–হ্যাঁ।
–তোরা তো আবার নাম পাল্টাস, নাম পাল্টাসনি তো?
–না।
—ঠিক আছে, যা।
শামিমা চলে যায়। সুরঞ্জনের মনে বড় আরাম হয়। সে আজ আর কোনও দুঃখ করবে না। আজ বিজয়ের দিন, সকলে আনন্দ-উল্লাস করছে, বাজি ফাটাচ্ছে, একুশ বছর আগে এই দিনে স্বাধীনতা এসেছিল, এই দিনে শামিমা বেগমও এসেছে সুরঞ্জন দত্তের ঘরে। বাহু স্বাধীনতা বাহু। সুরঞ্জনের ইচ্ছে করে তুড়ি বাজাতে। সে কি এক কলি গেয়ে উঠবে নাকি ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ?’
শামিমাকে একবারও তার নামটি বলা হয়নি। তার নাম যে সুরঞ্জন দত্ত এই কথাটি বলা উচিত ছিল। তবে শামিমাও টের পেত তাকে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করেছে যে মানুষ, সে একটি হিন্দু যুবক। হিন্দুরাও ধর্ষণ করতে জানে, তাদেরও হাত পা মাথা আছে, তাদেরও দাঁতে ধার আছে, তাদের নখও আঁচড় কাটতে জানে। শামিমা নিতান্তই নিরীহ একটি মেয়ে, তবু তো মুসলমান। মুসলমানের গালে একটু চড় কষাতে পারলেও সুরঞ্জনের আনন্দ হয়।
সারারাত কাটে প্রচণ্ড অস্থিরতায়। সারারাত কাটে ঘোরে বেঘোরে। সারারাত কেটে যায় সুরঞ্জনের একা, ভূতুড়ে নিস্তব্ধতায়, নিরাপত্তাহীনতায়, সন্ত্রাসের কালো ডানার নীচে সে তড়পায়, তার ঘুম আসে না। সে আজ তুচ্ছ একটি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল, পারেনি। প্রতিরোধ সে নিতে পারে না। সারারাত শামিমা মেয়েটির জন্য সুরঞ্জন অবাক হয়ে লক্ষ করে তার মায়া হচ্ছে। করুণা হচ্ছে। হিংসে হয় না। রাগ হয় না। যদি না-ই হয় তবে আর প্রতিশোধ কিসের। তবে তো এ এক ধরনের পরাজয়। সুরঞ্জন কি পরাজিত? সুরঞ্জন তবে পরাজিতই। শামিমাকে সে ঠকাতে পারেনি। এমনিতেই মেয়েটি ঠকে আছে। তার কাছে সম্ভোগ আর ধর্ষণ আলাদা কোনও আচরণ নয়। সুরঞ্জন কুঁকড়ে যেতে থাকে বিছানায়; যন্ত্রণায়, লজ্জায়। রাত তো অনেক হয়েছে, ঘুম আসে না কেন সুরঞ্জনের! সে কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! বাবরি মসজিদের ঘটনা তাকে নষ্ট করে দিচ্ছে, সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার হৃদয়ে পচন ধরেছে। এত কষ্ট হচ্ছে কেন, যে মেয়েটিকে সে দাঁতে ছিঁড়ল, কামড়াল, তার জন্যই কষ্ট হচ্ছে, মেয়েটির গালের রক্ত যদি সে যাবার আগে একবার রুমালে মুছে দিতে পারত! মেয়েটিকে কি আবার কখনও পাওয়া যাবে, বার কাউন্সিলের মোড়ে দাঁড়ালে মেয়েটিকে যদি পাওয়া যায়, সুরঞ্জন ক্ষমা চেয়ে নেবে। এই শীতের রাতেও তার গরম লাগে গায়ে। গায়ের লেপখানা সে গা থেকে ফেলে দেয়। বিছানার চাদরটি পায়ের কাছে দলা পাকিয়ে আছে। ময়লা তোষকের ওপর হাঁটুর কাছে মাথা নামিয়ে এনে শুয়ে থাকে। কুকুরের মত শরীর কুণ্ডুলি করে। সকালে খুব প্রস্রাবের বেগ হয় তার, তবু উঠতে ইচ্ছে করে না। কিরণময়ী চা রেখে যান, তার কিছুই খেতে ইচ্ছেকরে না। বমি বমি লাগে। তার গরম জলে স্নান করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গরম জলপাবে কোথায়? ব্রাহ্মপল্লীর বাড়িতে পুকুর ছিল, শীতের সকালে পুকুরে নামলে গায়ে লোম দাঁড়িয়ে যেত। তবু পুকুরে না সাঁতরালে তার স্নানই হত না। আজ খুব সাঁতার সাঁতরে স্নান করা যেত যদি, কিন্তু পুকুর কোথায়! অগাধ সেই জল কোথায়! কলঘরের মাপা জলে তার স্নান করতে ইচ্ছে করে না। এত কেন জীবনে মাপামাপি!
লজ্জা (১২) সুরঞ্জন বিছানা ছাড়ে
১২ক.
সুরঞ্জন বিছানা ছাড়ে। সকাল দশটায়। সে দাঁত মাজছিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। শুনতে পায় খাদেম আলীর ছেলে আশরাফ কিরণময়ীকে বলছে-মাসিম, আমাদের বাড়ির পুটু কাল সন্ধের দিকে মায়ার মত এক মেয়েকে গেণ্ডারিয়া লোহার পুলের নীচে ভেসে থাকতে দেখেছে।
রঞ্জনের টুথব্রাশ ধরা হাতটি হঠাৎ পাথর হয়ে যায়। সারা শরীরে ইলেকট্রিক কারেন্ট বইলে যেমন লাগে, তেমন লাগে তার শরীরে। ভেতর থেকে কোনও কান্নার শব্দ আসে না। স্তব্ধ হয়ে আছে বাড়িটি। যেন কথা বললেই গমগম করে বাতাসে প্রতিধ্বনি হবে। যেন সে ছাড়া হাজার বছর ধরে এ বাড়িতে কেউ ছিল না। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুরঞ্জন বোঝে, গতরাতের বিজয় উৎসবের পর শহরের ঘুম এখনও ভাল করে ভাঙেনি। টুথব্রাশ হাতে নিয়েই সে দাঁড়িয়ে ছিল, হায়দার জার্সি পরে রাস্তায় হাঁটছিল, তাকে দেখে থামে, চোখ পড়েছে বলেই ভদ্রতা করে থামে সে, ধীর পায়ে সামনে আসে, জিজ্ঞেস করে–কেমন আছ?
সুরঞ্জন হেসে বলে—ভাল।
এর পরই মায়ার প্রসঙ্গ উঠবার কথা কিন্তু হায়দার সে প্রসঙ্গ তোলে না। সে রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। কলে–গতকাল শিবিরের লোকেরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে যে গণকবরের স্মৃতিফলক ছিল তা ভেঙে দিয়েছে।
সুরঞ্জন থুক করে একদলা পেস্ট ফেলে মাটিতে, বলে— গণকবর মানে?
— গণকবর মানে তুমি জানো না? হায়দার বিস্মিত চোখে তাকায় সুরঞ্জনের দিকে।
মাথা নাড়ে সুরঞ্জন, সে জানে না। অপমানে হায়দারের মুখ নীল হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে না। সুরঞ্জন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের নেতা হয়েও গণকবর মানে জানে না বলছে কেন। শিবিরের লোকেরা গণকবরের স্মৃতিফলক ভেঙে দিয়েছে, ভেঙে দিক। ওদের হাতে অস্ত্ৰ এখন, অস্ত্ৰ ওরা কাজে লাগাচ্ছে, কে বাধা দেবে ওদের! ধীরে ধীরে ওরা ভেঙে ফেলবে অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, ভেঙে ফেলবে সাবাস বাংলাদেশ, জয়দেবপুরের মুক্তিযোদ্ধা। এত বাধা দেবে কে? দু-একটা মিছিল মিটিং হবে। জামাত শিবির যুব কমান্ডের রাজনীতি বন্ধ হোক’ বলে কিছু প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল চিৎকার করবে-এই তো! এতে কি হবে, সুরঞ্জন মনে মনে বলে কচু হবে।
