বাত্তরের সংবিধান পাল্টে আটাত্তরে সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম (দয়ালু, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে। ) বসানো হল। সংবিধানের বারো নম্বর ধারাটি পুরো ভ্যানিস করে দেওয়া হয়। ধারাটি এরকম ছিল Secularism and freedom of religion.
- The principle of secularism shall be realised by the elimination of
a. communalism in all its forms.
b. the granting by the State of political status in favour of any religion.
c. the abuse of religion forpolitical purposes.
d. any discrimination against, or persecution of, persons practising a particular religion.
সেকুলারিজম উড়িয়ে দিয়ে ২৫(২) নম্বর ধারায় যোগ করা হয় ‘রাষ্ট্র ইসলামি সংহতির ভিত্তিত মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।
বাহাত্তরে সংবিধানের ছয় নম্বর ধারায় ছিল The citizenship of Bangladesh shall be determined and regulated by law; citizens of Bangladesh shall be known as langalees. জিয়াউর রহমান করলেন The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.
সুধাময় চোখে অন্ধকার দেখেন। দুপুরও গড়ায়নি এখনই ঘর কেন অন্ধকার হবে। তবেকি তাঁর চোখের জ্যোতি কমে যাচ্ছে। নাকি অনেক দিন হল চশমা পাল্টানো হচ্ছে না, তাই। নাকি ছানি পড়ছে চোখে, নাকি বারবার জল এসে ঝাপসা করে দিচ্ছে তাঁর চোখ।
সুরঞ্জনটাও কেমন পাল্টে যাচ্ছে। কাছে এসে একটিবার বসেও না। মায়াকে ধরে নিয়ে যাবার পর দিন থেকে এঘরে সে ভুলেও পা দেয় না। সুধাময় এঘর থেকেই ওঘরের আড্ডায় মদ খাবার শব্দ শোনেন। ছেলেটি কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? ঘরে বসে মদ্যপান করতে কখনও তিনি সুরঞ্জনকে দেখেননি। সে হয়ত এখন আর কাউকে কেয়ার করছে না। মায়াকেও ভুলে গেল দুদিনে! সুধাময়ের বিশ্বাস হয় না, তার হঠাৎ স্তব্ধতা সুধাময়কে আরও ব্যাকুল করে তোলে, ছেলেটি উচ্ছন্নে যাচ্ছে না তো!
৯গ.
সুরঞ্জন কোথাও বেরোবে না। মায়াকে যে খুঁজে কোনও লাভ নেই তা সে বুঝে গেছে। তার চেয়ে ঘরে বসে থাকাই ভাল, রাস্তায় বেরোলেই লোকে বলবে ‘শালা মালাউনের বাচ্চারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছে। এদের সব ঠেঙিয়ে ভারত পাঠানো উচিত। ‘ এসব শুনতে শুনতে কান পচে যাচ্ছে সুরঞ্জনের। সে এখন কোনও সমাজতান্ত্রিক পাটি, বামপন্থী নেতা-ফেতায় বিশ্বাস করে না। অনেক বামপন্থীকেও সে তাকে গাল দিতে শুনেছে ‘শালা মালু, মালাউনের বাচ্চা’ বলে। কৃষ্ণবিনোদ রায়কে সবাই বলত কবীর ভাই। বারীন দত্তকে নাম পাল্টে আবদুস সালাম হতে হয়। কমিউনিস্ট পাটিতেও যদি হিন্দু নাম পাল্টাতে হয়, তবে কোন পাটিতে আর ভরসা করা যায়! নাকি সে জামাতে নাম লেখাবে? সোজা গিয়ে নিজামিকে বলবে—’হুজুর, আসসালামু আলায়কুম!’ পরদিন খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে খবর বেরোবে ‘হিন্দুর জামাতি ইসলামে যোগদান।‘ জগন্নাথ হলেও নাকি জামাতি ইসলামি ভোট পায়, এর কারণ টাকা। মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পেলে কে ভোট দেবে না জামাতিকে? সুরঞ্জন শোধ নিতে চায় বামপন্থী দলগুলোর ওপর, যে দলগুলো তাকে আশার বদলে হতাশায় ডুবিয়েছে, দলের লোক একের পর এক অন্য দলে ঢুকে গেছে। আজ এক কথা বলে কাল আরেক কথা বলেছে। কমরেড ফরহাদ মারা গেলে সি পি বি অফিসে কোরানখানি আর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন হয়েছে। মহা সমারোহে কমরেডের জানাজা হয়েছে। কেন হয়েছে, কেন কমিউনিস্টদের ইসলামের পতাকা তলেই শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয়? জনগণের নাস্তিক অপবাদ থেকে বাঁচবার জন্য তো! কই তাতে বেঁচেছে কি তারা? এত কপাল ঠুকেও দেশের সবচেয়ে পুরনো পার্টিটি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। দোষ সুরঞ্জন জনগণকে দেয় না, দেয় বামপন্থী নামের দিশেহারা নেতাদেরই।
দেশে আজ মাদ্রাসা বাড়ছে। একটি দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেবার জন্য এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত উত্তম বৈকি। শেখ মুজিবই বোধহয় গ্রামে গ্রামে মাদ্রাসার প্রসার করেছিলেন। কোথা দিয়ে কে যে দেশটির সর্বনাশ করে গেছে, যে জাতি ভাষা আন্দোলন করল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ করল, সে জাতির এমন সর্বনাশ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। কোথায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের সেই বোধ, কোথায় ‘বাংলার হিন্দু বাংলার বৌদ্ধ বাংলার খ্রিস্টান বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালির সেই সুর, সেই চেতনা? সুরঞ্জন বড় এক বোধ করে। বড় একা। ফেন সে বাঙালি নয়, মানুষ নয়, হিন্দু একটি দ্বিপদী জীব নিজের মাটিতেই নিজে ‘পরবাসী’ হয়ে বসে আছে।
এ বংশের মন্ত্রণালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে। ধর্মীয় খাতে বিগত বছরের বাজেট ছিল বেশ উপাদেয়। সুরঞ্জন একে উপাদেয়ই বলবে। অনুন্নয়ন খাতে ছিল ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সাহায্য মঞ্জুরি; ইসলামিক ফাউন্ডেশন ঢাকা ১,৫০,০০,০০০ টাকা। ওয়াকফ প্রশাসক মজুরি ৮,০০,০০০ টাকা। অন্যান্য ধৰ্মীয় উদ্দেশ্যে মজুরি ২,৬০,৭৫,০০০। জাকাত ফান্ড প্রশাসক মঞ্জুরি ২,২০,০০০। ইসলামিক মিশন প্রতিষ্ঠান বাবদ অয় ২,৫০,০০,০০০। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আমানত তহবিল ২,৫০,০০০। মসজিদে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ১,২০,০০,০০০। মসজিদে বিনামূল্যে পানি সরবরাহ ৫০,০০,০০০। ঢাকা তারা মসজিদ ৩,০০,০০০। মোট ৮,৪৫,৭০,০০০ টাকা। বায়তুলমোকারম মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ : ১৫,০০,০০০। প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম নিবিড়করণ ও প্রসারের জন্য থোক বরাদ্ধ সহ মোট অনুন্নয়ন বরাদ্দ :, ১০,৯৩,১৮,০০০। এর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আমানত তহবিল হিসেবে বরাদের পরিমাণ মাত্র ২,৫০,০০০ টাকা। দেশে ধৰ্মীয় সংখ্যালঘু প্রায় আড়াই কোটি। আড়াই কাটি লোকের জন্য আড়াই লাখ টাকার বরাদ্দ বেশ মজার বৈকি।
