সফিকের অংশটা এখন থাক। আপনার অংশটা বলুন।
জি ভাই সাহেব বলছি। একটু দম নিয়ে নেই। আরেকটা সিগারেট খেয়ে নেই।
গল্পটা কি অনেক লম্বা?
জিনা শেষ হয়ে এসেছে। বেশি হলে এক মিনিট লাগবে। গল্প শেষ করে। আমি মাথা বানায়ে আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিব।
জয়নাল সাহেব সিগারেট খেলেন। চা খেলেন। মিষ্টি পান নিয়ে এসেছিলেন। পান খেলেন। গল্প আবার শুরু করলেন।
বর্ষাকালের ঘটনা বুঝলেন হিমু ভাই। অফিসে গিয়েছি বৃষ্টিতে ভিজে। আমার বস হাসান সাহেব আমাকে দেখে বললেন—একী অবস্থা। আপনার ছাতা নেই? আমি বললাম, জিনা সার।
উনি বললেন, বর্ষার দেশে বাস করেন— ছাতা নেই কেন?
আমি বললাম, সার আমি খুব ছাতা হারাই। গত বছর তিনটা ছাতা হারিয়েছি। এই বৎসর ঠিক করেছি। ছাতা কিনব না?
হাসান সাহেব বললেন, এই বৎসরও কিনবেন এবং ছাতা যেন না হারায় সে জন্যে নাইলনের পাতলা দড়ি দিয়ে হাতের সঙ্গে বেঁধে রাখবেন।
আমি বললাম, জি আচ্ছা সার। এখনই ছাতা কিনে নিয়ে আসছি।
হাসান সারা বললেন–-আরো কী আশ্চর্য। আপনি ঠাট্টা বুঝেন না নাকি? ঠাট্টা করছি। ছাতা কেনার কোনো দরকার নেই। আমার কাছে বাড়তি রেইনকোট আছে। আমি রেইনকোট দিয়ে দেব। আজ যে ভেজা ভিজেছেন। অসুখ করবে। যান বাসায় চলে যান। আজ আপনার ছুটি। আপনার জন্যে রেইনি ডে।
হাসান সারা আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। তার স্নেহের ঋণ শোধ করা অসম্ভব। যাই হোক যে কথা বলছিলাম— আমি অসময়ে বাসায় ফিরে দেখি— সফিক আমাদের বাসায়। আমার খুবই ভালো লাগল–ভালো হয়েছে গল্প করা যাবে। আমি বললাম— সফিক কেমন আছ?
সফিক বলল, ভালো। আপনি অসময়ে চলে এসেছেন কেন? অফিস ছুটি হয়ে গেছে?
আমি বললাম, অফিস ছুটি হয় নি— আমার ছুটি। আমার রেইনি ডে।
সফিক গম্ভীর গলায় বলল, অসময়ে দেখতে এসেছেন ভাবি কার সঙ্গে কী করছে? ভাবিকে আপনি সন্দেহ করেন? আপনার কি ধারণা ভাবি আমার সঙ্গে লটরপটর করে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, তার মানে?
সফিক বলল, আপনি নানানভাবে আপনার স্ত্রীকে যন্ত্রণা দেন। তাঁকে মারধোর করেন। একবার গলাটিপে খুন করতে গিয়েছেন। আপনি কি জানেন ভাবি যদি থানায় গিয়ে কেইস করে তা হলে পুলিশ এসে আপনাকে ধরে নিয়ে যাবে। নারী নির্যাতন মামলায় আপনার দশ বছর জেল খাটতে হবে।
আমি ভাবলাম সফিক রসিকতা করছে! কারণ রেহানা কিছুই বলছে না। কাজেই আমি হাসতে হাসতে বললাম— আমি জেলে গেলে তোমায় ভাবিকে দেখবে কে?
সফিক বলল, ভাবিকে দেখার লোক পাওয়া যাবে। আপনি আপনার নিজের কথা ভাবুন। আপনি তো ভাবিকে থ্রেটও করেছেন। আপনি বলেছেন–ভাবির মুখ আপনি এসিড দিয়ে ঝলসে দেবেন। বলেন নি?
কখন বললাম?
আমার সামনেই তো বলেছেন? বলেন নি? ভাবি যেমন শুনেছে। আমিও শুনেছি।
আমি বললাম, সফিক এই সব তুমি কী বলছ? ঠাট্টা করছ নাকি? এই জাতীয় ঠাট্টা ভালো না।
সফিক বলল, ঠাট্টা করছি না। আপনার সঙ্গে আমার ঠাট্টার সম্পর্ক না। আপনি আমার দুলাভাই না।
এই বলে সে উঠে চলে গেল। আমি রেহানাকে বললাম, ব্যাপার কী? সফিক এরকম করছে কেন?
রেহানা শুকনো গলায় বলল, ও এরকম করছে কেন তা আমি কি করে বলব। ওর ব্যাপার ও জানে।
এই বলে সে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। আমি কিছুই বুঝলাম না। মন খুবই খারাপ। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমালাম। সন্ধ্যাবেলায় উঠলাম। মাগরেবের নামাজ পড়ে অহনাকে নিয়ে খেলছি। এমন সময় বাসায় পুলিশ আসল। আমাকে অ্যারেস্ট করল। বাড়ি সার্চ করল। আমার অফিসের ব্যাগে এক বোতল এসিড তারা খুঁজে পেয়ে গেল। তখনো আমি ভাবছি পুরো ব্যাপারটা দুঃস্বপ্ন। মন খারাপ করে ঘুমুতে গেছি। এই জন্যে স্বপ্নে দেখেছি। রেহানা যে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে আমি তার কিছুই বুঝতে পারি নি। পুলিশ এমন মার মারল— কী বলব ভাই সাহেব। মারের চোটে স্বীকার করলাম এসিড আমিই কিনেছি। পুলিশ কি করত জানেন? আমাকে চিৎ করে শুইয়ে এসিডের বোতলের মুখ খুলে ফেলত। তারপর বলত–তোর কেনা এসিডে তোর একটা চোখ গালিয়ে দেব। তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল। হারামজাদা স্বীকার কর তুই এসিড কিনেছিস।
খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা।
জি অস্বাভাবিক। আমার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছিল। জেলের বছর নয় মাসে হয় এই জন্যে চার বছরের মতো জেলে ছিলাম। তবে জেলে খারাপ ছিলাম না। বললে অবিশ্বাস্য লাগবে জেলে শান্তিতে ছিলাম। সারাদিন খাটাখাটনি করতাম রাতে ভালো ঘুম হত। এক ঘুমে রাত কাবার। জেল থেকে বের হয়ে খুবই কষ্টে পড়লাম। রেহানা সফিককে বিয়ে করে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া; আমার নেই চাকরি। দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছি।
মামলা যখন চলেছে তখনো কি বলেছেন এসিড আপনি কিনেছেন?
জি বলেছি। রেহানার উপর রাগ করেই বলেছি। ইত্তেফাকে আমার ছবিও ছাপা হয়েছিল। পাষণ্ড স্বামী এই শিরোনামে।
আপনার গল্প শেষ হয়েছে?
জি ভাই সাহেব। এখন শুয়ে পড়েন। আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি। আজি অন্য কায়দায় মাথা মালিশ করব। আঙুলের ডগা পানিতে ভিজিয়ে ভেজা আঙুলে চুলে বিলি কাটব। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগবে, খুবই আরাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বেন।
আমি শুয়ে পড়লাম। জয়নাল সাহেব ভেজা আঙুলে চুলে বিলি কাটছেন। সত্যি সত্যি ঘুম চলে আসছে। আমি ঘুম ঘুম গলায় বললাম— আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার আর যোগাযোগ হয় নি?
জি না।
যোগাযোগের চেষ্টাও করেন নি?
