জহিরকে বলি সে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবে।
জহির কে?
জহিরকে তুই জিনিস না—তোকে ধরে একটা আছাড় দিব। আমার ছোট ভাই।
উনি ছাড়ীয়ে নিয়ে আসবেন কীভাবে? প্রধানমন্ত্রীর স্বজনের ইনফ্লুয়েন্স ছাড়া পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মুশকিল। তোমরা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় না?
গাধার মতো কথা বলিস না তো— জহির অবশ্যই ছাড়াতে পারবে। সে পুলিশের আই জি না? পত্রিকায় জহিরের ছবি ছাপা হয়েছে—তার জীবনী পর্যন্ত ছেপেছে। তুই টেলিফোন করে বলে দে তা হলেই হবে। তোকে সে খুবই পছন্দ করে। ওর পার্সেনাল নাম্বার তোকে দিয়ে যাচ্ছি।
আচ্ছা দিও— এখন বল কাছে কেন এসেছ? রাগারগি না করে ঠাণ্ডা মাথায় বল।
খালা কঠিন গলায় বললেন, আশার মাথায় তুই কী ঢুকিয়েছিস? ও বলছে ওর মাথায় কী নাকি ঢুকে গেছে— ফুল-ফল। একটা বাচ্চা মেয়ের মাথায় ফুল-ফল ঢুকানোর মানে কী? ও তো তোর কোনো ক্ষতি করে নি। তুই তার ক্ষতি করলি কেন? কী মনে করে বাচ্চা একটা মেয়ের মাথায় ফুল-ফল ঢুকিয়ে দিলি?
আমি মাথায় কিছু ঢুকাই নি খালা। ফুল-ফল অটো সিস্টেমে তার মাথায় ঢুকেছে। ওর অবস্থা কী?
আধমরা হয়ে গত ছদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে। কিছুই খাচ্ছে না।
চিকিৎসা করছ না?
নিউজার্সিতে ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি টেলিফোনে অষুধ পত্র দিয়েছেন। সবই মনে হয় ঘুমের অষুধ। সারাক্ষণ ঘুমিয়েই থাকে। মাঝেমধ্যে ঘুম ভাঙে তখন বলে, এখানো মাথার মধ্যে ফুল-ফল আছে। কী যে যন্ত্রণায় পড়েছি।
যন্ত্রণাতো বটেই?
অনেক অদ্ভুত রোগের কথা শুনেছি। এরকম তো কখনো শুনি নি।
বড়লোকের বড় রোগ। —মাথার মধ্যে কথা ঢুকে যাওয়া। ছোটলোকের ছোট রোগ–পাতলা পায়খানা, দাউদ বিখ্যাউজ। তুমি এত চিন্তিত হয়ো না তো খালা। সেয়ে যাবে।
বাইরের একটা মেয়ে প্রথম বাংলাদেশে শখ করে এসেছে। দেখি তো এখন ঝামেলাটা। আমি আগামী শনিবার ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এত ঝামেলার আমার দরকার নেই-– যত মার মরে, রায় বাড়িতে এসে পুড়ে। সব ঝামেলা আমার ঘাড়ে। আমার বাড়িটা হয়েছে রায় বাড়ি।
আমার কাছে তোমার আসার উদ্দেশ্য কি এটাই? শনিবার আশা চলে যাচ্ছে এই খবর দেওয়া? নাকি আরো কিছু আছে?
আশা তোকে একটা চিঠি লিখেছে। আমি চিঠিটা নিয়ে এসেছি।
চিঠি অন্য কাউকে দিয়ে পাঠাতে পারতে। তোমার নিয়ে আসার তো দরকার নেই। তোমার আসার উদ্দেশ্যটা বল।
খালা শান্ত গলায় বললেন, তুই আশার সঙ্গে আর কখনো দেখা করবি না। কোনো যোগাযোগ রাখবি না। তোকে টাকা দিচ্ছি— তুই ঢাকার বাইরে কোথাও চলে যা। স্টিমারে করে পটুয়াখালি চলে যা। সেখান থেকে যাবি কুয়াকাটা। কুয়াকাটায় পর্যটনের মোটেল আছে। মোটেল বুক করে দেব। রাজার হালে থাকবি।
আমাকে চলে যেতে হবে কেন? সমস্যাটি কী?
আশা তোর প্রসঙ্গে তার মাকে টেলিফোনে কী সব বলেছে। তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। খুবই চিন্তিত। কান্নাকাটিও করেছেন। আমার হাত পা, ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী বিপদে পড়লাম।
আমি আনন্দিত গলায় বললাম, আশা কি আমার প্রেমে পড়েছে খালা?
খালা তিক্ত গলায় বললেন, তোর প্রেমে পড়বে কেন? তোর কোন জিনিসটা আছে প্রেমে পড়ার মতো? ছাল বাকল নেই একটা মানুষ।
আমি গলা নিচু করে বললাম— সাধারণ মেয়েরা ছালবাকল নেই ছেলের প্রেমে কখনো পড়বে না। তারা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার খুঁজবে। টাকা-পয়সা খুঁজবে। ঢাকায় বাড়ি আছে কিনা দেখবে। কিন্তু অতি বিত্তবান মেয়েরা ছালবাকল নেই ছেলেদের প্রতি এক ধরনের মমতা পোষণ করবে। অসহায়ের প্রতি করুণা। সেই করুণা থেকে প্রেম। দুই এ দুই বাইশ।
দুই এ দুই এ বাইশ হোক আর একুশ হোক। তুই এই মেয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবি না। তুই পালিয়ে যাবি।
কুয়াকাটায় পালিয়ে গিয়ে সূর্যাস্ত সূর্যোদয় দেখব?
দেখতে চাইলে দেখবি, আর মোটেলের ঘরে বসে থাকতে চাইলে বসে থাকবি। আমার কথা হচ্ছে এই মেয়ের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া।
আমি শান্ত গলায় বললাম, খালা এতে লাভ হবে না।
লাভ হবে না কেন?
আশা মেয়েটার স্বভাব চরিত্র যা দেখছি–এই কাণ্ড করলে তার প্ৰেম আরো বেড়ে যাবে। অবশ্যই সে খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করে ফেলবে। কুয়াকাটায় উপস্থিত হবে। সমুদ্র তীরে নায়ক নায়িকার মিলন। ব্যাক গ্রাউন্ডে রবীন্দ্র সংগীত— বধু কোন আলো লাগল চোখে।
খালা কঠিন গলায় বললেন— নায়ক নায়িকার মিলন মানে? ফাজলামি কথা পুরোপুরি বন্ধ। জটিল একটা সমস্যা হয়েছে সেই সমস্যা কীভাবে মেটানো যায় সেটা বল। সব রোগের অনুধ আছে। এই রোগের কী অযুদ্ধ তুই বলা? তুই রোগের জীবাণু সাপ্লাই দিয়েছিস। অষুধও তুই দিবি।
প্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হল মেয়েটার প্ৰেম ভাবটা কমাতে হবে। তার কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেটা করা যাবে না। তার সঙ্গে ছ্যাবলামি করতে হবে। যতই স্থাবলামি করা হবে ততই প্ৰেম ভাব কমবে।
কী রকম ছ্যাবলামি?
গদগদ ভাবে কথা বলতে হবে। ভাবটা এরকম দেখাতে হবে যেন আমি তার প্রেমে পাগল। তারপর ফাঁট করে একদিন বিয়ের প্রপোজল দিতে হবে। বাংলা ছবির নায়কের মতো কঁদো কাদো গলায় বলতে হবে— আশা, ও আমার জানপাখি তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তুমি যদি আমাকে বিয়ে না কর তা হলে আল্লাহর কসম কোনো একটা পাঁচ টনি ট্রাকের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে যাব।
