–কী দেখলে? রঙলাল ডাক্তার প্রশ্ন করলেন এবং ব্যগ্রতার সঙ্গেই করলেন।
–আজ্ঞে? সবিনয়েই জীবন বলেছিলেন নাড়ি দেখে তো একেবারে অসাধ্য মনে হচ্ছে না। তিনি নিজের নির্ণয়ের কথা বলে বলেছিলেন ধনুষ্টঙ্কার নয়।
রঙলাল ডাক্তার ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলেছিলেন-হাঁ, টিটেনাস তো নয়ই এবং তুমি যা বলছ তাই খুব সম্ভব ঠিক। তুমি বলছ অসাধ্য নয়। জীবনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন কিন্তু সাধ্য হবে কী করে? চোয়াল পড়ে গেছে—ওষুধ যাবে না। শরীরের কোথাও হাত দেবার উপায় নেই, মালিশ করা যাবে না। সাধ্য হবে কিসে?
ঘাড় নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এলেন রঙলাল ডাক্তার।
বাইরে একান্তে জীবন বলেছিল—আপনি ওষুধ দিন, চামচ বা ঝিনুকে করে ফোঁটা ফোঁটা। করে মুখে দেওয়া হোক। আর—আপনি অনুমতি করলে আমি একটা মুষ্টিযোগের ব্যবস্থা করি। তাতে ওই বায়ুপ্রকোপের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসবে। স্নায়ু শিরার টানভাবটা কমে আসবে। চোয়ালও খুলবে বোধহয়।
—মুষ্টিযোগ?
—আমাদের বংশের সংগ্রহ করা মুষ্টিযোগ। আমার পিতামহ পেয়েছিলেন এক সন্ন্যাসী চিকিৎসকের কাছে। তালগাছের কচি মাজপাতা, যা এখনও বাইরের আলোবাতাস পায় নি, তাই গরম জলে সিদ্ধ করে সেই জলের ভাপ–
দিতে পার, দেখতে পার। আমার কাছে ও মরার শামিল। রোগীর আত্মীয়দের বলেছিলেন–ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি। জীবন রইল। আশা আমি করছি না। জীবন আশা ছাড়ে নি; ও দেখুক। এ অবস্থা যদি কাটে, চোয়ালটা ছাড়ে—আমাকে খবর দিয়ে। জীবন একটা মুষ্টিযোগ দেবে। ঠিকমত সব হয় যেন। বুঝলে?
সমস্ত রাত্রি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন জীবন ডাক্তার।
গরম জলের ভাপ দেওয়ার তত্ত্বাবধান করলেন। রাত্রি বারটার পর অসহনীয় যন্ত্রণা কমল। জীবন নাড়ি দেখলেন। মুখ প্রফুল্ল হল। প্রশ্ন করলেন এবার একটু দেখুন তো গায়ে সেক নিতে পারেন কি না?
নিজেই জল-নিঙড়ানো গরম কাপড়ের টুকরোটা সন্তৰ্পণে রোগিণীর হাতের উপর রাখলেন। লক্ষ্য করলেন–দেহে কম্পন ওঠে কি না। উঠল না। প্রশ্ন করলেন—পারবেন সহ্য করতে? কষ্ট হবে জানি, কিন্তু সহ্য করতে হবে।
অসাধারণ রোগিণী। মূর্তিমতী ধরিত্রীর মত সহনশক্তি। সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন তিনি। উৎসাহিত হলেন জীবন। নিজেই বসলেন সেঁক দিতে। ওষুধ চলছিল ফোঁটা ফোটা। ঘণ্টাখানেক পরে রোগিণীর অবস্থা লক্ষ্য করে বললেন–একটু বেশি বেশি দিয়ে দেখুন তো! মুখে ফোঁটা ফোটা ওষুধ দিচ্ছিলেন আর একটি মহিলা। নীরবে চলছিল জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ।
ক্রমে রাত্রি তৃতীয় প্রহর শেষ হল। জীবন ডাক্তার এবার লক্ষ্য করলেন প্রচণ্ড শক্তিতে গুণ দিয়ে বাঁকানো ধনুকের দণ্ডের মত দেহখানি ধীরে ধীরে সোজা হচ্ছে, সন্তৰ্পণে সভয়ে রোগিণী সোজা হতে চাচ্ছেন, যেন ধীরে ধীরে গুণ শিথিল করে দিচ্ছে কেউ।
জীবন মৃদুস্বরে বলল—দেখুন তো মা, হাঁ করতে পারেন কি না?
পারলেন, স্বল্প হলেও তার মধ্যে জিহ্বা সঞ্চালিত করবার স্থান পেলেন, চাপা উচ্চারণে। বললেন–পারছি।
এবার পূর্ণ এক দাগ ওষুধ খাইয়ে সেঁকের ভার রোগিণীর ছেলের উপর দিয়ে বললেন– বাইরের বারান্দায় আমার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিন। একটু বিশ্রাম করব। আমার বিশ্বাস সূর্য উদয় হলেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন উনি আর ভয় নাই।
প্রায় নিশ্চিন্ত হয়েই বললেন– জীবন দত্ত। বায়ুর কাল চলে গিয়েছে; এবার কাল হয়েছে। অনুকূল। ঝড় থেমেছে; অনুকূল মৃদু বাতাসে নৌকার মতই জীবনতরী এবার পৃথিবীর কূলে এসে। ভিড়বে।
তাই হয়েছিল। সেদিনের আনন্দ তাঁর জীবনের শ্ৰেষ্ঠ আনন্দ।
গুরু রঙলাল ডাক্তারকে বিস্মিত করতে পেরেছিলেন তিনি।
বেলা তখন আটটা। রঙলাল ডাক্তার রোগী দেখছিলেন। এ সময় তিনি ফিজ নিতেন না। রোগী দেখতে দেখতেই তিনি উৎসুক দৃষ্টিতে জীবনের দিকে তাকালেন।
কান থেকে স্টেথোসকোপটা খুলে প্রশ্ন করলেন, বাঁচাতে পেরেছ?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। বিপদটা আপাতত কেটে গিয়েছে।
–বাঃ! আজ এইখানে থাক। বিশ্রাম কর। দুপুরবেলা নিজে রোগিণীকে দেখে এসে খুশি হয়ে বলেছিলেন, এর ক্রেডিট বার আনা তোমার জীবন। আমার ওষুধে কিছু ছিল না। যা ছিল তার পাওনা সিকির বেশি নয়। মেয়েটির এখন কলিকের চিকিৎসার প্রয়োজন। আমি বলেছি কবরেজি মতে চিকিৎসা করাতে। তুমি ব্যবস্থা কর।
সেইদিন রঙলাল ডাক্তার রাত্রে ব্রান্ডির রঙিন আমেজের মধ্যে মৃদু হেসে ওই কথাটা বলেছিলেন। বলেছিলেন, আক্ষেপ হচ্ছে হে জীবন—একটা বিয়ে করি নি কেন? তারপর হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন।
হাসি থামিয়ে আবার বলেছিলেন–কেন বললাম জান? স্নে
স্নেহে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন জীবন। অভিভূত ভাবেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-আজ্ঞে?
—তুমি আমাকে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের সঙ্গে তুলনা কর সেটা আমি শুনেছি। আমি তাতে রাগ করি না। শুক্রাচার্য বিরাট পুরুষ। হোক এক চোখ কানা। হাসতে লাগলেন আবার। তারপর বললেন– আজ আমার ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে কচের সঙ্গে তুলনা করতে।
হা-হা করে হাসতে লাগলেন—বিয়ে করলে একটা দেবযানী পেতাম হে।
১৫. আরও এক বৎসর পর
আরও এক বৎসর পর রঙলাল ডাক্তার তাঁকে বিদায় দিলেন।
হঠাৎ চিকিৎসা ছেড়ে দিলেন। বললেন–আর না। এইবার শুধু পড়ব আর ভাবব। জীবন এবং মৃত্যু। লাইফ অ্যান্ড ডেথ, তার পিছনের সেই প্রচণ্ড শক্তি—তাকে ধারণা করবার চেষ্টা করব। আর দেশী গাছ-গাছড়া নিয়ে একখানা বই লিখব।
জীবনকে বলেছিলেন—তোমার ডাক্তারি শেখাটা বোধহয় ঠিক হল না জীবন। ওইসব বিচিত্র অবিশ্বাস্য মুষ্টিযোগ নিয়ে যদি গবেষণা করতে পারতে! কিন্তু তাও ঠিক পারতে না তুমি। তোমার সে বৈজ্ঞানিক মন নয়। কার্য হলেই তোমার মন খুশি। কেন হল—সে অনুসন্ধিৎসা তোমার মনে নাই। যাক। তুমি বরং ডাক্তারি, কবিরাজি, মুষ্টিযোগ তিনটে নিয়েই তোমার ট্রাইসাইকেল তৈরি কর। ওতে চড়েই যাত্রা শুরু কর। নিজের একটা স্টেথোেসকোপ তিনি তাঁকে দিয়েছিলেন, থারমোমিটার দেন নি, কিনতেও বারণ করেছিলেন। বলেছিলেনওর দরকার নেই তোমার।
