সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করে–সরকার কিছু সাহায্য-টাহায্য দেয়নি? –
-না। সরকার তো দেয়নি, কোনও সাহায্য সংস্থাকেও অনুমতি দেয়নি। অবশ্য বেসরকারি কিছু সংস্থা নিজ উদ্যোগে এগিয়ে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ খোলা আকার নিচে বসে আছে। কাপড় নেই, খাবার নেই, ঘর নেই, ধর্ষিতা মেয়েরা এক একজন বোবা হয়ে গেছে, রা নেই। ব্যবসায়ীরা সব হারিয়ে হাঁ হয়ে বসে আছে। এখনও ওদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে টাকা নিচ্ছে, জায়গা জমি দখল করছে। ঘরবাড়ির ক্ষতি বরিশাল বিভাগে পঁচাত্তর কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বিভাগে বিশ কোটি টাকা। ঢাকা বিভাগে দশ কোটি। খুলনা আর রাজশাহী বিভাগে এক কোটি করে। মোট একশ সাত কোটি টাকা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সব মিলিয়ে বাইশ কোটি টাকা। মন্দির সব মিলিয়ে সাতান্ন কোটি টাকা।
–আর ভাল লাগে না কাজলদা। আর ভাল লাগে না।
—সবচেয়ে খারাপ কি হচ্ছে জানো তো? দেশ ত্যাগ। এবারের ভয়াবহ দেশত্যাগকে ঠেকাবার আর উপায় নেই। সরকারি মহল থেকে সবসময় বলা হয়েছে দেশ ত্যাগ করছে না হিন্দুরা। কলকাতার দেশ পত্রিকা একবার লিখল না বছরে প্রায় লাখ দেড়েক বাংলাদেশির অনুপ্রবেশ ঘটছে এখানে এবং এর প্রধান অংশই আর ফিরে যাচ্ছে না। গত দুই দশকে পঞ্চাশ লক্ষেরও বেশি সংখ্যালঘু দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। ছটি সেনসাস রিপোর্ট কী বলছে দেখ, ১৯৪১ সালে মুসলমান ছিল ৭০.৩%, হিন্দু ছিল ২৮.৩%। ১৯৫১ সালে মুসলমান ছিল ৭৬.৯%, হিন্দু ছিল ২২.৫০%,। ১৯৬১ সালে মুসলমান ছিল ৮০.৪%, হিন্দু ১৮.৫%,। ১৯৭৪ সালে মুসলমান ৮৫.৪%, হিন্দু ১৩.৫%। ১৯৮১ সালে মুসলমান ৮৬.৭%, হিন্দু ১২.১%,। ১৯৯১ সালে মুসলমান ৮৭.৭৪%, হিন্দু ধর ১২.৬%। এর মানেটা কি, প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছে, হিন্দুর সংখ্যা কমছে। কমছে কেন, যাচ্ছে কোথায় তাহলে? সরকার যদি বলেনই যে মাইগ্রেশন হচ্ছে তবে সেনসাসের এমন রিপোর্ট কেন। এখন নতুন সেনসাসে কি নিয়ম হয়েছে জানো হিন্দু মুসলমান আলাদা করে গুনবে না।
–কারণ?
–কারণ হিন্দু সংখ্যা কমে যাওয়ার হিসেবটা পাওয়া যাবে বলে।
—তাহলে বলা যায় এই সরকার খুব চতুর, তাই না কাজলদা? সুরঞ্জন আড়মোড়া ভেঙে বলে।
কাজল দেবনাথ কিছু না বলে আরেকটি শলা ঠোঁটে নেন। জিজ্ঞেস করেন–এ্যাসট্রে আছে?
–পুরো ঘরটাকেই এ্যাসট্রে ধরে নিন।
—তোমার বাবা মা’র সঙ্গে যে দেখা করব, কি সান্ত্বনা ওঁদের দেব বলা! কাজল দেবনাথ মাথা নীচু করেন লজ্জায়। যেন তাঁর নিজের ভাই মায়াকে অপহরণ করেছে, এমন তাঁর লজ্জা ৷
আবার মায়া প্রসঙ্গ। আবার তার বুক থেকে অগ্নিগিরির লাভার মত বেরোয়। সুরঞ্জন প্রসঙ্গ পাল্টে বলে— আচ্ছা কাজলদা, জিন্নাহ তো বলেই ছিল এখন থেকে সবাই আমরা পাকিস্তানি, কোনও হিন্দু মুসলিম নয়। তারপর কি হিন্দুদের ভারত যাওয়া কমেনি?
—জিন্নাহ ছিল ইসমাইলিয়া খোজা। মুসলমান হলেও ওরা হিন্দুর উত্তরাধিকার আইন মানত। ওর পদবী আসলে খোজানি। নাম ছিল ‘ঝীনাভাই খোজানি’। ঝীনাটুকু রেখে বাকি নাম সে বাদ দিয়েছিল। জিন্নাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বটে, তারপরও হিন্দুরা বৈষম্যের শিকার হয়। তা নাহলে ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১১ লাখ হিন্দু ভারতে চলে যাবে কেন? ভারতে তারা রিফিউজি হিসেবে পরিচিত হয়।
–পশ্চিমবঙ্গের দাঙ্গায় অনেক মুসলমান এদেশেও চলে এসেছে।
–হ্যাঁ, আসাম আর ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে বহু মুসলমান এদেশে, চলেও গেছে। কারণ তখন ভারত ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে ‘নেহেরু লিয়াকত চুক্তি’ হয়েছিল, চুক্তিতে বলা হয় ‘দুদেশেই সংখ্যালঘুরা ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করবে।’ তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়, মত প্রকাশ এবং ধর্মীয় আচরণের স্বাধীনতাকেও স্বীকার করা হয়। এই চুক্তির শর্ত মতে ওখান থেকে আসা লোকগুলো ফিরে যায়। কিন্তু এখন থেকে যাওয়া লোকগুলো আর ফেরেনি। না। ফিরলেও তখনকার মত যাওয়া বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের আইনসভায় এমন দুটো আইন পাস হয়, ইস্ট বেঙ্গল ইভাকুই প্রোপার্টি এ্যাক্ট অব ১৯৫১ আর ইস্ট বেঙ্গল ইভাকুইস এ্যাক্ট অব ১৯৫১। এসব কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দেশত্যাগ করা লোকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫ লক্ষ। এসব তোমার বাবা ভাল জানবেন।
— বাবা এসব কিছুই বলেন না। আমাকে, দেশত্যাগের কথা উঠলে তিনি ফায়ার হয়ে যান। কিছুতে সহ্য করতে পারেন না।
–দেশত্যাগ কি আমরাই মানি? কিন্তু যারা যাচ্ছে, গোপনে চলে যাচ্ছে, তাদের তুমি ফেরাবে কি বলে? কিছু একটা আশ্বাস তো তাদের দিতেই হবে। নইলে নিজের মাটি থেকে কেউ যেতে চায়? শাস্ত্রে একটা কথা আছে না যে যে অপ্রবাসী সে-ই সবচেয়ে সুখী। মুসলমানরা হিজরত করে অভ্যস্ত। তারা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়িয়েছে ইতিহাসই বলে। কিন্তু হিন্দুর জন্য মাটি একটি ব্যাপার বটে।
বলতে বলতে কাজল দেবনাথ উঠে বারান্দায় যান। সম্ভবত আবেগকে প্রশমিত করবার জন্যই।
ফিরে এসে বলেন–বড় চা খেতে ইচ্ছে করছে। চল কোনও চায়ের দোকানে যাই।
সুরঞ্জন আর কাপড় পাল্টায় না। যে কাপড় ছিল, স্নান নেই, খাওয়াও কদিন পেটে পড়েছে ঠিক নেই। সে গায়ের লেপ ফেলে ঝাঁট করে দাঁড়িয়ে যায়। বলে —চলুন। শরীরে জং ধরে গেছে শুয়ে থাকতে থাকতে।
