চট্টগ্রামের মিরসরাই-এ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কমল ভৌমিকের বাড়িতে আগুন ধারালে তার কাকী সেই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। কুতুবদিয়ার হিন্দু পল্লীতে আগুন ধরিয়ে দিলে তিনটি শিশু পুড়ে মারা গেছে। সাতকানিয়ার নাথপাড়ায় সূর্যমোহন আগুনে পুড়েছে। মিরসরাই-এর বাসুদেবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল গ্রামে কারা আক্রমণ করেছে, বাসুদেব বলেছে।–রাতে যারা মারে, দিনে তারাই এসে সমবেদনা জানিয়ে বলে ‘তোরা গো লাই পরাণ পুড়ে। খাজুরিয়ার যাত্রামােহন নাথকে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছে, ‘তার থেকে আমাকে গুলি করে দিন, সেটা ভাল হবে। * আর এদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হওয়ার ছ’দিন পর বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল, জাতীয় সমন্বয় কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মিলে সর্বদলীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্ৰীতি গঠন করেছে। সাম্প্রদায়িকতার আগুন যখন নিভেছে কমিটি গঠন করা হল তখন। এই কমিটি একটি শান্তি মিছিল আর একটি গণসমাবেশ ছাড়া আর কোনও কর্মসূচী এখন পর্যন্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণসমাবেশ থেকে জামাত শিবির ফ্রিডম পাটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করবার দাবি জানানো হবে। এই দাবি সম্পর্কে সম্প্রীতি কমিটি কতটা গুরুত্ব দেবে, সরকার জামাত শিবির ফ্রিডম পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ না করলে সম্প্রীতি কমিটি এ নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনে যাবে কি না। এ নিয়ে সুরঞ্জন জানে নেতারা কোনও কিছু বলবে না। কমিটির কেউ কেউ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করবার কথা বলেছেন। কিন্তু শনির আখড়ার ক্ষতিগ্রস্ত একজন বলেছেন—’শনির আখড়া ভাঙচুর করেছে যারা, আমাদের ঘরবাড়ি যারা পুড়িয়েছে, লুটপাট করেছে, তাদের আমরা চিনি; কিন্তু মামলা আমরা করব না। কারণ বিরোধী দলগুলো যখন আমাদের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে পারল না, তখন মামলার পর আমাদের নিরাপত্তা তারা দিতে পারবে না। * মামলা করা নিয়ে সারা দেশে এই ধরনের প্রতিক্রিয়াই হবে, মামলা করবার আহ্বানকে সুরঞ্জন রাজনৈতিক স্টােস্টই মনে করছে। গণতান্ত্রিক শক্তি দ্রুত কর্মসূচী নিয়ে সাম্প্রদায়িক হিংস্ৰতা রোধে এগিয়ে যেতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো সেই তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত এবং কাজও করছে দ্রুত। এক সপ্তাহ পর সর্বদলীয় সম্প্ৰীতি কমিটি গঠন করে গণতান্ত্রিক (?) রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনগুলোর আত্মসন্তুষ্টির কোনও কারণ নেই। পাকিস্তান এবং ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কম হয়েছে এরকম তৃপ্তি অনেক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও আছে, কিন্তু সুরঞ্জন বোঝে না। ওরা কেন বুঝতে চায় না। বাংলাদেশে ঘটনা ঘটে একতরফা। এখানের হিন্দুরা ভারতের মুসলমানের মত পাল্টা আঘাত করে না। সেই কারণে পাল্টা-পাল্টি হয় না। এই উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রেই মৌলবাদী-ফ্যাসিবাদী অপশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে সরকারি দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দার জন্য। মৌলবাদীরা শক্তি সঞ্চয় করছে। ভারতে, তাজিকিস্তানে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে, আলজেরিয়ায়, মিশরে, ইরানে, সার্বিয়ায়। তাদের লক্ষ একটিই, গণতান্ত্রিক শক্তিকে আঘাত করা। জার্মানির সরকার তিনজন তুর্কি নারীকে পুড়িয়ে মারবার অপরাধে দুটো ফ্যাসিবাদী দলকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ভারতেও নিষিদ্ধ হয়েছে মৌলবাদী দলগুলো, অবশ্য ভারতের এই নিষেধাজ্ঞা ক’দিন টেকে বলা যায় না। আলজেরিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছে। মিশর সরকার কঠোর হাতে দমন করছে মৌলবাদীদের। তাজিকিস্তানে যুদ্ধ হচ্ছে মৌলবাদী এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে। বাংলাদেশ সরকার কি মৌলবাদী ফ্যাসিবাদী দলগুলো নিষিদ্ধ করার কথা একবার ভুলেও বলেছে! আর যে দেশেই হোক, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি অন্তত এ দেশে বন্ধ হবে না; সুরঞ্জন ভাবে।
ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক দলগুলোর কল্যাণে ক্ষমতাসীন বি এন পি সরকার গোলাম আজম বিচারকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের গতিমুখ ঘুরিয়ে সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এ ব্যাপারে জামাত শিবির ফ্রিডম পার্টি এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলের তৎপরতা সরকারকে সাহায্য করেছে। জামাতে ইসলামি দেশবাসীর মন অন্যদিকে ফিরিয়ে স্বস্তি পেয়েছে গোলাম আজম-বিচার আন্দোলনের চাপ থেকে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের মিছিলে শ্লোগান উঠেছে-‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজাদের রুখবে এবার বাংলাদেশ। আহা বাংলাদেশ। সুরঞ্জন সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বলেশালা শুয়োরের বাচ্চা বাংলাদেশ। গালিটি সে বারবার উচ্চারণ করে। তার বেশ আনন্দ হয়। হোসেও ওঠে। হঠাৎ, হাসিটিকে নিজের কাছেই বড় ক্রুর মনে হয়।
৯খ.
মদল কিরণময়ীর গা ঘেঁষে বসে থাকে। বলে—মাসিম, আমরা মিরপুর চলে যাচ্ছি। ওখানে গুণ্ডারা যেতে পারবে না।
–কোন পারবে না?
—মিরপুর তো অনেক দূর।
মাদল এরকমই বোঝে যে গুণ্ডারা কেবল টিকাটুলিতে থাকে। তারা মিরপুর দূর বলে ওখানে যায় না। কিরণময়ী ভাবেন যারা হিন্দুদের বাড়ি লুট করে, ভাঙে পোড়ায়, মায়াদের নিয়ে যায়, তারা কি কেবল গুণ্ডা? গুণ্ডারা তো হিন্দু মুসলমান মানে না, সব বাড়িই আত্রিমণ করে। যারা ধর্ম দেখে লুট করে, হরণ করে, তাদের গুণ্ড বললে গুণ্ডা নামটিকেই বরং অপমান করা হয়।
সুধাময় শুয়ে আছেন। শুয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও কাজই তো নেই তার। আচল অথর্ব জীবন নিয়ে কী প্রয়োজন বেঁচে থেকে। খামোেকা কিরণময়ীর কষ্ট। সৰ্বংসহা মানুষ এইকিরণময়ী। এতটুকু ক্লান্তি নেই তাঁর। সারারাত চোখের জল ফেলেন, তাঁর কি আর চুলে ধরাতে ইচ্ছে করে। তবু ধরাতে হয়। পেটের যন্ত্রণা তো সব ছাপিয়ে ওঠে। সুরঞ্জন তো বাদই দিয়েছে নাওয়া-খাওয়া, কিরণময়ীও অনেকটা। সুধাময়েরও রুচি হয় না। মায়া যে আজও ফিরছে না! মায়া কি ফিরিবে না? তাঁর জীবনের বিনিময়ে যদি পারতেন মায়াকে ফিরিয়ে আনতে! যদি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে বলা যেত–’মায়াকে ফেরত চাই। মায়াকে ফেরত চাইবার অধিকার আমার আছে।’ অধিকার? অধিকার শব্দটি এখন সুখময়ের কাছে ভূতুড়ে একটি শব্দ মনে হয়। ছেচল্লিশে, তখন কত আর বয়স সুধাময়ের, কালীবাড়ির এক দোকানে সন্দেশ খেয়ে তিনি বলেছিলেন—’এক গ্লাস পানি দাও তো ভাই।’ শহরে তখন ঘন হয়ে উঠছিল হিন্দু মুসলমানে অসন্তোষ। মিষ্টির দোকানে তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছিল কিছু মুসলমান। ‘জল’ বলতে পারেনন সুধাময়। ভয়ে? ভয়েই হবে, আর কী!
