সুরঞ্জন মুখ তোলে না।
—জি ডি এন্ট্রি করা হয়েছে?
সুরঞ্জন তবুও মুখ তোলে না। বেলাল আর সবার দিকে তাকিয়ে উত্তরের আশা করে। কেউ এ ব্যাপারে কিছু জানে না ইঙ্গিতে জানায়।
—কোনও খোঁজখবর করেছি, কারা নিয়েছে?
সুরঞ্জন এবারও মুখ তোলে না। বেলাল বিছানায় বসে। সিগারেট ধরায়। বলে—কি যে শুরু হয়েছে চারদিকে। গুণ্ডা বদমাশরা ভাল একটা সুযোগ পেয়েছে। ওদিকে ইন্ডিয়ায় তো ‘আমাদের’ সমানে মারছে।
—আপনাদের মানে? বিরূপাক্ষ জিজ্ঞেস করে।
—মুসলমানদের। বি জে পি তো কচু-কাঁটা করছে।
–ও।
–ওদিককার খবর শুনে এদেরও মাথার ঠিক নেই। দোষ কাকে দেব। ওখানে ‘আমরা’ মরছি। এখানে ‘তোমরা’। কী দরকার ছিল মসজিদটাি ভাঙার। এত বছরের পুরনো মসজিদ। মহাকাব্যের চরিত্র রামের আঁতুড় ঘর খুঁজতে মসজিদ খুঁড়ছে ইন্ডিয়ানরা। কদিন পর বলবে তাজমহলে হনুমানের জন্ম হয়েছিল, সুতরাং তাজমহল ভাঙো। ব্যস ভেঙে ফেলবে। ভারতে নাকি সেকুলারিজমের চর্চা হয়! মায়াকে আজ ধরে নিচ্ছে কেন? মূল নায়ক তো আদভানি, যোশী। মেটিয়াবুরুজের অবস্থা শুনেছি ভয়াবহ।
সুরঞ্জন বেওয়ারিশ লাশের মত পড়ে থাকে মেঝেয়। ওঘর থেকে কিরণময়ীর কান্নার শব্দ, সুধাময়ের অস্ফুট গোঙানো বেলালের দুঃখকে ম্লান করে দেয়।
—মায়া নিশ্চয় ফিরে আসবে। ওরা তো আর জলজ্যান্তু মেয়েটিকে খেয়ে ফেলবে না। ককিমাকে বল ধৈর্য ধরতে। আর তুমিই বা মেয়েমানুষের মত এমন কাঁদাছ কেন? কেঁদে সমস্যার সমাধান হবে? আর আপনারাই বা বসে আছেন কেন?’ মেয়েটা গেল কই খোঁজখবর তো করতে পারেন।
বিরূপাক্ষ বলে–আমরা তো এইমাত্রই খবরটা জানলাম। কাউকে ধরে নিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায়? আর কোথায় বা খুঁজব।
—নিশ্চয় গাঁজা হেরোইন খায়, পাড়ারই হবে। চোখ পড়েছে মেয়ের দিকে। তাই চান্স পেয়েছে, ধরে নিয়ে গেছে। ভাল লোকেরা এসব করে? আজকালকার উঠতি ছেলেপেলেরা কী সব যাচ্ছেতাই কাণ্ড করছে। মূল কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বুঝলেন?
বিরূপাক্ষ মাথা নীচু করে। এদের কারও সঙ্গে বেলালের আলাপ নেই। বেলাল উত্তেজিত, পকেট থেকে বেনসন আর লাইটার বের করে। সিগারেটটি হাতেই থাকে তার ৷ বলে—মদ কোনও সমাধান হল? আপনারাই বলুন, মদ কোনও সমাধান? এ দেশে কখনও বড় কোনও দাঙ্গা হয়েছে? এসব তো দাঙ্গা নয়। মিষ্টি খাবার লোভে ছেলেরা মিষ্টির দোকান লুট করে। ভারতে এ পর্যন্ত চার হাজার নাকি ছয় হাজার দাঙ্গা হয়েছে। হাজার হাজার মুসলমান মারা গেছে। এখানে কটা হিন্দু মারা গেছে? প্রতিটি হিন্দু এলাকায় ট্রাক ভর্তি পুলিশ দেওয়া হয়েছে।
কেউ কোনও কথা বলে না। সুরঞ্জনও না। সুরঞ্জনের কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তার ঘুম পায় খুব। বেলাল সিগারেটটি ধরায় না। কাছেই কোথাও তার কাজ আছে বলে চলে যায়। এক এক করে অন্যরাও চলে যায়।
লজ্জা (০৯) গোপালদের বাড়ি লুট হয়েছে
৯ক.
গোপালদের বাড়ি লুট হয়েছে। সুরঞ্জনদের পাশের বাড়িই। একটি দশ-বারো বছরের মেয়ে আসে সুরঞ্জনদের বাড়িতে। গোপালের ছোট বোন। সে এসে ভাঙা ঘরদোর দেখে। ঘরগুলোয় নিঃশব্দে হাঁটে। সুরঞ্জন শুয়ে শুয়ে মেয়েটিকে দেখে, বেড়ালের মত মেয়েটি। এই বয়সেই চোখে নীল ভয় তার, মেয়েটি সুরঞ্জনের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গো গোল চোখে তাকায়। সুরঞ্জন মেঝেতেই পড়ে ছিল সারারাত। বারান্দার রোদ দেখে ঠাহর হয়। বেলা হয়েছে অনেক। ইশারায় মেয়েটিকে ডাকে সে। জিজ্ঞেস করে—তোমার নাম কি?
–মাদল।
—কোন স্কুলে পড়?
—শেরে বাংলা বালিকা বিদ্যালয়।
স্কুললটির নাম আগে ছিল ‘নারী শিক্ষা মন্দির। লীলা নাগের করা। লীলা নাগের নাম কিন্তু আজ উচ্চারিত হয় কোথাও? মেয়েদের যখন লেখাপড়া করবার নিয়ম ছিল না, তখন তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে স্কুলে পড়বার জন্য মেয়েদের উৎসাহ দিতেন। ঢাকা শহরে তিনি নিজে খেটে মেয়েদের স্কুল গড়েছিলেন। সেই স্কুলটি এখনও আছে, মানে সেই দালানঘরটি আছে, কিন্তু নামটি বদলে গেছে। সম্ভবত লীলা নাগের নাম উচ্চারণ করা বারণ, নারী শিক্ষা মন্দির নামেও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে কি না কে জানে। এও ঠিক বি এম কলেজ, এম সি কলেজের মত। সংক্ষেপের জট খুললে মুসলমানের দেশে হিন্দুত্ব না আবার প্রকট হয়ে ওঠে। একাত্তরেও ঢাকার রাস্তার নাম বদলের চক্রান্ত চলেছিল, পাকিস্তানিরা শহরের দুশ চল্লিশটি রাস্তার নাম পরিবর্তন করে ইসলামিকরণ করেছিল–লালমোহন পোদ্দার লেনকে আবদুল করিম গজনভী স্ট্রিট, শাঁখারি নগর লেনকে গুল বদন স্ট্রিট, নবীন চাঁদ গোস্বামী রোডকে বখতিয়ার খিলজি রোড, কালীচরণ সাহা রোডকে গাজী সালাউদ্দিন রোড, রায়ের বাজারকে সুলতানগঞ্জ, শশীভূষণ চ্যাটার্জি লেনকে সৈয়দ সলীম স্ট্রিট, ইন্দিরা রোডকে আনার কলি রোড এরকম।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করে–আপনি মাটিতে ঘুমোচ্ছেন কেন?
—মাটি যে আমার ভাল লাগে।
—মাটি আমারও খুব ভাল লাগে। আমাদের এ বাড়িতে উঠেন ছিল, এ বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছি, নতুন বাড়িতে উঠোন নেই। মাটিও নেই।
–তা হলে তুমি খেলা করতেও পারবে না। মেয়েটি সুরঞ্জনের মাথার কাছে বসে। খাটের পায়ায় হেলান দিয়ে। তারও ভাল লগছে সুরঞ্জনের সঙ্গে গল্প করতে। সে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বলে—আমার খুব মায়া হচ্ছে চলে যেতে। মেয়েটি মায়া শব্দটি উচ্চারণ করতেই সুরঞ্জনের গা ঝিমঝিম করে ওঠে। মেয়েটিকে সে আরও কাছে বসতে বলে। যেন এ মায়া। ছোটকালের মায়া, দাদার কাছে বসে গল্প করত যে মেয়েটি। স্কুলের গল্প, খেলাধূলার গল্প। কতদিন মায়াকে কাছে বসিয়ে গল্প করা হয়নি। নদীপাড়ে মাটির ঘর বানাত সুরঞ্জনরা ছোটবেলায়। মায়াও বানাত। বিকেলে বানিয়ে রাখত, রাতের ফুঁসে ওঠা অন্ধকার জল ভেঙে দিত তাদের মাটির খেলাঘর। হাওয়াই মিঠাই খেয়ে জিভ গোলাপি করবার সেই দিন, সেই মহুয়া মলুয়ার দিন, বাড়ি পালিয়ে কাশবনে ঘুরে বেড়াবার দিন…মেয়েটিকে হাত বাড়িয়ে ছোঁয় সুরঞ্জন। মায়ার মত নরম নরম হাত। মায়ার হাত দুটো এখন কারা ধরে আছে, অনেকগুলো নির্মম নিষ্ঠুর কর্কশ হাত নিশ্চয়ই। মায়া কি ছুটতে চাইছে? ছুটতে চাইছে, পারছে না? আবার তার ঝিমঝিম করে ওঠে গা। সে ধরেই রাখে মাদলের হাতখানা। যেন মায়া সে। ছেড়ে দিলে কেউ ধরে নিয়ে যাবে। কেউ বেঁধে ফেলবে শক্ত দাঁড়িতে। মাদল বলে–আপনার হাত কাঁপছে কেন?
