দরজা খোলা রেখেই বেরোয় সুরঞ্জন। কেন আর বন্ধ করবে। অঘটন যা ঘটবার ঘটেই তো গেছে। হাঁটতে হাঁটতে কাজল দেকনাথ জিজ্ঞেস করেন— বাড়িতে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে তোমার?
–মা রেখে যান ঘরে, কখনও খাই কখনও খাই না। ইচ্ছে করে না। ভাল লাগে না আমার। সুরঞ্জন আঙুলে মাথার চুলগুলো আঁচড়ায়। এ ঠিক চুল নিপাট করবার উদ্দেশ্যে নয়। ভেতরের যন্ত্রণা কমাবার জন্য।
সুরঞ্জন পুরনো প্রসঙ্গে ফেরে—উনসত্তর, সত্তরে বোধহয় হিন্দুদের মাইগ্রেশন কম হয়েছে কাজলদা।
—ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন শুরু হল। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত হিন্দুরা কম গেছে। ফিফটি ফাইভ থেকে ষাট পর্যন্ত প্রচুর গেছে। সিক্সটি থেকে পয়ষট্টি পর্যন্ত দশ লাখ মত লোক চলে গেছে। যুদ্ধ শুরু হলে প্রায় এক কোটির মত ভারতে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আশি ভাগই ছিল হিন্দু। যুদ্ধের পর ফিরে এসে হিন্দুরা দেখেছে তাদের ঘরবাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। অনেকে তখন চলে গেয়ে কেউ থেকে গেছে আশায় আশায়। স্বাধীন দেশ তাদের নিরাপত্তা দেবে এই আশা। তারপর তো দেখছই চুয়াত্তরেও মুজিব সরকার শত্ৰু সম্পত্তির নাম ছাড়া আর কিছু চেঞ্জ করল না। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতায় বসাল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিল। এরপর এরশাদ এসে ইসলামি পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করল। বিরাশির বাইশে ডিসেম্বর এরশাদ ঘোষণা করল ইসলাম ও কোরানের নীতিই হবে দেশের নতুন সংবিধানের ভিত্তি। চব্বিশ বছর ধর্মের নামে শোষিত হবার পর ধর্ম আবার রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসবে সদম্ভে, তাই বা কে ভেবেছিল।
একটি চায়ের দোকান দেখে থামে। ওরা। কাজল দেবনাথ সুরঞ্জনের আপাদমস্তক লক্ষ্য করে বলেন–তোমাকে খুব অন্যমনস্ক লাগছে। যে প্রশ্নগুলো তোমার খুব ভাল করেই জানা তাই আবার জিজ্ঞেস জিজ্ঞেস করছ। কেন? মনে হচ্ছে তোমার ভেতর প্রচণ্ড অস্থিরতা। এ সময় স্থির হও সুরঞ্জন। তোমার মত প্রতিভাবান ছেলে হতাশায় ভুগলে চলবে কেন?
একটি টেবিলে মুখোমুখি দুজন বসে। কাজল দেবনাথ জিজ্ঞেস করেন— চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে?
সুরঞ্জন মাথা নাড়ে। খাবে। দুটো সিঙ্গাড়া খায় সে। কাজল দেবনাথও নেন। সিঙ্গারা খেয়ে দোকানের ছেলেটিকে বলেন–পানি দাও।
পানি শব্দটি সুরঞ্জন শোনে। কাজল দেকনাথ বাড়িতে জল বলেন। কিন্তু আজ তিনি পানি বললেন। এ কি অভ্যোস হয়ে গেছে পানি বলায়, তাই বললেন? নাকি ভয়ে বলান? সুরঞ্জনের জানতে ইচ্ছে করে। প্রশ্ন করতে গিয়েও সে করে না। তার মনে হয়, একসঙ্গে অনেকগুলো চোখ তাদের লক্ষ করছে। চায়ে দ্রুত চুমুক দেয় সে। ভয়ে? এ ভয় জন্মাচ্ছে কেন? গরম চায়ে হঠাৎ চুমুক পড়াতে তার জিভ পুড়ে যায়। তীক্ষ্ণ চোখে যে ছেলেটি পাশের টেবিল থেকে দেখছে, তার থুতনিতে দাড়ি, মাথায় একটি কুরাশি বোনা টুপিও। বয়স বাইশ একুশ হবে। সুরঞ্জনের মনে হয় মায়াকে যারা নিয়ে গেছে, এই ছেটি নিশ্চয়ই ছিল তাদের মধ্যে, না হলে এত কান পেতে আছে কেন? এত কেন একি মনোযোগ! সুরঞ্জন লক্ষ্য করে ছেলেটি মিটমিট হাসছে। তবে কি এই জন্য হাসছ যে কেমন বুঝছ মজা, বোনটিকে তো যাচ্ছেতাই করে খেলছি আমরা। চা শেষ হয় না রঞ্জনের। বলে— চলুন উঠি কাজলদা। ভাল লাগছে না।
—এত তড়িঘড়ি উঠতে চাইছ যে?
–ভাল লাগছে না।
লজ্জা (১০) জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘু সদস্য
১০ক.
জাতীয় সংসদে ১৯৫৪ সালে মোট সদস্য ছিলেন ৩০৯ জন। সংখ্যালঘু ছিলেন ৭২ জন,’৭০-এ ৩০০-র মধ্যে সংখ্যালঘু ১১ জন, ১৯৭৩ সালে ৩১৫ জনে ১২ জন, ১৯৭৯ সালে ৩৩০ জনে ৮জন। ১৯৮৬ সালে ৩৩০ জনে ৭ জন, ১৯৮৮ সালে ৪ জন, ১৯৯১ সালে ৩৩০ জনে ১২ জন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোনও সংখ্যালঘু ব্রিগেডিয়ার বা মেজর জেনারেল নেই। কর্নেল সত্তর জনে একজন, লেফটেনেন্ট কর্নেল চারশ পঞ্চাশ জনে আটজন, মেজর এক হাজার জনে চল্লিশ জন, ক্যাপ্টেন তেরশ জনে আটজন, সেকেন্ড লেফটেনেন্ট নয়শ জনে তিনজন, সিপাহি আশি হাজারে পাঁচশ জন। চল্লিশ হাজার বি ডি আর-এর মধ্যে হিন্দু মাত্র তিনশ জন। আশি হাজার পুলিশের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মাত্র দুই হাজার। এডিশনাল আই জি কেউ নেই, আই জি তো নেই-ই। পুলিশ অফিসারের ৮৭০ জন সদস্যের মধ্যে সংখ্যালঘু মাত্ৰ ৫৩ জন। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের উচ্চপদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনও লোক নেই। সচিবালয়ের অবস্থা আরও করুণ। সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদে কোনও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক নেই। জয়েস্ট সেক্রেটারি আছেন একশ চৌতিরিশ জনে মাত্র তিনজন, চারশ তেষট্টি জন ডেপুটি সেক্রেটারির মধ্যে সংখ্যালঘু আছেন। পাঁচশ জন। স্বায়ত্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর কর্মকতা ছেচল্লিশ হাজার। আটশ চুরানব্বই-এর মধ্যে আছেন সাড়ে তিনশ জন। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্ব-শাসিত প্ৰতিষ্ঠানের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকতা পদে সংখ্যালঘু লোক শতকরা পাঁচ ভাগের বেশি নেই। আবগারি ও শুষ্ক কর্মকতা একশ বাহান্নো জনে একজন, আয়কর কর্মকতা সাড়ে চারশর মধ্যে আটজন। রাষ্ট্রািয়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মকতা শতকরা এক ভাগ, কর্মচারী তিন থেকে চার ভাগ, শ্ৰমিক এক ভাগেরও নীচে। শুধু তাই নয়। বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক সহ কোনও ব্যাঙ্কেরই ডাইরেক্টর, চেয়ারম্যান বা এম ডি পদে হিন্দু নেই। এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোর কোনও শাখায় ম্যানেজার পদে হিন্দু নেই। ব্যবসা বাণিজ্য করতে গেলে মুসলমান অংশীদার না থাকলে কেবল হিন্দু প্রতিষ্ঠানের নামে সব সময় লাইসেন্স পাওয়া যায় না। তাছাড়া সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাঙ্ক, বিশেষত শিল্প সংস্থা থেকে শিল্প কারখানা গড়বার জন্য কোনও ঋণ দেওয়া হয় না।
