সুরঞ্জন গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে–গোলাম আজম গোলাম আজম গোলাম আজম। গোলাম আজম দিয়ে আমার কি? আমার.কী লাভ গোলাম আজমের শাস্তি হলে? তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে আমি কোনও উৎসাহ পাই না। মায়ার আবার ঘৃণায় গা রি রি করে। নাম শুনলে বমি করে। মুক্তিযুদ্ধে আমার দুই জ্ঞাতি কাকা আর তিন মামাকে পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমি বুঝি না বাবাকে কেন বাঁচিয়ে দিয়েছিল ওরা। সম্ভবত স্বাধীনতার মজা ভোগ করতে। এখন ভোগ করছে না? বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে স্বাধীনতার রোদ পোহাচ্ছে না ডক্টর সুধাময় দত্ত?
মেঝোয় পা ছড়িয়ে বসেছে সুরঞ্জন। পুলকও বসে। ধুলো ভরা ঘর, ভাঙা চেয়ার। বইপত্র ছড়ানো। সারা ঘরে সিগারেটের ছাই। ঘরের কোণে একটি আলমারি, ভাঙা। সুরঞ্জনের যে মেজাজ, মদ খেয়ে খেয়ে বোধহয় ভেঙেছে সব। বাড়ি এত নিঝুম, আর কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
—একরাম হোসেন ভোলায় গিয়েছিল। ফিরে বলল ভোলার পুলিশ, প্রশাসন, বি এন পি-র লোক বলছে ভোলার ঘটনা নাকি বাবরি মসজিদ ভাঙার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, মানে স্পনটেনিয়াস ব্যাপার, এগুলো নাকি লুটেরাদের কাজ, আর কিছু নয়। হিন্দু উচ্ছেদ অভিযানের ফলে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। বাতাসে পোড়া গন্ধ শুধু। খড়ের গাদা, গোলাঘর কিছু বাদ যায়নি। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সব। ঘরের কাপড়চোপড়, জুতো, কাঁথা-বালিশ থেকে শুরু তেলের শিশি, এমন কি ঘরের ঝাড়ু পর্যন্ত লুট করে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বলিয়ে দিয়েছে। আগুনে পুড়ে গেছে ধানক্ষেত, নারকেলের বাগান, ছেলেদের পরনের লুঙ্গিও জোর করে খুলে নিয়েছে। মেয়েদের যাকে পেয়েছে ধর্ষণ করেছে, শাড়ি অলঙ্কার জোর করে খুলে নিয়েছে। ধানক্ষেতে লুকিয়ে ছিল হিন্দুল্লা। শম্ভুপুর খাসেরহাট স্কুলের টিচার নিকুঞ্জ দত্তকে ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় টাকার জন্য মারধোর করে। নিকুঞ্জ দত্ত সম্ভবত মারা যাকেন। ভোলায় শ্লোগান দিয়েছে, হিন্দু যদি বাঁচতে চাও, বাংলা ছেড়ে ভারত যাও। হিন্দুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে কবে যাবি, ‘কোিট গরুকে দিয়ে খাওয়াব। বিত্তবান হিন্দুদের অবস্থাও একই রকম। তাদেরও কিছু নেই, পুড়ে ছাই সব। তারা এখন নারকেলের মালায় জল খাচ্ছে, কলাপাতায় ভাত খাচ্ছে তাও সাহায্যের চাল। দিনে একবার শাকপাতা, কচুঘেঁচু রান্না করে খাচ্ছে। স্বামী সামনে স্ত্রী, বাবার সামনে মেয়েকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ করেছে। মা আর মেয়েয়েকে একই সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। অনেকে খোলাখুলি বলছে–ভিক্ষে করব, তবু এখানে আর না।’ সাহায্য নিয়ে যারা যাচ্ছে, তাদের কেউ কেউ মুখ ফুটেই বলে—’সাহায্য লাগবে না। আমাদের পার করে দিন, আমরা চলে যাই।’ শম্ভুপুর গোলপুরে হামলা করেছে এম এ বাছেত আর সিরাজ পাটোয়ারি, এরা আগে শিবিরের নেতা ছিল এখন বি এন পি করে। লর্ড হার্ডিঞ্জের একটি হিন্দু বাড়িও নাকি নেই যে পোড়া হয়নি। প্রিয়ালালবাবু ছিলেন ফ্রিডম ফাইটার। তাঁর বাড়িতেও অত্যাচার হয়। তাঁদের গ্রামে হামলা করেছে আওয়ামি লিগ নেতা আবদুল কাদের চেয়ারম্যান, বেলায়েত হোসেন। বাবুল দাসের তিনটি পাওয়ার টিলার পুড়ে গেছে। একরাম তাঁর ভবিষ্যৎ কি জানতে চাইলে নাকি কান্নায় ভেঙে পড়েন, বলেন, সময় পেলে চলে যাব। পুলক হয়ত বলতেই থাকত। সুরঞ্জন তাকে ধমকে থামায়। বলে—শাট আপ। আর একটিও কথা না। আর একটি কথা বল তো চাবকাবো তোমাকে।
পুলক প্রথম ঘাবড়ে যায় সুরঞ্জনের ধমকে। সে বুঝে পায় না সুরঞ্জন এমন অস্বাভাবিক আচরন করছে কেন। মদের ঝোঁকে? হতে পারে। দেবব্রতর দিকে তাকিয়ে সে শুকনো ঠোঁটে হাসে।
অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলে না। সুরঞ্জনের গ্লাস দ্রুত শেষ হতে থাকে। সে মদে অভ্যস্ত নয়। হঠাৎ হঠাৎ কারও বাড়ির আসরে পান করে। তাও অল্প। আজ তার ইচ্ছে করছে কয়েক বোতল এক ঢেকে খেয়ে ফেলতে। পুলককে থামিয়ে দেবার পর হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় পরিবেশ। স্তব্ধতার মধ্য থেকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে সুরঞ্জন। পুলকের কাঁধে মাথা রেখে চিৎকার করে কাঁদে। পুলিকের কাঁধ থেকে ওর মাথা গড়িয়ে মেঝেয় নামে। টিমটিমে আলো জ্বলছে ঘরে, মদের গন্ধ, আর বুক-ফাটা সুরঞ্জনের কান্না শুনে ঘরের হতবাক মানুষগুলো আরও কাঠ হয়ে থাকে আশঙ্কায়। পরনে ওর গত রাতের পরা শার্ট প্যান্ট, আর পাল্টানো হয়নি। স্নান নেই, খাওয়া নেই। ধুলোভরা শরীর। ওই ধুলোর শরীরে আরও ধূলোয় গড়াতে গড়াতে সুরঞ্জন বলে—মায়াকে ওরা কাল রাতে ধরে নিয়ে গেছে।
—কি বললে? চমকে ফেরে সুরঞ্জনের দিকে পুলক। একই সঙ্গে দেবব্রত, নয়ন, বিরূপাক্ষ।
রঞ্জনের গায়ে তখনও কান্নার দমক। মদ মদের মত পড়ে থাকে। গ্লাস উল্টে থাকে। না খাওয়া গ্লাসের মদগুলো গড়িয়ে পড়ে মেঝোয়। মায়া নেই–এই শব্দদ্বয়ের কাছে আর সব তুচ্ছ হয়ে যায়। কেউ কোনও কথা খুঁজে পায় না। এর তো এরকম কোনও সান্ত্বনা নেই যে অসুখ হয়েছে, ভেবো না সেরে যাবে।
ঘর যখন স্তব্ধতার জলে নিমজ্জিত তখন বেলাল ঢোকে। ঘরে। সে ঘরের পরিবেশটি লক্ষ করে। সুরঞ্জনের মেঝোয় পড়ে থাকা শরীরটি ছুঁয়ে বলে—সুরঞ্জন, মায়াকে নাকি ধরে নিয়া গেছে?
