তাড়াতাড়ি তিলের তেলের বোতলটি লইয়া তিনি উপরে রামেশ্বরের ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন। রামেশ্বরের দরজা জানলা অহরহ বন্ধ থাকে, দিনরাত্রিই ঘরে একটা প্রদীপ জ্বলে, সে প্রদীপে পোড়ে তিলের তেল। উজ্জ্বল আলো তাঁহার চোখে একেবারে সহ্য হয় না। আলোর মধ্যে তিনি নাকি একেবারে দেখিতে পান না। অন্ধকারে বরং পান। তেলের বোতল হাতে সুনীতি সন্তর্পণে দরজা ঠেলিয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। প্রকাণ্ড বড় ঘরখানির মধ্যে ক্ষীণ শিখার একটি মাত্র প্রদীপের আলো জ্বলিতেছে। এত বড় ঘরের সর্বাংশে তাহার জ্যোতি প্রসারিত হইতে পারে নাই, চারি কোণের অন্ধকার অসীমের মত সীমাবদ্ধ জ্যোতির্মণ্ডলকে যেন ঘিরিয়া রহিয়াছে। আলো-অন্ধকারে সে যেন এক রহস্যলোকের সৃষ্টি করিয়াছে। তাহারই মধ্যে ঘরের মধ্যস্থলে সে আমলের প্রকাণ্ড পালঙ্কের উপর নিস্তব্ধ হইয়া রামেশ্বর বসিয়া আছেন।
ঘরের দরজা খুলিতেই রামেশ্বর অতি ধীরে মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিলেন, সুনীতি?
ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া দিতে দিতে সুনীতি বলিলেন, হ্যাঁ আমি। তেল দিয়ে দিই প্রদীপে। জানলাগুলি খুলে দিই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে।
দাও।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিলে ঘরের জানলা খোলা হয়। কখনও কখনও রামেশ্বর তখন খোলা জানলার ধারে দাঁড়াইয়া বহির্জগতের সহিত পরিচয় করেন। জানলা খুলিয়া দিতেই বন্ধ ঘরে বাহিরের বাতাস অপেক্ষাকৃত জোরেই প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপটি নিভিয়া গেল। রামেশ্বর বাহিরের নির্মল শীতল বাতাস বুক ভরিয়া নিঃশ্বাস লইয়া বলিলেন, আঃ!
সুনীতি বলিলেন, আলোটা নিবে গেল যে।
রামেশ্বর বলিলেন, বাতাসে চমৎকার ফুলের গন্ধ আসছে। এটা কি মাস বল তো?
চৈত্র মাস। তারপর চিন্তিতভাবে সুনীতি আবার বলিলেন, প্রদীপ তো এ বাতাসে থাকবে না।
রামেশ্বর বলিতেছেন, ‘ললিত-লবঙ্গ-লতা-পরিশীলন-কোমল-মলয়-সমীরে।
বাতি দিয়ে একটা শেজ জ্বেলে দেব?
শেজ?
হ্যাঁ, বাতির আলোও তো ঠাণ্ডা। এ বাতাসে প্রদীপ থাকবে না।
তাই দাও।– বলিয়া আবার আপন মনে আবৃত্তি করিলেন, মধুকরনিকর-করম্বিত-কোকিল-কূজিত কুঞ্জ-কুটীরে।
ঘরে শেজ ও বাতি ঠিক করাই থাকে, মধ্যে মধ্যে জ্বালিতে হয়। বাতাসের জন্যও হয়, আবার মধ্যে মধ্যে রামেশ্বরের ইচ্ছাও হয়। সুনীতি বাতি জ্বালিয়া, শেজের মধ্যে বসাইয়া দিলেন, তারপর কতকগুলি ধুপশলা জ্বালিয়া দিয়া বলিলেন, কাপড় ছাড়, সন্ধ্যের জায়গা ক’রে দিই।
হুঁ। করতে হবে বৈকি। না করলেই পাপ! করলে কিছুই না—কিচ্ছু না, কিচ্ছু না, কিচ্ছু না।
সুনীতি বাধা দিয়া বলিলেন, ও কি বলছ? রামেশ্বর মধ্যে মধ্যে এমনই করিয়া বকিতে আরম্ভ করেন, তখন বাধা দিতে হয়। অন্যথায় সেই একটা কথাই তিনি কিছুক্ষণ ধরিয়া এমনই করিয়া বকিয়া যান।
বাধা পাইয়া রামেশ্বর চুপ করিলেন। সুনীতি আবার বলিলেন, কাপড় ছাড়, সন্ধ্যে কর। আর অমন করে বকছ কেন?
না না না, আমি বকি নি তো। বকব কেন? কই, কাপড় দাও। রামেশ্বর অতি সন্তর্পণে বিছানা হইতে নামিয়া আসিলেন। স্বামীকে সন্ধ্যা করিতে বসাইয়া সিয়া সুনীতি বলিলেন, সন্ধ্যে করে ফেল আমি দুধ গরম করে নিয়ে আসি।
সুনীতি ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন, রামেশ্বর সন্ধ্যে শেষ করিয়া জানলার ধারে দাঁড়াইয়া আছেন। সুনীতিকে দেখিবামাত্র তিনি বলিলেন, কি বাজছে বল তো?
দূরে ওই চরটার উপর তখন অহীন্দ্রকে ঘিরিয়া সাঁওতালেরা মাদল ও বাশী বাজাইতেছিল, মেয়েরা নাচিতেছিল-তাহারই শব্দ। সুনীতি বলিলেন সাঁওতালেরা মাদল বাজাচ্ছে।
বাঁশী শুনছ, বাঁশী?
হ্যাঁ। সন্ধ্যার সময় তো। মাঝিরা মাদল বাজাচ্ছে, বাঁশী বাজাচ্ছে, মেয়েরা নাচছে। ওদের ওই আনন্দ।
তুমি কবিরাজগোস্বামী শ্রীজয়দেবের গীতগোবিন্দ পড়েছ?
“করতলতালতরলবলয়াবলি-কলিত কলম্বন বংশে।
রাসরসে সহনৃত্যপরা হরিণা যুবতিঃ প্রশংসে”।
যমুনাপুলিনে বংশীধ্বনির সঙ্গে তাল দিয়ে গোপবালারাও একদিন নাচত। গীতগোবিন্দ তুমি পড় নি?
স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া সুনীতি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, তুমি কখনও পড়ে শোনাও নি, আমি নিজে তো সংস্কৃত জানি না।
আজ তোমাকে শোনাব, আমার মুখস্থ আছে।
বেশ, এখন দুধটা খেয়ে নাও দেখি! বলিয়া সম্মুখে দুধের বাটি আগাইয়া দিলেন। পান করিয়া বাটি সুনীতির হাতে দিতেই সুনীতি জলের গ্লাস ও গামছা স্বামীর সম্মুখে ধরিলেন। হাতমুখ ধুইয়া রামেশ্বর আবার বলিলেন, কবিরাজগোস্বামী বলেছেন কি জান?
“যদি হরি-স্মরণে সরসং মনো যদি বিলাস কলাসূ কুতূহলং।
মধুর কোমল কান্ত পদাবলীং শৃণু তদা জয়দেব সরস্বতীম্।”
শোনাব, তোমাকে আজ শোনাব।
আনন্দে সুনীতির বুকখানা যেন ভরিয়া উঠিল, তিনি বলিলেন, তাহলে তাড়াতাড়ি আমি কাজগুলো সেরে আসি। পরমুহর্তেই আবার যেন স্তিমিত হইয়া গেলেন– কতক্ষণ, এ রূপ কতক্ষণের জন্য?
হ্যাঁ, এস। বাতাস আজ বড় মিষ্টি বইছে। বসন্তকাল কিনা। আচ্ছা সুনীতি, দোল পূর্ণিমা চলে গেছে?
হ্যাঁ। আজ কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী।
কই, আমাকে তো আবীর দিলে না?
সুনীতি অপরাধীর মত নীরবে দাঁড়াইয়া রহিলেন।
এনো, এনো, আবীর থাকে তো নিয়ে এস এক মুঠো আজ।
সুনীতি এ কথারও উত্তর দিলেন না, শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন।
আর শোন। জয়দেব সরস্বতীর পদাবলী যদি শুনবে, তবে অতি সুন্দর একখানি কাপড় পরবে। সুন্দর করে বেণী রচনা করবে। তার পর রসরাজের মূর্তি হৃদয়ে স্মরণ করে লীলাবিভোর মন নিয়ে শুনতে হবে।
