রঙলাল ডাক্তার বিস্মিত হলেন, কতক্ষণ আগে পড়ে গেছেন বলছ?
–এই ঘণ্টা দুয়েক।
–মাত্র দু ঘণ্টা?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–তাই তো। এত শিগগির? মনা, বেহারাদের ডাক।
জীবন ডাক্তারও নীরবে গুরুর অনুসরণ করছিলেন।
রঙলাল ডাক্তার প্রথমটা লক্ষ্য করেন নাই; মধ্যপথে জীবনকে দেখেছিলেন, বলেছিলেন, তুমিও আসছ? এটা বোধহয় ইচ্ছা ছিল না তার। সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার জন্যই কথা শুরু করেছিলেন। কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই এই ডাকটি এসে পড়েছিল।
আজও স্পষ্ট মনে পড়ছে সে ছবি।
বর্ধিষ্ণু ঘর, রাঢ় অঞ্চলের মনোরম মাটির কোঠা অর্থাৎ দোতলা, প্রশস্ত, পাকা মেঝে, চুনকাম করা দেয়াল। উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল—সে আমলের শৌখিন শেড-দেওয়া চব্বিশবাতি টেবিলল্যাম্প।
অনেকগুলি লোক আত্মীয়স্বজন–দূরে বসে রয়েছে।
একটি বিছানায় রোগিণী ছিলায়-টান-দেওয়া ধনুকের মত বাঁকা অবস্থায় পড়ে আছেন। এর ওপরেও কেউ যেন টান দিচ্ছে; অদৃশ্য কেউ যেন মেরুদণ্ডে হটু লাগিয়ে সবল বাহুর আকর্ষণে টঙ্কার দিয়ে টানছে। রোগিণীর ওষ্ঠাধর দৃঢ়বদ্ধ। চোয়াল পড়ে গিয়েছিল এ কথা সত্য, কিন্তু তবু জীবন দত্ত বুঝতে পারলেন—অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে ওই ক্ষীণকায়া মেয়েটি এই মর্মান্তিক যন্ত্ৰণা সহ্য করে চলেছেন। শুধু ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে যন্ত্রণার পরিচয় বেরিয়ে আসছে। তার সঙ্গে একটু শব্দ। সেইটুকুকে আর চাপতে পারছেন না ভদ্রমহিলা।
রঙলাল ডাক্তারও স্থির দৃষ্টিতে রাগিণীকে দেখছিলেন। বোধহয় পাঁচ মিনিট পর বললেন– আজই হোঁচট লেগে দু ঘণ্টার মধ্যে এমন হয়েছে?
–হ্যাঁ, দু ঘণ্টাও ঠিক হবে না।
ভ্রূ কুঁচকে উঠল রঙলাল ডাক্তারের-কই কোথায় হোঁচট লেগেছে? রক্ত পড়েছে?
–ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে। রক্তপাত হয় নি।
রঙলাল ডাক্তার পায়ের বুড়ো আঙুলে হাত দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ঘরখানাই যেন শিউরে উঠল; নিষ্ঠুরতম যন্ত্রণায় রোগিণী ভাষাহীন একটা অবরুদ্ধ আর্তনাদ করে উঠলেন। জীবন তখনও অবাক বিস্ময়ে রোগিণীকে দেখছিলেন-কী অপরিসীম ধৈর্য! চোখের দৃষ্টিতে সে যন্ত্রণার পরিচয় ফুটে উঠেছে। চোয়াল পড়ে গেছে, কণ্ঠ দিয়ে আৰ্তস্বর বের হচ্ছে, তাকে প্রাণপণে সংযত করবার চেষ্টা করছেন তিনি। এত যন্ত্রণাতেও জ্ঞান পূর্ণমাত্রায় রয়েছে।
ক্ষত কোথাও হয় নি, রক্তপাতের চিহ্ন নাই; বেঁকে যাচ্ছেন অসহ্য যন্ত্রণায়; শুধু তাই নয়–শরীরের কোনো স্থানে পাখির পালকের স্পর্শেও অসহ্য যন্ত্রণায় থরথর করে কেঁপে উঠছেন। কণ্ঠ দিয়ে অবাধ্য আৰ্তম্বর বের হচ্ছে।
নাড়ি দেখলেন রঙলাল। রোগিণী আবার যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট শব্দ করে উঠলেন। স্নায়ু শিরাগুলি এমনই কঠিন টানটান হয়ে উঠেছে যে, সামান্য স্পর্শেই ছিঁড়ে যাবার মত যন্ত্রণায় অধীর করে তুলছে।
রঙলাল ডাক্তার ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। গম্ভীর মুখে বললেন–দেখ তো জীবন, তোমার নাড়িজ্ঞানে তুমি কী পাচ্ছ?
সরে দাঁড়ালেন তিনি।
সন্তৰ্পণে এসে বসলেন জীবন দত্ত। আশঙ্কায় একবার বুকটা কেঁপে উঠল। শুক্রাচার্যের তুল্য। রঙলাল ডাক্তার, তার কাছে আজ পরীক্ষা দিতে হবে। নাড়ি অনুভবের অবকাশ তিনি পান নাই। যেটুকু পেয়েছেন তার মধ্যে নাড়ির স্পন্দন আছে কি নাই তাও বুঝতে পারেন নাই। রঙলাল ডাক্তার রোগীর মণিবন্ধ মোটা আঙুলে টিপে ধরে নাড়ি পরীক্ষা করেন। স্পন্দনের সংখ্যা গুনে দেখেন। মধ্যে মধ্যে তাতে ছেদ পড়ছে কি না দেখেন। এর বেশি কিছু না। বেশি কিছু বুঝতে চেষ্টা করেন না।
রোগিণীর হাতখানি বিছানার উপরে যেমনভাবে ছিল—তেমনিভাবেই রইল; জীবন দত্ত শুধু মণিবন্ধের উপর আঙুলের স্পর্শ স্থাপন করলেন। চোখ বন্ধ করে পারিপার্শ্বিকের ওপর যবনিকা টেনে দিলেন। প্রায়-রিক্ত-পত্ৰ অশ্বত্থ গাছের একটি সরু ডালে একটিমাত্র পাতা, অতি ক্ষীণ বাতাসের প্রবাহে দৃষ্টির অগোচর কম্পনে কাঁপছে; সেই কম্পন অনুভব করতে হবে; অথচ। অসতর্ক রূঢ় স্পর্শ হলেই পাতাটি ভেঙে ঝরে যাবে। অতিসূক্ষ্ম স্পর্শানুভূতিকে প্ৰবুদ্ধ করে তিনি বসলেন। ধ্যানস্থ হওয়ার মত।
তাঁর বাবা বলতেন—শক্তির ধর্মই হল ব্যবহারে সে সূক্ষ্ম এবং তীক্ষ্ণ হয়। অনুভূতি হল পরম সূক্ষ্ম শক্তি। আবার স্কুল করলে সে গদা হয়ে ওঠে।
ক্ষীণ ও অতি ক্ষীণ স্পন্দন তিনি অনুভব করলেন। কখনও কখনও যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
কানে এল রঙলাল ডাক্তারের কণ্ঠস্বর–পাচ্ছ?
অতি সন্তৰ্পণে ঘাড় নেড়ে জীবন দত্ত জানালেন–পাচ্ছি। যেন ঘাড় নাড়ার সঙ্গে হাত না। নড়ে ওঠে। দেহ-চাঞ্চল্যে মনের সূক্ষ্ম কোনো কম্পন-তরঙ্গের আঘাত না লাগে।
–কিছু বুঝতে পারছ? দেখ, ভাল করে দেখ!
জীবন এবার কোনো ইঙ্গিত জানালেন না। তিনি ধ্যানযোগকে গভীর এবং গাঢ় করে তুলতে চেষ্টা করলেন। জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রদীপের শিখাকে উজ্জ্বলতর করে তুলে ধরে রোগের অন্তরাত্মাকে প্রত্যক্ষ করতে হবে।
কতক্ষণ অনুভব করেছিলেন নাড়ি তার নিজের ঠিক হিসাব ছিল না।
অনুভব করলেন নাড়ি যত ক্ষীণই হয়ে থাক এ নাড়ি অসাধ্য নয়। উচ্চ স্থান থেকে পড়ে গেলে বা ভগ্ন অস্থি সংযোজনকালে, অতিসারে, অজীর্ণ রোগে, বাতরোগে এমন হয়। কিন্তু অসাধ্য নয়। এখানে দুটি কারণ একসঙ্গে জুটেছে। অকস্মাৎ একটা নদীর বন্যার সঙ্গে আর একটা নদীর জল মিশে দেহখানাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অজীর্ণ রোগে জীৰ্ণদেহে পড়ে যাওয়ার আঘাতের ফলে এমন হয়েছে। আঘাতটা শুধু হেতু হয়েছে, এখন প্রয়োজন কুপিত বায়ুর প্রভাবে শরীরের স্নায়ু-শিরাগুলির সংকোচন দূর করা।
