মজুমদার প্রশ্ন করিল সমগ্র দলটিকে লক্ষ্য করিয়া, কি রে, কি বলছিস তোরা?
সমগ্র দলটি আপনাদের ভাষায় আপনাদেরই মধ্যে কি বলিয়া উঠিল। মজুমদার আবার বলিল, কি বলছিস, বাঙালী কথায় বল কেনে?
দীর্ঘাঙ্গী তরুণীটি বলিল, বুলছি, আমাদের বাবুটি কুথা গো?
হাসিয়া মজুমদার বলিল, এই যে বড়বাবু রয়েছেন। বল না, কি বলছিলি?
উ কেনে হবে গো? সি আমাদের রাঙাবাবু, সি বাবুটি কুথা গো?
তিনি পড়তে চ’লে গেছেন ইস্কুলে, সেই শহরে। ইনি হলেন বড়বাবু, ইনি হলেন মালিক–মরংবাবু।
কেনে, তা কেনে হবে?
মজুমদার হাসিয়া বলিলেন, আচ্ছা একগুঁয়ে বোকা জাত! যা ধরবে, তা আর ছাড়বে না। তা কেনে হবে? তাই হয় রে, তাই হয়। ইনি বড় ভাই, তিনি ছোট ভাই। বুঝলি?
হুঁ, সিটি তো আমরা দেখছি। ইটিও সেই তেমুনি, সিটির পারা বটে। তা সিটিই তো আমাদের রাঙাবাবু। উয়ার লেগে আমরা সুসুরে মেরে এনেছি।
মহীন্দ্র উৎসাহিত হইয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িল, সুসুরে-খরগোশ! কই, দেখি দেখি!
তাহারা এবার খরগোশ দুইটা আনিয়া কাছারির বারান্দায় নামাইয়া দিল। ধূসর রঙের বন্য খরগোশ সাধারণ পোষা খরগোশ হইতে আকারে অনেকটা বড়। মহীন্দ্র বলিল, বাঃ, এ যে অনেক বড়, এদের রঙটাও মাটির মত। এ পেলি কোথায় তোরা? সেই মেয়েটি বলিল, কেনে, আমাদের ওই নদীর চরে, মেলাই আছে। শিয়াল আছে, খটাস ঘেঁকশিয়াল আছে, সুসুরে আছে, তিতির আছে, আমরা মারি, পুড়িয়ে খাই।
মহীন্দ্র আরও বেশী উৎসাহিত হইয়া উঠিল, শিকারে তাহার প্রবল আসক্তি, নেশা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। সে বলিল তা হ’লে চলুন মজুমদার-কাকা, আজ বিকেলে যাব শিকার করতে; চরটাও দেখা হবে, শিকারও হবে, কি বলেন?
বেশ তো।
মেয়েটি বলিল, তু যাবি? বন্দুক নিয়ে যাবি? মারতে পারবি? খুঁজে বার করতে পারবি?
হাসিয়া মহীন্দ্র বলিল, আচ্ছা, সে তখন দেখবি তোরা। যা তোরা, সর্দার-মাঝিকে বলবি, আমরা বিকেলে যাব।
সে আমাদের রাঙাবাবুটি? তাকে নিয়ে যাবি না?
সে যে নেই এখানে।
কেনে, সে আসবে না কেনে? তুরা তাকে নিয়ে যাবি না কেনে?
মজুমদার হাসিয়া ফেলিলেন, কি আপদ!
কেন, কি করলাম আমরা? উ কেনে বলছিস তু?
আচ্ছা, বাবু এলে তাকে নিয়ে যাব। তোরা যা এখন।
এবার তারা আশ্বাস পাইয়া সোৎসাহে আপন ভাষায় কলরব করিয়া উঠিল। মেয়েটিই দলের নেত্রী, সে বলিয়া উঠিল, দেলা-দেলা বোঁ! অর্থাৎ চল্ চল্ চল্।
মহীন্দ্র কাছারি-ঘরে ঢুকিয়া বন্দুকটা বাহির করিয়া আনিল। নলের মুখটা ভাঁজিয়া ভিতর দেখিয়া বলিল, বড্ড অপরিষ্কার হয়ে আছে। সে বন্দুকের বাক্সটা বাহির করিয়া আনিয়া বন্দুকের পরিচর্যায় নিযুক্ত হইল।
.
ইন্দ্র রায়ের এই কাজটি অচিন্ত্যবাবুর মনঃপূত হয় নাই; তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিলেন। এই প্রাতঃকালে পর্যন্ত তিনি গাছ-গাছড়া চালানের লাভক্ষতি কষিয়া রায়কে বুঝাইয়াছেন, রায়ও আপত্তি করেন নাই, বরং উৎসাহই প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু সেই লাভকে উপেক্ষা করিয়া অকস্মাৎ তিনি কেন যে চর বন্দোবস্ত করিলেন, তাহার কারণ তিনি খুঁজিয়া পাইলেন না।
আর ননী পালের মত দুর্দান্ত ব্যক্তিকে বিনা পণে চর বন্দোবস্ত করিয়া প্রশ্রয় দেওয়ার হেতুও তিনি বুঝিতে পারিলেন না। ওই লোকটার জন্য সমগ্র চরটা দুর্গম হইয়া উঠিল, কে উহার সহিত ঝগড়া করিতে যাইবে? তাহার সীমানা বাদ দিয়া চরে পদার্পণ করিলেও ননী বিবাদ করিবেই। সেই বিক্ষোভ প্রকাশ করিতে করিতেই তিনি পথ দিয়া চলিয়াছেন।
হ’ল, বেশই হ’ল, উত্তম হ’ল, খুব ভাল করলেন। ওখানে আর কেউ যাবে? থাকল ওই জায়গা প’ড়ে। গেলেই, ও গোয়ার চপেটাঘাত না ক’রে ছাড়বে না। বাব্বাঃ, আমি আর যাই! সর্বনাশ কোনদিন পাষণ্ড আমাকে একেবারে এক চড়ে খুনই করে ফেলবে। এক মনেই বকিতে বকিতে তিনি চলিয়াছিলেন। চক্রবর্তীবাবুদের কাছারির বারান্দায় মজুমদার হাসিয়া তাঁহাকে প্রশ্ন করিলেন, কি হ’ল অচিন্ত্যবাবু, হঠাৎ চটে উঠলেন কেন মশায়?
হঠাৎ? অচিন্ত্যবাবু যেন ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন, হঠাৎ? বলেন কি মশায়, আজ তিন দিন তিন রাত্রি ধরে, হিসেব ক’ষে লাভ-লোকসান দেখলাম, টু হান্ড্রেড পারসেন্ট লাভ। কলকাতার সাত-আটটা ফার্মকে চিঠি লিখলাম সাত-আট আনা খরচ করে; আর আপনি বলেন হঠাৎ?
মজুমদার বলিলেন, সে-সব আমরা কেমন ক’রে—
বাধা দিয়া অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, ঠিক কথা, আমারই ভুল, কেমন ক’রে জানবেন আপনারা। তবে শুনুন, আপনাদের এই ইন্দ্র রায় মশায় একটা ‘ডেঞ্জারাস গেমে’ হাত দিয়েছেন। বাঘ নিয়ে খেলা, ননী পাল সাক্ষাৎ একটি ব্যাঘ্র।–বলিয়া সবিস্তারে সমস্ত ঘটনাটা বর্ণনা করিয়া পরিশেষে ক্ষোভে দুঃখে ভদ্রলোক প্রায় কাঁদিয়া ফেলিলেন–মশায়, তিনটি রাত্রি আমি ঘুমই নি। দশ রকম ক’রে দশবার আমি লাভ-লোকসান ক’ষে দেখেছি। বেশ ছিলাম, বদহজম অনেকটা কমে এসেছিল, এই তিন রাত্রি জেগে আমার বদহজম আবার বেড়ে গেল। কথা বলিতে বলিতেই যেন রোগটা তাঁহার বাড়িয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে গোটা কয়েক ঢেকুর তুলিয়া তিনি বলিলেন, ভাস্কর লবণ খানিক না খেলে এইবার গ্যাস হবে। যাই, তাই খানিকটা খাইগে। গ্যাসে হার্টফেল হওয়া বিচিত্র নয়। ভদ্রলোক উঠিয়া পড়িলেন এবং ক্রমাগত উদগার তুলিতে তুলিতে চলিয়া গেলেন।
