—কাঁপছে? তোমার জন্য খুব মায়া হচ্ছে বলে। তুমি যে চলে যাবে।
—আমরা তো আর ইন্ডিয়া যাচ্ছি না। যাচ্ছি মিরপুরে। সুবলরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে।
—তোমাদের বাড়িতে যখন ঢোকে ওরা, কি করছিলে তখন?
—বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। ভয়ে। ওরা আমাদের টেলিভিশনটা নিয়ে গেছে, আলমারি থেকে গয়নার বাক্স নিয়ে গেছে। বাবার টাকাও নিয়েছে।
–তোমাকে কিছু বলেনি। ওরা?
–যাবার সময় আমার গালে জোরে দুটো চড় মেরেছে। বলেছে চুপ করে থাক, কাঁদবি না।
—আর কিছু করেনি? তোমাকে ধরে নিতে চায়নি?
–না। মায়াদিকে ওরা মারছে খুব, তাই না? আমার দাদাকেও মেরেছে। দাদা ঘুমিয়ে ছিল। দাদার মাথায় লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়েছে। রক্ত বেরিয়েছে অনেক।
সুরঞ্জন ভাবে, মায়ার বয়স যদি মাদলের মত হত, তবে বোধহয় বেঁচে যেত। অমন টেনে হিঁচড়ে ওকে কেউ নিত না। মায়াকে ওরা ক’জন মিলে ধর্ষণ করছে? পাঁচজন? সাতজন? নাকি আরও বেশি। মায়ার কি খুব রক্ত ঝরছে?
মাদল বলে—মা পাঠাল, বলল মসিমার সঙ্গে দেখা করে আয়। মাসিমা যে খুব কাঁদছেন।
—মাদল, তুমি আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে?
—মা চিন্তা করবে।
–তোমার মা’কে বলে যাবে।
মায়া খুব বলত ‘দাদা, একবার কক্সবাজার বেড়াতে নেবে? চল না মধুপুর জঙ্গলে যাই? আমার খুব সুন্দরবনেও যেতে ইচ্ছে করে।’ ক’দিন জীবনানন্দের কবিতা পড়ে ধরল ‘নাটোর যাব।’ সুরঞ্জন মায়ার সব আবদারই ছোঃ বলে উড়িয়ে দিত। বলত ‘রাখ তোর নাটোর-ফাটোর। তার চেয়ে তেজগাঁর বস্তিতে যা, মানুষ দেখ। মানুষের জীবন দেখ। ওসব গাছ পাথর দেখার চেয়ে জীবন দেখা অনেক ভাল।’ মায়ার উৎসাহ চুপসে যেত। আজ ভেবে সুরঞ্জনের মনে হয় কী লাভ হয়েছে তার জীবন দেখে? কী লাভ হয়েছে জন্ম থেকে মানুষের ভাল চেয়ে? শ্রমিক কৃষকের আন্দোলন, প্রলেতারিয়েতের উত্থান, সমাজতন্ত্রের বিকাশ, এসব কথা ভেবে কী লাভ হল, সেই তো পতনই হল সমাজতন্ত্রের, সেই তো নামানেই হল লেনিনকে দড়ি বেঁধে টেনে। সেই তো হলই হার, মানবতার গান গেয়ে বেড়িয়েছে যে ছেলে, তারই ঘরে আজ চূড়ান্ত অমানবিক হামলা।
মাদল ধীরে উঠে যায়। তার হাত থেকে মায়ার মত মাদলের নরম হাতটি সরে যায়। হায়দার আজও আসছে না। নাকি সে রণে ভঙ্গ দিয়েছে! সে আর ঝামেলায় জড়াতে চায় না। সুরঞ্জনও বোঝে মায়াকে খোঁজাখুঁজি করা বৃথা। মায়া যদি ফেরত আসে, সেই ছ’বছর বয়সের মত ফেরত আসবে। সুরঞ্জনের বড় খালি খালি লাগে। মায়া যখন পারুলদের বাড়ি ছিল, এ বাড়িও তখন এমনই নিস্তব্ধ ছিল, তবু কোনও খারাপ লাগা তার ছিল না। জানত সে মায়া আছে, ফিরবে। আর এখন শ্মশান শ্মশান লাগে বাড়িটি। যেন কেউ মরেছে। ঘরে মদের বোতল, পায়ের কাছে গড়ানো গ্লাস, ছড়ানো বই দেখতে দেখত সুরঞ্জনের খালি বুকটা জলে ভরে যায়। চোখের জলগুলো যেন সব বুকে গিয়ে জমেছে।
এবার কামাল, রবিউল, কেউ খোঁজ নেয়নি সুরঞ্জনের। ভাবছে হয়ত, যাদের জীবন তারাই সামলাক। বেলাল যে গত রাতে এল, তার কণ্ঠেও সে একই সুর শুনেছে ‘তোরা আমাদের বাবরি মসজিদ ভেঙেছিস কেন? সুরঞ্জন ভাবে, বাবরি মসজিদ ভারতীয়দের মসজিদ, এ মসজিদ বেলালের হতে যাবে কেন? আর সুরঞ্জনরা বাবরি মসজিদ ভাঙল কি করে? সুরঞ্জন নিজে কখনও ভারতেই যায়নি। সে কি করে মসজিদ ভাঙল, বেলাল কি ভারতের হিন্দু আর এ দেশের হিন্দুকে এক করে দেখছে? হিন্দুরা মসজিদ ভেঙেছে এর অর্থ সুরঞ্জনরা ভেঙেছে? অযোধ্যার হিন্দু মৌলবাদী এবং সুরঞ্জন এক? বেলাল কামাল হায়দারের মত নয় সে? সে কি কেবলই হিন্দু? ভারতের মসজিদ ভাঙবার দায় সুরঞ্জনের? ধর্মের কাছে দেশ আর জাতি তুচ্ছ হয়ে যায়? সে না হয় যারা অশিক্ষিত, দুর্বল যারা ধর্মের খুঁটি আঁকড়ে বাঁচে, তারা ভাবে; কিন্তু বেলাল কেন? বেলাল উচ্চশক্ষিত ছেলে, ফ্রিডম ফাইটার, ধর্মের ক্লেদে তারও পা ফসকে যাবে কেন? এ সব প্রশ্ন সে কোনও উত্তর পায় না। দুটো কলা আর বিস্কুট রাখা টেবিলে। কিরণময়ী রেখে গেছেন নিঃশব্দে। ওগুলো না ছুঁয়ে তার বরং বোতলের বাকি মদটুকু চকঢক করে পান করতে ইচ্ছে করে। কাল অচেতন ঘুমিয়ে ছিল, মায়া এসে বার বার তাকে চুৰ্ণ করেছি। চেতন ফিরলেই মেয়েটির মুখ ভাসে। চোখ বুজলেই মনে হয় তাকে ছিড়ে খাচ্ছে একপাল কুকুর।
হায়দার জানাতেও আসেনি মায়ার খবর কোথাও পাওয়া গেল কি না। সন্ত্রাসীদের হায়দার যতটা চেনে, সুরঞ্জন ততটা চেনে না বলে ওর আশ্রয় নেওয়া। নইলে সে তো বেরিয়ে পড়তে পারত গলি-ঘুপচির ভেতর। অবশ্য হিন্দুদের রেপ করতে এখন আর গলি-ঘুপচির দরকার হয় না, সে প্রকাশ্যেই করা যায়। প্রকাশ্যে যেমন লুট হয়। ভাঙা পোড়া হয়। হিন্দুদের অত্যাচার করতে আজকাল এত রাখঢাকের দরকার হয় না। কারণ সরকারের সায় তো একরকম আছেই। সরকার তো আর সেকুলার রাষ্ট্রের সরকার নয়। মৌলবাদীদের স্বাৰ্থই কায়দা করে রক্ষা করছে তারা। শেখ হাসিনা সেদিন বলেছেন ভারতীর চৌদ্দ কোটি মুসলমানের জানমাল রক্ষা করবার খাতিরে দেশে সাম্প্রদায়িকতা বজায় রাখতে হবে। শেখ হাসিনাকে কেন ভারতের মুসলমানের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবতে হয়? এ দেশের মানুষের নাগরিকের অধিকারের কারণেই কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষা জরুরি নয়? নিজ দেশের নাগরিকের জানমালের চেয়ে ভারতীয় মুসলমানের জনগণের প্রতি দরদ বেশি দেখাতে হয় কেন? তবে কি ধরে নিতে হবে জামাতি ইসলামি যে ভারত বিরোধিতা এবং ইসলাম মশলায় আজ রান্না চড়াচ্ছে জনগণকে গেলাবে বলে, সেইন মশলা আওয়ামি লিগকেও ব্যবহার করতে হচ্ছে? এও কি কমুনিস্টদের ইসলামি মুখোশ পরবার কৌশল? ভারতের মুসলমানের স্বার্থে নয়, সবচেয়ে মৌলিক এবং যৌক্তিক কারণ হল ‘সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণ। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসসহ জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করবার অধিকার এ দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে হিন্দুদের জন্য স্বীকৃত। কোনও ধর্ম বা কোনও রাজনৈতিক দলের কৃপায় নয়, কোনও ব্যক্তিবিশেষের করুণায় নয়, হিন্দুদের বাঁচবার অধিকার রাষ্ট্ৰীয় নীতিমালায় আছে বলেই তারা আর দশটা মানুষের মত বাঁচবে। কেন সুরঞ্জনকে কামাল বেলাল বা হায়দারের আশ্রয়ে বা অনুকম্পায় বেঁচে থাকতে হবে?
