মশায় উঠলেন। দেখা তাঁর শেষ হয়েছে।
এবার মেয়েটি এসে পায়ে আছড়ে পড়লওগো ডাক্তারবাবু গো! আমার কী হবে গো!
মশায় একবার সবারই মুখের দিকে চাইলেন। তারপর বললেন– ভয় নাই, ওঠ তুমি, ওঠ; ওঠ।
শশী ব্যস্ত হয়ে বলল–ওঠ, ওঠ। উনি যখন বলছেন ভয় নাই তখন কাঁদছ কেন? উনি দু কথার মানুষ নন! ওই হয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। সর সর। ওঠ!
বাইরে এলেন মশায়। এবার তাঁর সর্বাগ্রে চোখে পড়ল—সাইকেলখানা।
মশায় ডাকলেন শশী।
শশী বকছিল–হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাই হবে, ওঁর মত মানুষ, উনি কি দেখবেন যে ওই অবলাটা ভেসে যাবে? ভাল ঘরের মেয়ে, সৎ জাতের কন্যা, মুনিনাঞ্চ মতিভ্ৰম—মতিভ্রমের বশে যা করেছে তার ফল শাস্তি সে ভগবান দেবেন। আমরা মানুষ—আমরা ওকে ভেসে যেতে দেব না। ব্যস্।
ডাকবার আগেই ক্রমশ তার স্বর নিস্তেজ হয়ে আসছিল। এবার স্তব্ধ হয়ে গেল।
–ওকে মেরেই ফেলেছিস শশী? ইচ্ছে করে? না জানিস নে, বুঝতে পারিস নি?
–আজ্ঞে?
–এ অবস্থা তো আজ তিন দিন থেকে হয়েছে। বুঝতে পারলি নে তো ডাকলি নে কেন?
–আজ্ঞে না। মা-কালীর দিব্যি!
–শশী! ধমক দিয়ে উঠলেন জীবন ডাক্তার।
–মাইরি বলছি, ঈশ্বরের দিব্যি, গুরুর দিব্যি—
এবার মৃদুস্বরে মশায় বললেন– তোদর কজনকে পুলিশে দেওয়া উচিত। থাম-চেঁচাস। নে। যাক এখন শোন, ওই যে ছোকরা সাইকেল চেপে আমাদের গাড়ি দেখতে গিয়েছিল, সে কই? এই যে! ওহে ছোকরা, শোন। কই দোয়াত-কলম দেখি। আমি লিখে দিচ্ছি ওষুধ। যাও। নিয়ে এস বিনয়ের দোকান থেকে। আর বাজারের ডাক্তার হরেনবাবুকে এই চিঠি দেবে। বুঝেছ? জলদি যাবে আর আসবে।
শশীকে দমানো যায় না। শশী ওই শক্তিতেই বেঁচে আছে। সে ছোকরার হাত থেকে প্রেসক্রিপশন এবং চিঠি দুই নিয়ে দেখলে। বললে, গ্লুকোজ ইনজেকশন দেবেন? ইনট্রাভেনাস?
–হ্যাঁ। হলেই কিছুটা ঘোর কাটবে। তার আগে মকরধ্বজ দেব আমি।
–ঘোর কাটবে?
–হ্যাঁ। রামহরির রোগটা মৃত্যু-রোগই বটে। এতেই যাবে। তবে মৃত্যুলক্ষণ এখনও হয় নি।
–হয় নি? আপনি ইনজেকশন দেবেন তো?
–হরেন ডাক্তারকে আসতে লিখলাম। সে দেবে। না আসে আমিই দেব।
–যদি মরে যায়?
—সে আমি বুঝব শশী। আমার মনে হচ্ছে রামহরি এখন বাঁচবে। অন্তত মাস কয়েক। তখন উইলটুইল যা করবার করবে। আমি বরং সাক্ষী হব। উইলটার জন্যেই রামহরির মাথা তুলে দাঁড়ানো দরকার।
শশী চুপ করলে এবার।
মশায় আবার বললেন–উইলে কী আছে জানি না। এই শেষ পরিবারকেই এক রকম দানপত্র করেছে সব—এই তো?
একটু চুপ করে ঘাড় নেড়ে বললেন–সে তো হবে না শশী। রামহরির অভিপ্রায় জানতে হবে আমাকে। তার প্রথম পক্ষের ছেলে ছিল—সে মারা গেছে। কিন্তু তার ছেলে রামহরির নাতি আছে, পুত্রবধূ আছে। সে তো হবে না। বাঁচবেই মনে হচ্ছে। কিন্তু তার জন্যও চিকিৎসা প্রয়োজন। চেষ্টা করতে হবে। সে আমি করব।
রামহরি এই জ্ঞানগঙ্গা যেতে চেয়েছিল? রামহরির ছটা রিপুই বোধ করি ঐকতান তুলে মৃত্যুকে ডাক দিচ্ছে আজীবন। স্থির মৃত্যুর দিকে সহজ ছন্দে এগিয়ে যেতে জীবন ভয় পায় না। ভয় পায় মৃত্যু যখন নিজে এগিয়ে আসে। তখন সে ভয়ে আর্তনাদ করে। সে কি জ্ঞানগঙ্গা যেতে পারে? বনবিহারী পারে নি। দাঁতু পারবে না। রামহরিও পারে না। রামহরির ক্লান্ত জীর্ণ দেহ, ক্ষীণ কণ্ঠ, মুহূৰ্তে মুহূর্তে চোখে আচ্ছন্নতার ঘোর নেমে আসছে; দু-একবার চোখ মেলছে, তার মধ্যেই দৃষ্টিতে কী আতঙ্ক কী আকুতি!
হরেন ডাক্তার আসা পর্যন্ত বসে রইলেন মশায়। মাঝখানে আর-একবার নাড়ি দেখলেন। নাড়ির গতি ঈষৎ সবল হয়েছে; ছন্দ এসেছে। মুখ প্ৰসন্ন হয়ে উঠল। হরেন এসে পৌঁছতেই তিনি তাকে সব বলে বললেন–একটা গ্লুকোজ ইনজেকশন তুমি দাও। আমি বলছি—তুমি দাও। আমি দায়ী হব হে। ভয় নাই তোমার।
হাতখানা আর-একবার দেখেছিলেন মকরধ্বজের উষ্ণতা এবং শক্তি তখন নাড়িতে এবং শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাত নামিয়ে বললেন–দাও তুমি।
ইনজেকশন শেষ করে হরেন হাত ধুয়ে রোগীর অবস্থা দেখে হাসিমুখেই বললে–এটি আপনার অদ্ভুত মশায়! অদ্ভুত!
জীবনমশায় হাসলেন। আর কী করবেন? এ কথার উত্তরই বা কী দেবেন।
হরেন বললে—আর একটা সুখবর দিই, বিপিনবাবুর হিক্কা থেমে গেছে। এই আসবার আগে খবর পেলাম। উঃ, ভদ্রলোকের হিক্কা দেখে আমি তো আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ চার রাত্রি ঘুমুতে পারেন নি, পেটে খাদ্য থাকে নি। আমি আসবার আগে দেখে এলাম ভদ্ৰলোক ঘুমুচ্ছেন। আপনাকে ওরা ডেকেছিল সকলের আগে, খবর দিয়েছিল কিন্তু তখন আপনি বেরিয়ে এসেছেন। বুড়ো রতনবাবু যে কী কৃতজ্ঞ হয়েছেন সে কী বলব! প্রদ্যোত ডাক্তারও এসেছিল। সে বেশ একটু আশ্চর্য হয়েছে। গম্ভীর হয়ে বললে—এ বিষয়ে এখনি কিছু বলতে পারি নে। আবার আরম্ভ হতে পারে, এবং এ ওষুধের রিঅ্যাকশনও আছে; তবে এখন অবশ্য ক্রাইসিসটা কাটল বটে। বেশ আশ্চর্য হয়েছে প্রদ্যোত ডাক্তার। আসতে আসতে পথে বললে—বৃদ্ধের ব্যাপার ঠিক আমি বুঝি নে। এ ব্যাপারটায় আমার সন্দেহ হচ্ছে কেন জানেন? আজ আবার একটা ডিসপেপসিয়ার রোগী অবশ্য একটু শক্ত ধরনের বটে—তাকে বলেছে তুই আর বাঁচবি নে। কত দিনের মধ্যে যেন মরবে বলেছে। হরেন এবার মশায়ের দিকে তাকিয়ে তাকেই প্রশ্ন করলে–তাই বলেছেন নাকি?
জীবনমশায় হরেনের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়স্বরেই বললেন–আমি ভুল বলি নি বাবা হরেন। দাঁতু এই রোগেই মরবে। তবে কোনো সময় আমি নির্দিষ্ট করে বলি নি। এই রোগই ওর মৃত্যুরোগ হয়ে উঠবে। এতে আমি নিশ্চিত। গম্ভীর এবং গভীর স্বরে বললেন–তুর এ রোগের সঙ্গে ওর প্রধান রিপুর যোগাযোগ হয়েছে। ঘরে আগুন লাগলেই সব ঘরটা পুড়বে, তার মানে নাই, জল ঢাললে নিভতে পারে, নেভেও। কিন্তু আগুনের সঙ্গে বাতাস যদি সহায় হয় বাবা, তবে জলের কলসি ঢাললে নেভে না, বাতাসের সাহায্যে আগুন অ্যাঁচের ঝাপটায় ভিজে চাল শুকিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে ছাড়ে। দতুর রোগ উদরাময়তার সঙ্গে ওর লোভ রিপু হয়েছে। সহায় সহায় কেন? ওটা এখন রোগের অঙ্গ উপসর্গে পরিণত হয়েছে। আমার বাবা বলতেন—
