উন্নয়ন খাতে, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলায় ইসলামি বিশ্বকোষ : সংকলন ও প্রকাশন ২০,০০,০০০। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্ৰ প্রকল্প **০,০,০০০। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা অনুবাদ ও গবেষণা কার্যক্রম ১,৬৮, ৭,০০০। ইমাম প্রশিক্ষণ প্রকল্প, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরি উন্নয়ন কাৰ্যক্রমে ১৫,০০,০০০। মসজিদ পাঠাগার প্রকল্প ২৫,০০,০০০। নতুন জেলাসমূহে ইসলামিক সংস্কৃতিক কেন্দ্র সম্প্রসারণ, ঈমান প্রশিক্ষণ/ট্রেনিং একাডেমি ১,৫০,০০,০০০। মোট উন্নয়ন বরাদ্দ ৫,৬৮,৭৫,০০০ টাকা। তারপর অন্যান্য ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মজুরি উপখাতে ২,৬০,০০০ টাকার বিভাজন হয়েছে এরকম, ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠান/ উৎসব উদযাপন ইত্যাদি ৫,০০,০০০। ইসলাম ধৰ্মীয় সংগঠনের জন্য কর্মসূচী ভিত্তিক সাহায্য মঞ্জুরি ৮,৬০,০০০। মাননীয় সংসদ সদস্য/ সদস্যদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মসজিদ সংস্কার মেরামত ও পুনবার্বাসনের জন্য ২,০০,০০,০০০। বিদেশ থেকে আগত ও বিদেশ গমনকারী ধর্মীয় প্রতিনিধি দলের জন্য ব্যয় বরাদ্দ ১০,০০,০০০। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংস্থা সংক্রান্ত চাঁদা ৬,৪০,০০০। নও মুসলমান, দুঃস্থ পুনর্বাসনের জন্য ১০,০০,০০০। ১৯৯২ সালে ধর্মীয় খাতের বাজেট বরাদ্দে দেখা যায় যে উন্নয়ন এবং অনুন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১৬,৬২,১৩,০০০। এই বাজেটের নও মুসলমানদের পুনর্বাসনের খাতট বেশ মজার। দশ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে এই খাতে। অথচ উন্নয়ন খাতে সংখ্যালঘুদের জন্য কোনও বরাদ্দ নেই। বহু ধর্মে বহু বর্ণে অধ্যুষিত একটি দরিদ্র দেশের জন্য বিশেষ একটি ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণের এই প্রলোভন অত্যন্ত লজ্জার। দেশের মেরুদণ্ড ভাঙা মাথা পিছু বিদেশি ঋণের বোঝা কত তা কি একবার আমরা হিসেব করি! এরকম যদি অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব তবে জাতীয় বাজেটে ইসলাম বিষয়ে এত মোটা কম বরাদ্দ কতটা যৌক্তিক? এবং এই বাজেটের বৈষম্যমূলক বরাদ্দ জাতীয় সম্প্ৰীতি নষ্ট করছে। কেউ কি ভাবে না এসব? সুরঞ্জন এইসব বৈষম্যের কথা ভাবতে ভাবতে দেখে দরজা খুলে কাজল দেবনাথ ঢোকেন।
—কি ব্যাপার অসময়ে শুয়ে আছ যে সুরঞ্জন?
—আমার আবার সময় অসময় কি! সুরঞ্জন সরে কাজলের বসবার জায়গা করে দেয়।
–মায়া ফিরেছে?
–নাহ। সুরঞ্জন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
—কি করতে পারি বল তো? কিছু একটা করা উচিত আমাদের।
–কি করবেন?
কাজল দেকনাথের কাঁচা পাকা চুল, বয়স চল্লিশের ওপর, ঢিলেঢালা শার্ট পরেছেন, কপালে তাঁরও ভাঁজ পড়েছে ভাবনার। সিগারেট বের করেন, বলেন–খাবে নাকি?
–দিন। হাত বাড়ায় সুরঞ্জন। অনেকদিন সিগারেট কেনা হয় না। তার ৷ পয়সা, কার কাছে চাইবে সে, কিরণময়ীর কাছে? লজ্জায় তো ওঘরে যাওয়াই সে বাদ দিয়েছে। মায়া হারিয়ে যাবার লজ্জা যেন তারই, এরকমই মনে হয় সুরঞ্জনের। দেশ নিয়ে সে-ই তো বেশি লাফিয়েছে, এদেশের মানুষ অসম্প্রদায়িক একথা তো সেই চেয়েছে বেশি প্রমাণ করতে, লজ্জা তাই তারই। সে এই লজ্জিত মুখ নিয়ে দাঁড়াতে চায় না। সুধাময়ের মত একজন আদর্শবান, সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের সামনে।
খালি পেটে সিগারেট ফোঁকে সুরঞ্জন। মায়া দেখলেই হয়ত ধরে বসত, বলত— খবরদার ভাল হবে না বলে দিচ্ছি। দাদা। খালি পেটে সিগারেট খােচ্ছ তো, নির্ঘাত ক্যান্সার হবে। মারবে।
সুরঞ্জনের যদি ক্যান্সার হত। মন্দ হত না। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করত। কোনও প্রত্যাশা নিয়ে তাকে বাঁচতে হত না।
কাজল দেবনাথ কি করবেন, কিছু খুঁজে পান না। তিনি বলেন—আজ তোমার বোনকে নিয়ে গেছে। কাল আমার মেয়েকে নেবে। নেবেই তো। আজ গৌতমের মাথায় কোপ পড়ল। কাল তোমার বা আমার মাথায় পড়বে।
সুরঞ্জন বলে–আমরা আগে মানুষ না হিন্দু, বলুন তো?
কাজল ঘরটির চারপাশ তাকিয়ে বলেন–এঘরেও এসেছিল, তাই না?
–হ্যাঁ।
–মায়া কি করছিল তখন?
–শুনলাম। বাবার জন্য ভাত মাখছিল।
–ওদের কিছুমার দিতে পারল না?
–কি করে দেবে। ওদের হাতে মোটা মোটা লাঠি, রড। আর হিন্দুর কি ক্ষমতা আছে মুসলমানের গায়ে হাত তোলা? ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানরা পাল্টা মারে। দুদিলে মারামারি হলে তাকে বলে দাঙ্গা। ওখানে হচ্ছে দাঙ্গা। আর লোকে এদেশের ঘটনাকে দাঙ্গা বলে। এখানে যা হচ্ছে তা হল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, এর নাম অত্যাচার বলা যায়, নির্যাতন বলা যায়। এক দল আরেক দলকে আচ্ছাসে পেটাচ্ছে, মারছে।
—মায়া কি ফিরবে মনে হয়?
—জানি না। সুরঞ্জন মায়ার প্রসঙ্গে গেলেই লক্ষ করে তার গলার কাছে কি যেন আটকে আছে। বুকের মধ্যটা খালি হয়ে যায়।
–কাজলদা, দেশে আর কি কি ঘটল?
সুরজন মায়া প্রসঙ্গ থেকে দূরে সরতে চায়।
কাজল দেকনাথ ঘরের ছাদের দিকে ধোঁয়া ছুঁড়ে দেন, বলেন— আঠাশ হাজার ঘরবাড়ি, দুহাজার সাতশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, তিন হাজার ছয়শ মন্দির ক্ষতিগ্ৰস্ত, বিধ্বস্ত। বারো জন হত, দুশ কোটি টাকার ক্ষতি। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। তেতাল্লিশটি জেলায় ধ্বংস যজ্ঞ চালানো হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে দু হাজার ছয়শ মহিলা। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ মন্দিরগুলো হচ্ছে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রায় পাঁচশ বছরের প্রাচীন মন্দির, এটি ছিল সিলেটের দক্ষিণে, বানিয়াচংয়ের প্রায় কয়েকশ বছরের প্রাচীন কালী বাড়ি, চট্টগ্রামের কৈবল্যধাম, তুলসীধাম, ভোলার মদনমোহন আখড়া, সুনামগঞ্জ আর ফরিদপুরের রামকৃষ্ণ মিশন।
