অহীন্দ্র হাসিল, স্বল্পায়তন তিক্ত হাসি। বলিল, বিরোধ তো বাধবেই মা। একদিকে জমিদার অন্যদিকে মহাজন। এ বিরোধ যে অবশ্যম্ভাবী।
সুনীতি আর্তভাবে বলিলেন, ওরে, ও-চরে আমাদের কাজ নেই, তুই বল্ তো শ্বশুরকে, ওটা বিক্রি করে দিন। ওই চর আমার সর্বনাশ করবে রে!
অহীন্দ্র বলিল, ও-কথাটা তোমার স্বীকার করতে পারলাম না। অপরাধ চরের নয়, অপরাধ আমাদের।
তুই জানিস নে অহীন, সে তোরা বুঝতে পারিস নে, সে তোরা দেখতে পাস নে। আমি বুঝতে পারি, দেখতে পাই-সুনীতি বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন, যেন সে দৃষ্টির সম্মুখে চরটার রহস্যময় রূপ প্রত্যক্ষ হইয়া শূন্যলোকে ভাসিতেছে।
মায়ের সে ভয়কাতর বিবর্ণ মুখ দেখিয়া অহীন্দ্র স্নেহার্দু স্বরে বলিল, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন মা? কিসের ভয়?
ওরে তুই বল চরটা বিক্রি করে দেওয়া হোক। আর, তুই যেন এই দাঙ্গা হাঙ্গামার মধ্যে যাস নে বাবা। ওরে, তোদের বংশের রাগকে আমি বড় ভয় করি রে! রাগের বসে মহীন কি সর্বনাশ করলে, বল দেখি?
অহীন্দ্র চুপ করিয়া রহিল ৷ তাহার চোখের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল ননী পালের রক্তাক্ত দেহ। তারপরেই সে দেখিল, কাঠগড়ার মধ্যে তাহার দাদাকে, শীর্ণ কিন্তু দৃপ্ত মুখ, অনবনত ঋজু দেহ। একটা উন্মাদনা তাহাকে স্পর্শ করিল। ওই কুটিলচক্রী কলওয়ালা, যাহাকে সাঁওতাল রমণীরা বলিয়াছে পাহাড়ে চিতি, নিষ্ঠুর অজগর, উহার দেহটা যদি সে এমনি ভাবে লুটাইয়া দিত।
সুনীতি কাতরস্বরে ডাকিলেন, অহীন!
অহীন্দ্র মায়ের মুখের দিকে চাহিল। সুনীতি বলিলেন, চল, তুই একবার চল, তোর বাপ ও-বাড়ির দাদা বোধ হয় ওই চরের কথাই বলছেন। তুই চল্।
***
রামেশ্বরের ঘরে প্রবেশ করিয়া মাতা পুত্রে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। রামেশ্বরের সে মূর্তি অদ্ভুত! অহীন্দ্র জীবনে কখনও দেখে নাই, সুনীতি বহুপূর্বে দেখিয়াছিলেন, এ-কালে সে মূর্তি আর স্মরণেও আনিতে পারিতেন না। ন্যুব্জদেহ তিনি সোজা খাড়া করিয়া দাঁড়াইয়াছেন লোহার খুঁটির মত শীর্ণ হাতের আঙুলগুলি বাঁকাইয়া তীক্ষ্ণ দৃঢ় বাঘনখের মত ভংগি করিয়া রায়কে তিনি বলিতেছেন, মুণ্ডুটা তার ছিঁড়ে আনতে পারা যায় না ইন্দ্র, কিংবা আমাবস্যার রাত্রে মা-সর্বরক্ষার কাছে বলি-?
রায় বলিলেন, না। সে-কাল আর নেই রামেশ্বর; এখন আমাদের আইনের পথ ধরেই চলতে হবে। আইন বাঁচিয়ে দাঙ্গা করতে পেলে পেছব না। আমাদের খাসের জমি, সেগুলো সাঁওতালদের ভাগে দেওয়া আছে, কালই সেগুলো দখল করতে হবে। সাঁওতালদেরও রীতিমত শিক্ষা দেব আমি। আর ওই যে বললাম, কালিন্দীর বুকে কলওয়ালা যে বাঁধ দিয়ে পাম্প বসিয়েছে, ওটাকে তুলে দিতে হবে। বাধবে, দাঙ্গা ওইখানেই বাধবে বলে বোধ হচ্ছে।
অহীন্দ্র বলিল, মা একটা কথা বলছেন। তিনি চান না যে, চর নিয়ে কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। তাঁর একটা অদ্ভুত সংস্কার রয়েছে যে, চরটা থেকে কেবল আমাদের অমঙ্গলই হচ্ছে! সেইজন্য তিনি বলেছেন, চরটাকে বিক্রি করে দেওয়া হোক।
বজ্রগর্ভ স্বরে রামেশ্বর বলিলেন, না।
প্রচণ্ড উত্তেজনায় দৈহিক দুর্বলতা মানসিক বিহ্বলতা বিলুপ্ত হইয়া রামেশ্বর অকস্মাৎ যেন পূর্ব-রামেশ্বর হইয়া উঠিয়াছেন।
রায় বলিলেন সুনীতিকে লক্ষ্য করিয়া, তোমার কাছে আমি এই কথাটা শুনব প্রত্যাশা করি নি বোন। যাক, তুমি কোন ভয় করো না, যা করবার আমি করব।
ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিতেই অমলের সঙ্গে দেখা হইল, অমল হাত-পা ধুইয়া তাহার সন্ধানেই উপরে আসিয়াছিল। তাহার স্বাভাবিক মুখরতা আজ আবার উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছে। সে বলিল, বাপ রে বাপ রে, খুব খাঁটিয়ে নিলে যা হোক। আমার বিয়েতে আমি এর শোধ নেব, দাঁড়াও না।
অহীন্দ্র একটু হাসিল-অর্থহীন হাসি। অমলের কথাগুলি তাহার মনের মধ্যে প্রবেশ করিতে পায় নাই। সে বলিল, চর নিয়ে আবার দাঙ্গা বাধল- কাল সকালে।
অমল বলিল, দাঙ্গা-টাঙ্গা না করে ওই লোকটাকে- দ্যাট কলওয়ালাটাকে হুইপ করা উচিত।
অহীন্দ্র আবার একটু হাসিল। অমল বলিল, বিয়েটা না চুকতেই এখনই দাঙ্গাটাঙ্গাগুলো না করলেই হত। কিন্তু না করেই বা উপায় কি? লোকটা যেন দণ্ডমুণ্ডের মালিক হয়ে উঠেছে।
অহীন্দ্র হাসিয়া এবার বলিল
বণিকের মানদণ্ড দেখা দিবে, পোহালে শর্বরী
রাজদণ্ডরূপে।
সুতরাং তার গতিরোধের চেষ্টা রাজকুলের স্বাভাবিক।
অমল হাসিয়া বলিল, তুমি যেন নিজেকে রাজকুল থেকে বাদ দিতে চাইছ মনে হচ্ছে। বুদ্ধদেব হয়ে উঠলে যে! ওরে উমা!
হাসিয়া বাধা দিয়া অহীন্দ্র বলিল, ভয় নেই, এ-যুগে গৌতমেরা সংসার ত্যাগ করে নির্বাণের জন্য বনে যান না। এ-যুগের নির্বাণ নিহিত আছে সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে। ঘরে বসেই সে তপস্যা করে। সুতরাং উমা নামধারিণী গোপাকে ডেকে সাবধান করার কোন প্রয়োজন নেই।
.
৩০.
পরদিন প্রভাতেই জমিদার পক্ষ সাজিয়া চরের উপর হাজির হইল, সাঁওতালদের ভাগে বিলি করা জমি দখল করা হইবে।
জমিদার পক্ষকে মোটেই বেগ পাইতে হইল না। লোক জুটিয়া গেল বিস্তর। আদেশ অথবা অনুরোধ। করিয়াও লোক ডাকিতে হইল না। আপনা হইতেই গ্রামের সমস্ত চাষী হাল-গরু লইয়া ছুটিয়া আসিল, দলের সর্বাগ্রে আসিল রংলাল। চরের উর্বর মাটির উপর লোভের নিবৃত্তি তাহাদের কোন দিনই হয় নাই। নিরুপায়ে সে কেবল নিরুদ্ধ হইয়া ছিল। সংবাদটা পাইবামাত্র তাহারা পুলকিত হইয়া সাঁওতালদের সযত্নে গড়ে তোলা জমিগুলি দখল করিতে উদ্যত হইল। বাগদীপাড়ার নবীনের দল এবং রায়েদের লাঠিয়ালের দল লাঠি হাতে চক্রবর্তী-বাড়ির ভাগে বিলি জমির সীমানার মাথায় খুঁটি পুঁতিয়া দাঁড়াইল। চাষীরা বিপুল উৎসাহে গরুগুলিকে প্রচণ্ড চীৎকারে তাড়না করিয়া জমিগুলির উপর লাঙ্গল চালাইয়া দিল-হেৎ-তা-তা-তা-তা- তা-হেৎ-হেৎ!
