১০গ.
বিকেলে শফিক আহমেদের স্ত্রী আসেন বাড়িতে। আলেয়া বেগম। আগে প্রায়ই আসতেন। আজকাল অনেকেই আসেন না। হায়দারের বাবা মা-ও অনেকদিন আসেন না। কিরণময়ী বড় একা হয়ে গেছেন টের পান সুধাময়। আলেয়া বেগমকে দেখে একটু অবাকই হন কিরণময়ী, যেন কারও আসবার কথা নয় এ বাড়িতে। এ বাড়ি একটি পোড়োবাড়ির মত। আলেয়া বেগমের হাসি হাসি মুখ, ঝকমকে শাড়ি, গায়ের গয়না দেখে সুধাময় ভাবেন কিরণময়ী কি তাঁর সামনে ম্লান বোধ করছেন? কিরণময়ীর ওপর তিনি বোধহয় এতদিন অন্যায়ই করেছেন। একটি সচ্ছল, শিক্ষিত রুচিবান পরিবারের মেয়েকে একটি অসচ্ছল, স্বপ্নহীন সংসারে ঢুকিয়ে, তার ওপর একুশ বছর তাঁকে শরীরী অবদমন দিয়ে বঞ্চিত করেছেন। সুধাময় নিজের স্বার্থই বড় করে দেখেছেন, নয়ত তাঁর বলা উচিত ছিল কিরণময়ী তুমি আবার বিয়ে কর। বললে কি কিরণময়ী চলে যেতেন? আলেয়া বেগমের মত ঝলমলে জীবনের সাধ কি ছিল না তাঁর গোপনে? মানুষের মন তো, চলে যেতেও পারতেন। ঐই ভয়ে সুধাময় কিরণময়ীর কাছাকাছি থেকেছেন বেশি, বন্ধুবান্ধবকে খুব একটা ডাকতেন না বাড়িতে। কেন ডাকতেন না, সুধাময় তাঁর অসুস্থ শয্যায় নিজের দুর্বলতাকে নিজেই আঙুল তুলে দেখিয়ে দেন, বলেন—সুধাময়, তুমি যে নির্বান্ধব হয়ে যাচ্ছিলে ক্রমশ, ইচ্ছে করেই হচ্ছিলে, যেন এ বাড়িতে তোমার বন্ধুদের আড্ডা বসলে কিরণময়ীর আবার কোনও সক্ষম পুরুষকে যদি পছন্দ হয়ে যায়। কিরণময়ীর জন্য সুধাময়ের ভালবাসা এত তীব্র হয়ে উঠবার পেছনে ছিল স্বার্থপরতা, যেন এই তীব্ৰতা দেখে ক্রিয়াময়ী ভাবেন এই ভালবাসা ছেড়ে কোথাও যাওয়া তাঁরা উচিত নয়। কেবল ভালবাসায় কি মন ভরে? এতকাল পর সুধাময়ের মনে হয় কেবল ভালবাসায় মানুষের মন ভরেনা, আরও কিছুর প্রয়োজন হয়।
আলেয়া বেগম ঘরের ভাঙা জিনিসপত্র দেখেন, সুধাময়ের অচল হাত পা দেখেন, মায়ার অপহৃত হওয়ার গল্প শোনেন আর চুকচুক করে দুঃখ করেন। একসময় বলেন—বৌদি, আপনার কোনও আত্মীয়-টাত্মীয় থাকে না ইন্ডিয়ায়?
–থাকে। আমার প্রায় সব আত্মীয়ই তো ওখানে।
–তবে আর এখানে পড়ে আছেন কেন?
–নিজের দেশ তো তাই।
কিরণময়ীর উত্তরে আলেয়া বেগম একটু যেন অবাকই হন। কারণ কিরণময়ীরও যে দেশ এটি, তা যেন প্রথম তিনি অনুধাবন করছেন। আলেয়া বেগম যত জোর দিয়ে বলেন ‘এটা আমার দেশ’, কিরণময়ীকে তত জোর কি মানায়–আলেয়া বোধহয় ভাবছেন এ কথাই। আজ সুধাময় ভাবেন আলেয়া আর কিরণময়ী এক নয়। কোথায় যেন সূক্ষ্ম এক ফারাক তৈরি হচ্ছে।
লজ্জা (১১) আজ বিজয় দিবস
আজ বিজয় দিবস। এই দিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতা শব্দটি সুরঞ্জনকে বিষপিঁপড়ের মত কামড়ায়। সারাদেশ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করছে, কুচকাওয়াজ করছে। বেশ আনন্দ হচ্ছে চারদিকে। সুরঞ্জনের মনে কোনও আনন্দ হচ্ছে না৷ এই দিনটিতে সুরঞ্জন বেরিয়ে পড়ত ভোরে, এদিক ওদিক নানা অনুষ্ঠান করে ফিরত। ট্রাকে ঘুরে গান গাইত। সুরঞ্জনের মনে হয় বাজে কাজেই সে এত বছর সময় নষ্ট করেছে। কিসের স্বাধীনতা সে পেয়েছে, কী লাভ হয়েছে তার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে? ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূৰ্য উঠেছে’…’রক্ত লাল রক্ত লাল’, ‘বিশ্বকবির সোনার বাংলা নজরুলের বাংলাদেশ জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে তার নেইকো শেষ’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য যুদ্ধ করি’—এই গানগুলো বারবারই সুরঞ্জনের মুখে সুর হয়ে বাজতে চায়। সে দেয় না। সুরঞ্জনের ইচ্ছে করে না এসব শুনতে। সে প্রাণপণে মাড়িয়ে যায় বুকের বকুলগুলো।
সারাদিন শুয়ে থেকে সে একটি ইচ্ছের জন্ম দেয়। তার গোপন ইচ্ছেটিকে সে লালন করে। ইচ্ছেটিকে সে জিইয়ে রাখে, যেন না মরে, ইচ্ছেটি যেন ডালপালা মেলে বড় হতে থাকে। সারাদিন ইচ্ছের গোড়ায় সে জল ঢালে, ইচ্ছের চারায় ফুলও ফোটে, সে গন্ধও নেয়। সেই ফুলের। ইচ্ছেটিকে সন্ধে অবধি তা দিয়ে দিয়ে সে বেরোয় বাড়ি থেকে রাত আটটার দিকে। রিক্সাকে বলে যেদিকে খুশি যাও। রিক্সা তাকে তোপখানা, বিজয় নগর, কাকরাইল, মগবাজার ঘুরিয়ে রমনায় নেয়। সুরঞ্জন রাতের আলোকসজ্জা দেখে। আলোকিত রাজপথ কি জানে সে একটি হিন্দু ছেলে! জানলে বোধহয় পিচের পথও বলত, দ্বিধা হও। আজ এই ইচ্ছেটি পূরণ না করলে হৃদয়ের কোষে কোষে যে আগুন জ্বলছে, তা নিভবে না। এই কাজটি না করলে শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে সে মুক্তি পাবে না, এই কাজটি হয়ত কোনও সমস্যার সমাধান নয়। তবু কাজটি তাকে স্বস্তি দেবে, এই কাজ করে সে তার ক্ৰোধ, তার ক্ষোভ, তার যন্ত্রণা কিছুটা হলেও কমাবে।
বার কাউন্সিলের সামনে সুরঞ্জন তার রিক্সা থামায়। থামিয়ে সিগারেট ধরায়। মায়াকে ফেরত পাবার আশা সুরঞ্জন ছেড়েই দিয়েছে। সুধাময় আর কিরুণাময়ীকে সে জানিয়ে দেবে তাঁরা যেন মায়ার আশা আর না করেন। যেন ভাঝেন মায়া সড়ক দুৰ্ঘটনায় মারা গেছে। সেদিনের সচল সক্ষম সুধাময়ের এমন নিঃস্ব নির্জন অসহায় অবস্থা সুরঞ্জনের সহ্য হতে চায় না। মানুষটা গোঙায় সারাদিন–মায়াকে ফিরে না পাবার বেদনায়, যন্ত্রণায়। মায়াকে নিশ্চয় শকুন যেভাবে মরা মানুষ খায়, তেমন করে খাচ্ছে ওরা। খুবলে খাচ্ছে। ছিঁড়ে খাচ্ছে। আদিম মানুষেরা যেমন কাঁচা মাংস খেত, তেমন করে কী? কী এক অবোধ যন্ত্রণা সুরঞ্জনের বুক ছিঁড়ে নেয়। যেন তাকেই খাচ্ছে কেউ। তাকেই খাচ্ছে সাত হয়েনার দল। সিগারেটটি শেষ হয় না তার, রিক্সার সামনে একটি মেয়ে দাঁড়ায়। সোডিয়াম আলোয় মেয়েটির মুখ উজ্জ্বল লাগে। মুখে নিশ্চয় রং মাখিয়েছে। বয়স উনিশ-বিশ হবে মেয়েটির।
