সুরঞ্জন সিগারেটটি খুঁড়ে ফেলে মেয়েটিকে কাছে ডাকে। বলে—এই শোন।
রিক্সা ঘেঁষে দাঁড়ায় মেয়েটি। শরীর নাড়ায়। হাসে।
সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করে–তোমার নাম কি?
মেয়েটি হেসে বলে–পিংকি।
—পুরো নাম বল।
–শামিমা বেগম।
–বাবার নাম?
—আবদুল জলিল।
-বাড়ি?
–রংপুর।
—কি নাম যেন তোমার?
-শামিমা।
মেয়েটি অবাক হয় কেউ তো এমন বাপের নাম বাড়ির নাম জিজ্ঞেস করে না। এ কেমন খদ্দের! তীক্ষ্ণ চোখে সুরঞ্জন শামিমাকে দেখে। মেয়েটি কি মিথ্যে বলছে? মনে হয় না।
—ঠিক আছে রিক্সায় ওঠ।
শামিমা রিক্সায় ওঠে। রিক্সাকে টিকাটুলির দিকে যেতে বলে সুরঞ্জন। শামিমার সঙ্গে সারাপথ সে কোনও কথা বলে না। তার দিকে একবার তাকিয়েও দেখে না। এই যে একটি মেয়ে তার গা ঘেঁষে বসেছে, অযথা কথা বলছে, গানও গেয়ে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ, হাসতে হাসতে ঢলে পড়তে চাইছে সুরঞ্জনের গায়ে—এসব কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। সে খুব মন দিয়ে সিগারেট ফোঁকে। রিক্সা অলটিকেও বেশ খুশি খুশি মনে হয়। সে এঁকেবেঁকে রিক্স চালায়। মাঝে মধ্যে হিন্দি ছবির দু-এক কলি গানও গায়। শহর সেজেছ আজ। লাল নীল আলোয় ঝলমল করছে। সে আজ যা করছে, সুস্থ মাথায় করলে কোনও নেশা করেনি সে।
বাইরে থেকে তালা দিয়ে এসেছে সে ঘরে। সদর দরজায় ডাকাডাকি না করে নিজের ঘরে নিঃশব্দে ঢুকে পড়া যায়। ঘরে ঢুকেই শামিমা বলে—দরদাম কিন্তু কিছু হইল না।
সুরঞ্জন তাকে থামিয়ে দেয়। বলে—চুপ একটি কথা না। একেবারে চুপ।
ঘরটি তেমনই অগোছালো। বিছানার চাদর অর্ধেক ঝুলে আছে নীচে। ওঘর থেকে কোনো শব্দ আসে না। সম্ভবত ঘুমিয়ে গেছে। সুরঞ্জন কান পেতে রেখে শোনে সুখময় গোঙাচ্ছেন। তিনি কি বুঝতে পেরেছেন তাঁর মেধাবী পুত্ৰধান বাড়িতে একটি বেশ্যা নিয়ে ঢুকেছে! সে অবশ্য শামিমাকে কোনও বেশ্যা ভাবছে না। ভাবছে একটি মুসলমান মেয়ে। একটি মুসলমান মেয়েকে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে ধর্ষণ করতে। শামিমাকে ধর্ষণ করে সে, স্রেফ ধর্ষণ।। ঘরের বাতি নিবিয়ে দেয় সে। মেয়েটিকে মেঝোয় ফেলে কাপচোপড় টেনে খুলে ফেলে। সুরঞ্জনের শ্বাস পড়ে দ্রুত, সে তার নখ বসিয়ে দেয় মেটের তলপেটে। দাঁতে কামড়ে ধরে স্তন। সুরঞ্জন বুঝতে পারে এর নাম আদর নয়, সে অযথাই মেয়েটির চুল ধরে হেঁচকা টান দিচ্ছে, গালে, গলায়, বুকে কামড় বসাচ্ছে। তলপেটে, পেটে, নিতম্বে, উরুতে ধারালো নখের আঁচড় দিচ্ছে। মেয়েটি রাস্তার বেশ্যা, সে ‘উহ আহ মাগো গেলাম গো’ করে ওঠে যন্ত্রণায়, তা শুনে সুরঞ্জনের আনন্দ হয়। একে আরও কষ্ট দিতে দিতে, আরও তছনছ করে পেষে সে, ধর্ষণ করে। মেয়েটিও অবাক হয় মন হিংস্র খদ্দের সে দেখেনি আগে যে তাকে এভাবে কামড়ে ছেঁড়ে। বাঘের থাবা থেকে হরিণী যেমন ভয়ে পালাতে চায়, মেয়েটি ‘শাড়ি কাপড় গুটিয়ে নিয়ে দরজার কাছে তো দাঁড়ায়।
রঞ্জন বড় শান্ত এখন। নির্ভার লাগছে তার। যে ইচ্ছেটা তাকে কামড়াচ্ছিল সারাদিন, তার একটা সদগতি হল। এই মেয়েটিকে লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারলে তার আরও আনন্দ হবে। তার শ্বাস আবার ঘন হয়ে ওঠে। সে মুসলমান মেয়েটিকে এখনই কষে লাথি দেবে? উলঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি, সে বুঝতে পারছে না রাতে তাকে থাকতে হবে নাকি চলে যেতে হবে। যেহেতু কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, ভয়ে সে মুখও খুলতে পারছে না।
মায়া এখন কোথায়, তাকে কি ঘর বন্ধ করে হাত পা বেধে ওরা ধর্ষণ করেছে, ওরা সাতজনই? মায়ার খুব কষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই, মায়া কি চিৎকার করছিল তখন? একবার, মাযায় তখন পনেরো কি ষোল বছর বয়স, স্বপ্নের মধ্যে ‘দাদা দাদা বলে চিৎকার করে উঠছিল, সুরঞ্জন দৌড়ে গিয়ে দেখে মায়া ঘুমের মধ্যে থরথর কাঁপছে—কি মায়া, কাঁপছিস কেন?’ জেগেও মায়ার কাঁপুনি থামেনি, মগ্ন হয়ে স্বপ্নের কথা বলল,’খুব সুন্দর একটা গ্রামে আমরা দুজন বেড়াতে গেছি, সবুজ ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে তুমি আর আমি হাঁটছি। হাঁটছি। গল্প করছি। দু-একটা লোক হাঁটছে। তারা আমাদের সঙ্গে অল্প অল্প কথা বলছে। হঠাৎ দেখি ধানক্ষেত নেই। একটা নির্জন মাঠ, সঙ্গে তুমি নেই, হঠাৎ দেখি পেছন থেকে কতগুলো লোক আমাকে ধরতে আসছে, ভয়ে আমি দৌড়োচ্ছি। আর তোমাকে খুঁজছি।‘ আহা মায়া। সুরঞ্জনের শ্বাস ঘন হয়ে ওঠে, তার মনে হয় মায়া চিৎকার করছে খুব। মায়ার চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কেউ শুনতে পাচ্ছে না মায়া কাঁদছে। কাঁদছে মায়া। কোনও অন্ধকার ঘরে একপাল বুনো জন্তুর সামনে বসে ও কাঁদছে। মায়া কোথায় আছে এখন, ছোট্ট একটি শহর, অথচ সে জানে না তার প্রিয় বোনটি আস্তাকুঁড়ে, পতিতালয়ে না বুড়িগঙ্গার জলে? কোথায় মায়া? এই দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে ইচ্ছে করছে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে।
মেয়েটি ভয় পেয়ে যায় সুরঞ্জনের আচরণে। সে দ্রুত তার শাড়ি কাপড় পরে নিয়ে বলে–টাকা দেন।
—খবরদার এক্ষুনি বের হ। সুরঞ্জন লাফিয়ে ওঠে ক্ৰোধে।
শামিমা দরজা খুলে এক পা দেয় বাইরে, আবার করুণ চোখে তাকায় পেছনে, গালের কামড় থেকে রক্ত গড়াচ্ছে, বলে–দশটা টাকা হইলেও দেন।
ক্ৰোধ তখন লাফিয়ে উঠতে চাইছে সুরঞ্জনের সারা শরীরে। কিন্তু মেয়েটির করুণ চোখ দেখে তার মায়া হয়। দরিদ্র একটি মেয়ে। পেটের দায়ে শরীর বেচে। সমাজের নষ্ট নিয়ম তার শ্রম মেধা কিছুই কাজে না লাগিয়ে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার গলিতে। সে নিশ্চয় আজকের টাকা দিয়ে দুটো ভাত খাবে। ক’বেলা খায় না কে জানে! সুরঞ্জন প্যান্টের পকেট থেকে দশটি টাকা বের করে শামিমার হাতে দেয়, জিজ্ঞেস করে–তুই তো মুসলমান, না?
