জগৎমশায় বলতেন-বাবা, সংসারে মানুষ সন্ন্যাসীদের মত শক্তি না পেলেও, সব রিপুগুলিকে জয় করতে না পারলেও গোটা কয়েককে জয় করে। কেউ দুটো কেউ তিনটে কেউ কেউ পাঁচটা পর্যন্তও জয় করে। কিন্তু একটা–।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেছিলেন—পারে না। একটা থেকে যায়! ওইটেই হল দুর্বল প্রবেশপথ। মৃত্যুবাহিনী ওই দ্বারপথেই মানুষের দেহে প্রবেশ করে। তার ওপর বাবা যে দরজার রক্ষক সে যদি সেধে দরজা খুলে ডাকে তবে কি আর রক্ষা থাকে হরেন? রক্ষক তখন রিপু। প্রবৃত্তি তো খারাপ নয় বাবা। সংসারে প্রবৃত্তিই তো রুচি। প্রবৃত্তি যতক্ষণ সুরুচি-ততক্ষণ কুখাদ্য খায় না, পেট ভরে গেলে সুরুচি তখন বলে—আর না। তৃপ্তিতে তার নিবৃত্তি আসে। আর প্রবৃত্তি যখন কুরুচি হয়—তখন সে-ই শক্ত, সে-ই রিপু। তখন তৃপ্তি তার হয় না; নিবৃত্তি তখন পালায়। তাই রিপুর যোগাযোগে যে রোগ হয়, সে রোগ অনিবার্যরূপে মৃত্যুরোগ।
কথা হচ্ছিল ফেরবার পথে। মশায় পায়ে হেঁটেই ফিরছিলেন। শশী অদৃশ্য হয়েছে। গাড়িখানাও আর পান নি। হরেনও অগত্যা সাইকেল ধরে তাঁর সঙ্গেই হাঁটছিল। হরেন ডাক্তার চুপ করে শুনেই যাচ্ছিল। মাটির দিকে চোখ রেখে পথ চলছিল। কথাগুলি শুনতে মন্দ নয়। অস্পষ্ট বা ভাবালু-মেশানো যুক্তি হলেও অসঙ্গত মনে হচ্ছিল না। কিন্তু এত বড় বিজ্ঞান পড়ে এসে এসব কি পুরো মানা যায়? তবুও পাড়াগাঁয়ের ছেলে সে, বাল্যকালের সংস্কারে ঠিক এরই একটা চাপাপড়া স্রোত ভিতরে ভিতরে আছে; সেই মজাখাতের চোরাবালিতে এই ভাবধারা। বেমালুম শুষে যাচ্ছিল মিশে যাচ্ছিল। এবং জীবন মশায়ের মত প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক করতেও তার অভিপ্রায় ছিল না।
হরেনের নীরবতায় কিন্তু জীবনমশায় উৎসাহিত বোধ করছিলেন। তিনি বলে চললেন ওই দেখ না বাবা, রানা পাঠককে। এত বড় শক্তি! একটা দৈত্য। রিপু হল কাম। বুঝেছ, ওর প্রমেহে চিকিৎসা করেছি, উপদংশ হয়েছে কয়েকবার, আমি কাটোয়ায় মণিবাবু ডাক্তারের কাছে। পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছি—এবার যক্ষ্মা হয়েছে। বললে, একটি মেয়েছেলের কাছ থেকে ধরিয়েছে। তার মানে মেয়েটাকে যক্ষ্মারোগী জেনেও নিজেকে সংবরণ করতে পারে নি।
এবার হরেন মৃদু হাসলে।
জীবনমশায় কিন্তু বলেই চললেন—তোমরা দেখ নি–নাম নিশ্চয় শুনেছ। মস্ত বড় কীৰ্তন-গাইয়ে। সুন্দর দাস গো! নামেও সুন্দর, কাজেও সুন্দর, রূপে সুন্দর, গানে সুন্দর লোকটিকে দেখলে মানুষের চোখ জুড়োত, মন সুন্দর হয়ে উঠত। লোকে বলত–সাধক। তা সাধনা লোকটার ছিল। নির্লোভ, অক্ৰোধ, মিষ্টভাষী, বিনয়ী—মোহ মাৎস এও ছিল না; শুধু কাম। কামকে জয় করতে পারেন নি। শেষ জীবনে তিনি উন্মাদ হয়ে গেলেন পঙ্গু হলেন। লোকে বললে—কোনো সাধনা করতে গিয়ে এমনটা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল তাই। কিন্তু গুরু রঙলাল ডাক্তারের কাছে যখন ডাক্তারি শিখছি তখন একদিন যে কথা তোমাকে বললাম সেই কথাই বললেন– রঙলাল ডাক্তার। যেন আমার পিতৃপুরুষের কথার প্রতিধ্বনি করেই বললেন––জীবন, কথাটা তুমি হয়ত সত্যিই বলেছ হে। সুন্দর দাসকে দেখতে গিয়েছিলাম। মারা গেছে এই তো কিছুদিন। কিন্তু কথাটা প্রায়ই মনে হয়। কখনও ওই বোষ্টম-কীৰ্তনীয়দের উপর রাগ হয়—কখনও কিছু। লোকটা অসহায়ভাবে রিপুর হাতে মরেছে হে। ও পাগল। হয়েছিল—উপদংশ-বিষে, প্রমেহ-বিষে।
মশায় আবার একটু থেমে বলেছিলেনদেখ না বাবা, রতনবাবুর ছেলে বিপিনের কেস। বাবা, এখানেও সেই রিপুর যোগাযোগ। প্রতিষ্ঠার মদও এক রিপু বাবা। আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রবৃত্তি যার নাই সে কি মানুষ? কিন্তু সে যখন রিপু হয় তখন কী হয় দেখ!
চকিত হয়ে হরেন প্রশ্ন করেছিল—তা হলে বিপিনবাবু সম্পর্কে আপনি–?
প্রশ্নটা সে সম্পূর্ণ উচ্চারণ করতে পারে নি।
—না। সেকথা ঠিক বলি নি আমি। তবে বাবা, অত্যন্ত কঠিন—অত্যন্ত কঠিন।
–আজ তো ভালই আছেন। আমার ভালই লাগল। হিকাটা থেমে গেছে। সুস্থ হয়েছেন ঘুমুচ্ছেন।
—ভালই থাক। ভাল হয়েই উঠুক। কিন্তু ভাল হয়ে উঠেও তো ভাল থাকতে পারবে না। ও, হরেন। আবার পড়বে। প্রবৃত্তি রিপু হয়ে দাঁড়ালে তাকে সংবরণ করা বড় কঠিন।
–এ যাত্রা তা হলে উঠতে পারেন বলছেন?
—তাও বলতে পারছি না বাবা। মাত্র তো দুদিন দেখছি। তার উপর মন চঞ্চল হচ্ছে। রতনকে দেখছি। বিপিনের ছেলেকে দেখছি, বুঝেছ, ওই ছেলেটিকে দেখে বনবিহারীর ছেলেকে। মনে পড়ে গেল।
মশায় দীর্ঘনিশ্বাসও ফেললেন আবার হাসলেনও। এবং হঠাৎ বললেন–চণ্ডীতলায় যাব একবার। আসবে নাকি? মহান্ত আজ যাবেন। একবার দেখে যাই। আজ রাত্রেই যাবেন।
মহান্ত তখন আবার বার তিনেক দাস্ত গিয়ে অবসন্ন হয়ে পড়েছেন, আঙুলের ডগাগুলি ঠাণ্ডা হয়েছে, চোখের পাতা নেমে এসেছে একটা গভীর আচ্ছন্নতার ভাবে। মধ্যে মধ্যে মুখ বিকৃত করছেন—একটা যেন যন্ত্রণা হচ্ছে, নিষ্ঠুর যন্ত্ৰণা।
হরেন বললে—বলেন তো একটা ইনজেকশন দিই।
মশায় বললেন– চিকিৎসক হয়ে আমি নিষেধ করতে পারি? দেবে, দাও।
মহান্তের শিষ্য বললে—বাবার নিষেধ আছে। তিনি বার বার নিষেধ করেছেন—সুই কি কোনো ইলাজ যেন না দেওয়া হয়। মশায় বলেছে আজ ছুটি মিলবে। ছুটি চাই আমার। ইয়ে শরীর বিলকুল রদ্দি হো গয়া!
শ্রদ্ধার প্রসন্নতায় মশায়ের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি এবার হরেনের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন–থাক হরেন।
