমি যাব না। আজ পঁচিশ বছর এখানে রয়েছি, চোখও বুজব এই বাড়িতে। বাড়ি নাই, ঘর নাই, আমি কোথায় যাব? তা ঝাঁটাই মার আর জুতোই মার! হ্যাঁ!
