করেছি। মেয়েটা কত বড় হল জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ওদের ঠিকানা বের করতে পারি নি।
মেয়ের নাম কী বললেন যেন?
ভালো নাম তারা কী রেখেছে তা তো জানি না। তবে ডাক নাম— আহনা। গহনার সঙ্গে মিলিয়ে আহনা। অহনা অহনা, পরবে সোনার গহনা। নামটা সুন্দর না?
অবশ্যই সুন্দর।
এখন মেয়েটার বয়স তেইশ। মেয়ে নিশ্চয়ই মায়ের মতো রূপবতী হয়েছে। চুলের রং পিঙ্গল হয়েছে কি না কে জানে। পিঙ্গল হলে সমস্যা। মেয়েকে দেশ বিদেশ ঘুরতে হবে। রেহানার চুল ছিল, এইজন্যে তাকে বিদেশে পড়ে থাকতে হয়েছে।
জয়নাল সাহেব মাথায় আঙুল বুলাচ্ছেন। আমার চোখে নামছে রাজ্যের ঘুম। খুব হালকা সুরে বাঁশি বাজলে ভালো হত। শরীরের আরামের সঙ্গে যুক্ত হত মনের আরাম।
ঘুম ভেঙে দেখি আমার বিছানার পাশের চেয়ারে অতি বিখ্যাত এক ব্যক্তি বসে আছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি খুব রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ ধ্বক ধ্বক করেছে। এতটা রাগ কবিদের মানায় না। বিদ্রোহী কবিকেও মানায় না। আমি উঠে বসলাম। ভালোমতো তাকিয়ে দেখি যিনি বসে আছেন তিনি বিদ্রোহী কবি না— ফরিদা খালা। ভরাট গোলগাল মুখ বড় বড় চোখের কারণে ধান্ধা লেগে গিয়েছিল।
ফরিদা খালা কঠিন গলায় বললেন, এই আস্তাবলে তুই থাকিস? জায়গাটা তো ঘোড়া বাসেরও অযোগ্য। সারা মেঝেতে সিগারেটের টুকরা। একটা অ্যাসষ্ট্রে কিনতে কয় টাকা লাগে? গত এক বৎসরে এই ঘর কেউ ঝাট দিয়েছে বলে মনে হয় না।
আমি মধুর গলায় বললাম, কেমন আছ খালা? শরীর ভালো? খালা সামাজিক আলোচনার ধার দিয়েও গেলেন না। আগের সূত্র ধরেই ধমকাতে লগালে–
টেবিলে থাকে বই খাতা— তোর টেবিলে ময়লা কাপড়। একটা আলনা কি কেনা যায় না? আমি টাকা দিচ্ছি তুই এক্ষুনি আলনা কিনে আনবি?
জি আচ্ছা।
ঝাঁটা কিনবি— ঘর ঝাঁট দিবি। ফিনাইল দিয়ে ঘর মুছবি; সব আজই করবি।
আচ্ছা।
কাপড় ধোঁয়ার সাবান কিনে আনবি। নিজের হাতে কাপড় কাচবি। একটা টেবিল ক্লথ কিনবি, অ্যাসট্রে কিনবি। ঘরে তো কোনো তোয়ালে দেখছি না গা মুছিস কী দিয়ে?
গা মুছি না।
একটা তোয়ালে কিনবি, গামছা কিনবি। তোষকের উপর শুয়ে আছিস— অস্বস্থি লাগে না। দুটা বেডশিট কিনবি। দুদিন পর পর বেডশিট বদলাবি। বালিশ থেকেও তো তুলা বের হচ্ছে। ফেলে দে এই বালিশ– এক্ষুনি ফেল।
আমি জানালা দিয়ে বালিশ ফেলে দিলাম। খালা যে রাগ রেগেছে— তাৎক্ষণিকভাবে বালিশ বিসর্জনে সেই রাগ কিছু কমার কথা।
দাঁত কেলিয়ে বসে আছিস কেন? হাত মুখ ধুয়ে আয়। তোর সঙ্গে জরুরি কথা! ভালো কথা হাত মুখ যে ধুবি— টুথপেস্ট ব্রাশ আছে?
কয়লা দিয়ে একটা ভুলা দিলে কি চলবে?
হাসবি না খবৰ্দার। হাসির কোনো কথা আমি বলছি না।
মনে হচ্ছে খালার রাগ খানিকটা পড়েছে – জোয়ারের পর সামান্য ভাটা। রাগ আরেকটু কমানোর জন্যে বললাম, চা খাবে খালা?
না।
কবি নজরুল খুব চা খেতেন। তিনি বলতেন চায়ে না নাই। দিনে সত্তুর কাপ চা খাওয়ার রেকর্ডও তার আছে।
খালা অবাক হয়ে বললেন, কবি নজরুলের চা খাওয়ার সাথে আমার চা খাবার সম্পর্ক কী?
তুমি দেখতে অবিকল কবি নজরুলের মতো।
তার মানে?
চুলগুলি ববক্যাট করলে তুমি পুরোপুরি নজরুল। নজরুলকে নিয়ে অন্নদাশংকর রায়ের একটা বিখ্যাত কবিতা আছে। কবিতাটা জান খালা?
ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নি কো নজরুল।
খালা রাগী গলায় বললেন, যার সঙ্গে ইচ্ছা ফাজলামি করিস আমার সঙ্গে করবি না। আমি তোর ছোটশালী না, সম্পর্কে আমি তোর খালা।
একজন বিখ্যাত মানুষের চেহারার সঙ্গে তোমার চেহারার মিল। এতে তো আনন্দিত হবার কথা। তুমি রাগ করছ, কেন?
আমি কি ব্যাটা ছেলে?
এই বিষয়ে কবি নজরুলেরই কবিতা আছে— আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই। তা ছাড়া খালা, পুরুষ রমণীর প্রভেদটা হল বাহ্যিক। শারীরিক। মানুষের আসল পরিচয় তাঁর আত্মায়। আত্মার কোনো নারী পুরুষ নেই। পুরুষের আত্মাও যা নারীর আত্মাও তা।
আমার সাথে বড় বড় কথা বলবি না। আমি আশা না যে তুই যা বলবি তাই হাসি মুখে মেনে নিব। আর মনে মনে বলব–হিমু সাহেব কত বড় জ্ঞানী। কত দ্বজ্ঞানের কথা জানেন। একটা থার্ড গ্রেড ফাজিলের সাথে তোয় যে কোনো বেশিকম নাই, এটা অন্য কেউ না বুঝলেও আমি বুঝি। যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। তোর ফিলসফির কথা শোনার জন্যে আমি আসি নি।
আমি হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এসে দেখি অতি অল্প সময়ে ফরিদা খালা অসাধঃ সাধন করেছেন। ঝাটা যোগাড় করে নিজেই ঘর ঝাঁট দিয়েছেন। টেবিলের ওপর রাখা কাপড় লন্দ্ৰিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার চৌকিটা ছিল। ঘরের মাঝামাঝি সেটা সরিয়ে দিয়েছেন, এতে আগের চেয়ে বড় মনে হচ্ছে।
আমাকে দেখেই খালা বললেন—সন্ধ্যাবেলা রশীদকে জিনিসপত্র দিয়ে পাঠিয়ে দেব। ও সব ঠিকঠাক করে দেবে! তোর ঘরে তো ফ্যানও নেই। প্রচণ্ড গরমে ঘুমাস কী করে? একটা টেবিল ফ্যানও দিয়ে দেব। আর কী লাগবে বল?
কিছু পাঠাতে হবে না খালা। এই মেসে আগামীকাল থাকব কি না তার নাই ঠিক।
যাবি কোথায়?
এখনো ঠিক করি নি।
এই মেসে অসুবিধা কী?
অসুবিধা আছে। মোসটায় শনির নজর পড়েছে। পুলিশ এসে মেসের লোকজন ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হেভি পিটুনি দিচ্ছে।
কাকে ধরে নিয়ে গেল?
মেসের ম্যানেজার কালাম সাহেবকে ধরে নিয়ে গেছে। অনেস্ট লোক। সাতে-পাচে নাই। এমন মার দিয়েছে যে এক মারের চোটে ডিসঅনেস্ট হয়ে গেছে।
