৭খ.
সেরেব্রাল থ্রমবসিস বা এমবলিসম জাতীয় কিছু ঘটেছে সুধাময় অনুমান করেন। যদি হেমোরেজ হত নির্ঘাত মরে যেতেন। মরে গেলে খুব কি মন্দ হত? সুধাময় মনে-মনে বড় একটি হেমোরেজ। আশা করছেন। তিনি তো অর্ধেক মৃতই ছিলেন, নিজের বিনিময়ে যদি মায়া অন্তত বাঁচতে পারত। বড় বেঁচে থাকবার শখ ছিল মেয়েটির। একা একই পােরন্সলর বাড়ি চলে গিয়েছিল, তাঁর অসুস্থতাই তার অপহরণের জন্য দায়ী। অপরাধের ঘুণ প্ৰামায়কে কুরে খায়। বারবার তাঁর ঝাপসা হয়ে যায় চোখ। তিনি কিরণময়ীকে একক্স স্পর্শ করবার জন্য হাত বাড়ান। নেই, কেউ নেই। সুরঞ্জনও কাছে নেই, মায়া * তাঁর জল খেতে ইচ্ছে করে, শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে জিভ, আলজিভ, কণ্ঠদেশ।
কিরণময়ীকেও তিনি কম কষ্ট দেননি। পুজো করবার অভ্যোস ছিল কিরুণাময়ীর। বিয়ের পরই সুধাময় জানিয়ে দেন এ বাড়িতে পুজোটুজো চলবে না। কিরণময়ী গান গাইতে জানতেন ভাল, লোকে বলত বেহায়া বেশিরম মেয়ে, হিন্দু মেয়েদের লজ্জা-শরম নেই এই সব কটাক্ষ কিরণময়ীকে অস্বস্তিতে ফেলত। নিজেকে সংযত করতে করতে কিরকময়ী গান গাওয়া প্রায় ছেড়েই দিলেন। এই যে তিনি গান ছাড়লেন, সুধাময় আর কতটুকুছ তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়ত তিনিও এরকম ভাবতেন লোকে যখন মন্দ বলৱ তখন কী আর করা। একুশ বছর তিনি কিরণময়ীকে পাশে নিয়ে শুয়েছেন। কেন্ম শুয়েছেনই। কিরণময়ীর সতীত্বকে আগলে রেখেছেন। কি দরকার ছিল তাঁর স্ত্রীর সতী উপভোগ করবার? এও তো এক ধরনের পারভারশান। শাড়ি গয়নার দিকেও কিক্সমবায়ীর তেমন আকর্ষণ ছিল না। কখনও তিনি বলেননি ওই শাড়িটি চাই, বা একজাড়া ইয়ারিং দরকার। সুধাময় প্রায়ই বলতেন-কিরণময়ী, তুমি কি মনে কোনও কষ্ট লুকিয়ে রাখা?
কিরণময়ী বলতেন–না তো। আমার এই সংসারেই আমার স্বপ্ন সুখ সব। নিজের জন্য আমি আলাদা করে কোনও আনন্দ চাই না।
সুধাময়ের মেয়ের শখ ছিল। সুরঞ্জনের জন্মের আগে কিরণময়ীর পেটে স্টেথেসকোপ লাগিয়ে বলতেন—আমার মেয়ের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি কিরণময়ী। তুমি শুনবে?
সুধাময় বলতেন— বাপ মা’কে শেষ বয়সে মেয়েরাই দেখে। ছেলেরা বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। মেয়েরাই স্বামী সংসার ফেলে বাপ মায়ের যত্ন করে। আমি তো হাসপাতালে থাকি, দেখি। অসুস্থ বাপ মা’র শিয়রে বসে আছে মেয়েরা। ছেলে আছে, অতিথির মত দেখতে হয়ত আসে, এর বেশি না।
স্টেথোর নল কিরণময়ীর কানে লাগিয়ে তিনি তাঁকেও শোনাতেন হৃদপিণ্ডের লাবড়াব শব্দ। জগতসুদ্ধ সবাই পুত্ৰ চায়, আর সুধাময় চাইতেন কন্যা। ছোটবেলায় সুরঞ্জনকে ফ্রক পরিয়ে সুধাময় বেড়াতে নিতেন। মায়া জন্ম নেবার পর সুধাময়ের আশা পূরণ হল। ‘মায়া’ নামটি সুধাময় নিজেই রেখেছিলেন, বলেছিলেন—এ আমার মায়ের নাম। আমার এক মা গেছেন, আরেক মা এলেন।
রাতে মায়াই সুধাময়কে ওষুধ খাইয়ে দিত। ওষুধ খাবার সময় হয়ে গেছে। কখন। তিনি ‘মায়া মায়া’ বলে তাঁর প্রিয় কন্যাকে ডাকেন। পড়শিরা ঘুমিয়ে গেছে সব। তাঁর ডাকটি জেগে থাকা কিরণময়ী শোনেন, সুরঞ্জন শোনে, সাদা কালো বেড়ালটিও শোনে।
লজ্জা (০৮) অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলবার পর
৮ক.
উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলবার পর সারা ভারত জুড়ে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল তার মাত্রা কমে আসছে। ধীরে ধীরে। ভারতে মৃতের সংখ্যা এর মধ্যে আঠারশ ছাড়িয়ে গেছে। কানপুর ও ভূপালে এখনও সংঘর্ষ চলছে। প্রতিরোধ করতে গুজরাট, কণাটক, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, আসাম, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গের রাস্তায় সেনাবাহিনী নেমেছে। তারা টহল দিচ্ছে। ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলোর দরজায় তালা পড়েছে।
শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ঢাকায় সর্বদলীয় স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল হচ্ছে, তাতে কী। এদিকে শদ্ভূ-গোলকপুরের ত্ৰিশজন হিন্দু মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছে, চঞ্চলী, সন্ধ্যা, মণি..। মারা গেছে নিকুঞ্জ দত্ত। ভয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে এক বৃদ্ধা, ভগবতী। গোলকপুরে দিনের বেলায়ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মুসলমানের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মেয়েরাও ধর্ষিতা হয়েছে। দাসের হাট বাজারের নাটু হালদারের চৌদ্দশ মণ সুপারির আড়ত ছাই হয়ে গেছে। ভোলা শহরের মন্দির ভাঙচুরের সময় পুলিশ, ম্যাজিষ্ট্রেট, ডি সি নীরবে: দাঁড়িয়ে ছিল। জুয়েলারিগুলো প্রকাশ্যে লুট হয়েছে। হিন্দু ধােপাবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। মানিকগঞ্জ শহরের লক্ষ্মী মণ্ডপ, সার্বজনীন শিববাড়ি, দাশেরা, কালিখলা, স্বর্ণকার পট্টি, গদাধর পালের বেভারেজ ও সিগারেটের বড় মজুত দোকান ভাঙচুর করা হয়। তিন ট্রাক ভর্তি লোক ত্বরা, বানিয়াজুরি, পুকুরিয়া, উথলি, মহাদেবপুর, জোকা, শিবালয় থানায় হামলা চালায়। শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বেতিলা গ্রামে হিন্দুদের ঘর লুট করা হয়। পোড়ানো হয়। বেতিলার শত বছরের পুরনো নাটমন্দিরে হামলালানো হয়। গড়পাড়ায় জীবন সাহার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার তিনটে গোয়াল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কয়েকশ মণ ধানও পুড়ে গেছে। ঘিওর থানার তেরাষ্ট্ৰীবাজারের হিন্দুদের দোকান, গাণ্ডভুবি, বানিয়াজুরি, সেনপাড়ার হিন্দু বাড়িগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেনপাড়ায় এক হিন্দু গৃহবধূকেও ধর্ষণ করা হয়েছে। পিরোজপুরের কালীবাড়ি দেবার্চনা কমিটির কালী মন্দির, মনসা মন্দির, দুর্গা মন্দির, শীতল মন্দির শিব মন্দির, নারায়ণ মন্দির, পিরোজপুর মদনমোহন বিগ্রহের মন্দির, আখড়াবাড়ি, রায়েক্লাঠি কালীবাড়ির মন্দির, কৃষ্ণনগর রাইরাসরাজ সেবাশ্রম, ডুমুরতলা শ্ৰীশুরু সংঘের আশ্রম মন্দির, দক্ষিণ ডুমুরতলার সুরেশ সাহার বাড়ির কালী মন্দির, ডুমুরতলার নরেন সাহা বাড়ির মনসা মন্দির, রমেশ সাহার বাড়ির মনসা মন্দির ও বসতবাড়ি, ডুমুরতলা বারোর কালী মন্দির, সুচরণ মণ্ডল, গৌরাঙ্গ হালদার, হরেন্দ্রনাথ সাহা, নরেন্দ্রনাথ সাহার বাড়িল্লমন্দির, ডুমুরতলা হাই স্কুলের পাশে কালী মন্দির, রানীপুর পঞ্চদেবীর মন্দির, হুলারাহাট সার্বজনীন দুৰ্গ মন্দির ও কার্তিক দাসের কাঠের দোকান, কলাখালি সনাতন আশ্ৰৱল কালী মন্দির, জুজখোলা গৌরগোবিন্দ সেবাশ্রম, হরিসভার সনাতন ধর্মমন্দির, রনজিৎ শীলের বাড়ির কালী মন্দির, জুজখোলা বারোয়ারি পূজামণ্ডপ, গাবতলা স্কুলের পাশে সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, কৃষ্ণনগর বিপিন হালদারের বাড়ির মন্দির, নামাজপুর সার্বজনীন কালী মন্দির, কালিকাঠি বিশ্বাস বাড়ির মন্দির ও মঠ, লাইরি কালী মন্দির, স্বরূপঠি থানার ইন্দের হাট সার্বজনীন মন্দির, ইন্দের হাট কানাই বিশ্বাসের বাড়ির দুর্গ মন্দিরবানকুল সাহার সিনেমা হল, অমল গুহর বাড়ির দুর্গ মন্দির, হেমন্ত শীলের বাড়ির মন্দির, মঠবাড়িয়া থানার যাদব দাসের বাড়ির কালী মন্দির জ্বালানো হয়। সৈয়দপুর মিস্ত্রী পাড়ায় শিব মন্দিরও ভাঙা হয়। নড়াইল জেলার রতডাঙ্গা গ্রামে সাৰ্বজনীন মন্দির, বারোর ঘোনা সার্বজনীন মন্দির, কুডুলিয়ার সার্বজনীন শ্মশানঘাট, নিখিল চন্দ্ৰ দে’র পারিবারিক মন্দির, কালীপদ হাজরার পারিবারিক মন্দির, শিবুপ্রসাদ পালের পারিবারিক মন্দির, বাদন গ্রামের দুলাল চন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়ির মন্দির, কৃষ্ণচন্দ্র লস্করের বাড়ির মন্দির, তালতলা গ্রামের সার্বজনীন মন্দির, পঙ্কবিলা গ্রামের বৈদ্যনাথ সাহা, সুকুমার বিশ্বাস, পাগলা বিশ্বালে পারিবারিক মন্দির, পঙ্কবিলা গ্রামের সার্বজনীন মন্দির ও লোহাগড়া থানার দৌলতপুর পূর্বপাড়া নারায়ণ জিউ মন্দির ভেঙেচুরে তছনছ করা হয়। খুলনায় দশটি মন্দিল্লী ভেঙেছে। পাইকপাড়ার রাডুলি, সোবনাদাশ। আর বাকা গ্রামে চার-পাঁচটি মন্দির ভাঙচুহু কয়েকটি বাড়িতে লুটপাট করা হয়। রূপসা থানার তালিমপুর এলাকায় দুটো মন্দির-ভেঙে দেওয়া হয়। পাশের হিন্দু বাড়িগুলো লুট করা হয়। দীঘলিয়া আর সেন✉ট এলাকায় আটই ডিসেম্বর রাতে তিনটি মন্দির ভেঙে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেনীর সহদেবপুর গ্রামে একদল মিছিলকারী তেরোটি বাড়িতে হামলা চালায়। ছাগল-ইয়ার জয়পুর গ্রামে হামলা হওয়ায় বিশজন আহত হয়েছে। লাঙ্গলবোয়া গ্রাম থেকে মোয়াজেম হোসেনের নেতৃত্বে দুশ লোক গোবিন্দপ্ৰসাদ রায়ের বাড়িতে হামলা চালাম্বী কমল বিশ্বাস নামে একজন গুরুতর আহত হয়। সম্ভবত মারা যাবে।
