বিরূপাক্ষ, নয়ন, দেবব্রত, সুরঞ্জনের সামনে বসে গলগল করে ভাঙচুরের বমি করে। সুরঞ্জন চোখ বুজে শুয়ে থাকে। একটি কথাও সে এতগুলো ভাঙনের গল্প শুনবার পরও উচ্চারণ করে না। এরা কেউ জানে না কেবল ভোলা চট্টগ্রাম পিরোজপুর সিলেট কুমিল্লার হিন্দু বাড়ি লুট হয়নি, টিকাটুলির এই বাড়ি থেকে লুট হয়ে গেছে মায়া নামের একটি চমৎকার মেয়ে, মেয়েমানুষ তো অনেকটা সম্পদের মত, তাই সোনাদানা ধনসম্পদের মত মায়াকেও তুলে নিয়ে গেছে ওরা।
–কি ব্যাপার সুরঞ্জন কথা বলছি না কেন? হয়েছে কি তোমার? দেবব্রত প্রশ্ন করে।
–মদ খেতে চাই। পেট ভরে মদ খাওয়া যায় না আজ?
–মদ খাবে?
–হ্যাঁ খাব ৷
— টাকা আছে আমার পকেটে, কেউ গিয়ে এক বোতল হুইস্কি নিয়ে এস।
–বাড়িতে বসে খাবে? তোমার বাবা মা?
–গুল্লি মারো বাবা মা। আমি খেতে চাইছি, খাব। বিরূ যাও, সাকুরা পিয়সি কোনও একটাতে পাবে।
–কিন্তু সুরঞ্জনদা…
–এত হেসিটেট করো না তো, যাও।
ওঘর থেকে কিরণময়ীর কান্নার শব্দ ভেসে আসে।
–কাঁদে কে? মাসিমা? বিরূপাক্ষ জিজ্ঞেস করে।
–হিন্দু হয়েছে যখন, না কেঁদে উপায় আছে?
চুপ হয়ে যায় তিন যুবক। হিন্দু তো ওরাও, ওরাও অনুভব করে মাসিমাকে কাঁদতে হয় কেন। প্রত্যেকের বুকের মধ্য থেকে বোবা কান্না ঠেলে ওঠে। বিরূপাক্ষ টাকা নিয়ে দ্রুত চলে যায়, ফেন চলে গেলেই সে সকল বেদনা থেকে মুক্তি পাবে। যেমন সুরঞ্জন মুক্তি পেতে চাইছে মদ খেয়ে।
বিরূপাক্ষ চলে যেতেই সুরঞ্জন প্রশ্ন করে–আচ্ছা দেবব্রত, মসজিদ পোড়ানো যায় না?
–মসজিদ? তোমার কি মাথা-ট্যাথা খারাপ হয়ে গেছে?
—চল আজ রাতে ‘তারা মসজিদ’ পুড়িয়ে ফেলি। দেবব্রত বিস্মিত চোখে একবার সুরঞ্জনের দিকে, একবার নয়নের দিকে তাকায়।
—আমরা দু কোটি হিন্দু আছি, চাইলে বায়তুল মোকাররমটাকেও তো পুড়িয়ে ফেলতে পারি।
—তুমি তো কখনও নিজেকে হিন্দু বলনি। আজ বলছ কেন?
–মানুষ বলতাম তো, মানবতাবাদী বলতাম। আমাকে মুসলমানেরা মানুষ থাকতে দেয়নি। হিন্দু বানিয়েছে।
–তুমি খুব বদলে যােচ্ছ সুরঞ্জন।
–সে আমার দোষ নয়।
–মসজিদ ভেঙে আমাদের কি লাভ? আমরা কি আর মন্দির ফিরে পাব? দেবব্রত চেয়ারের ভাঙা হাতলে নখ ঘষতে ঘষতে বলে।
–না পাই, তবু আমরাও যে ভাঙতে পারি। আমাদেরও যে রাগ আছে তা একবার জানানো উচিত নয়? বাবরি মসজিদ সাঁড়ে চারশ বছরের পুরনো মসজিদ ছিল। চৈতন্যদেবের বাড়িও তো পাঁচশ বছরের পুরনো ছিল। চার-পাঁচশ বছরের পুরনো ঐতিহ্য কি এ দেশে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না? আমার সোবহানবাগ মসজিদটাও ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে। গুলশান এক নম্বরের মসজিদটা সৌদি আরবের টাকায় করা। চল ওটা দখল করে মন্দির বানিয়ে ফেলি।
–কী বলছি তুমি সুরঞ্জন? পাগলই হয়েছ বটে। তুমি না। আগে বলতে ‘মন্দির ও মসজিদের জায়গায় দিঘি কেটে নধর পতিহাঁস ছেড়ে দেব?
–কেবল কি তাই বলতাম, বলতাম, গুঁড়ো হয়ে যাক ধর্মের দালানকোঠা, পুড়ে যাক অন্ধাগুনে মন্দির মসজিদ গুরুদয়ারা গির্জার ইট, আর সেই ধ্বংসস্তুপের ওপর সুগন্ধ ছড়িয়ে বড় হোক মনোলোভা ফুলের বাগান, বড় হোক শিশুর ইস্কুল, পাঠাগার। মানুষের কল্যাণের জন্য এখন প্রার্থনালয় হোক হাসপাতাল, এতিমখানা, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। এখন প্রার্থনালয় হোক শিল্পকলা একাডেমি, কলামন্দির, বিজ্ঞান গবেষণাগার, এখন প্রার্থনালয় হোক ভোরের কিরণময় সোনালি ধানের ক্ষেত, খোলা মাঠ, নদী, উতল সমুদ্র। ধর্মের অপর নাম আজ থেকে মনুষ্যত্ব হোক।
–সেদিন দেবেশ রায়ের একটি লেখা পড়লাম। লিখেছেন বড়ে গোলাম তাঁর সুরমণ্ডল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নেচে নেচে গাইছেন, হরি ওম তৎসৎ, হরি ওম তৎসৎ। আজও বড়ে গোলাম সেই একই গান গেয়ে চলেছেন। কিন্তু যারা বাবরি মসজিদকে ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সেখানে রামলালার মূর্তি বসিয়ে পালিয়ে আসে, সেই হিন্দু এ গান শুনতে পায় না। এ গান আদভানি, অশোক সিঙ্ঘলরা শুনতে পায় না। এ গান রাস্ট্রীয় সেবক সংঘ বা বজরং দল শুনতে পায় না। বড়ে গোলাম আলি মুসলমান ছিলো। অথচ তাঁর গলায় এই হরি ওম তৎসৎ সেইসব মুসলমানরাও শুনতে পায় না। স্বামীনে করে মসজিদ ধ্বংসের একমাত্র প্রতিবিধান হতে পারে মন্দির ধ্বংস করে।
—সুতরাং বলতে চাইছ মন্দির ধ্বংসের কারণে মন্দির ধ্বংস করা ঠিক নয়। তুমি আমার বাবার মত আদর্শবাদের কথা বলছি। আই হেট হিম। আই হেট দ্যাট ওলন্ড হেগার।
সুরঞ্জন উত্তেজিত হয়ে শোয়া থেকে একলাফে উঠে দাঁড়ায়।
–শান্ত হও সুরঞ্জন। শান্ত হও। তুমি যা বলছ এগুলো কোনও সমাধান নয়।
–আমি এভাবেই সমাধান চাই। আমার হাতেও আমি রামদা কিরিচ পিস্তল চাই। মোটামোটা লাঠি চাই। ওরা পুরনো ঢাকার এক মন্দিরে পেচ্ছাব করে এসেছিল না? আমি পেচ্ছাব করতে চাই ওদের মসজিদে।
–ওহ সুরঞ্জন। তুমি কম্যুনাল হয়ে যাচ্ছ।
— হ্যাঁ আমি কম্যুনাল হচ্ছি। কম্যুনাল হচ্ছি। কম্যুনাল হচ্ছি।
সুব্ৰত সুরঞ্জনের পার্টির ছেলে। নানা কাজে একসঙ্গে থেকেছে দুজন। সে অবাক হয় রঞ্জনের আচরণে। মদ খেতে চাইছে। নিজের মুখে বলছে কম্যুনাল হচ্ছে। বাবাকে পর্যন্ত গাল দিচ্ছে।
৮খ.
‘দাঙ্গা তো বন্যা নয় যে, জল থেকে তুলে আনলেই বিপদ কাটল, তারপর চিড়েমুড়ি গাড় করতে পারলেই আপাতত ঝামেলা মিটল। দাঙ্গা তো আগুন লাগা নয় যে, জল ঢলে নিভিয়ে দিলেই পরিত্রাণ জুটবে। দাঙ্গায় মানুষ তার মনুষ্যত্ব স্থগিত রাখে। দাসী মানুষের মনের বিষ বেরিয়ে আসে। দাঙ্গা কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, কোনও দুৰ্ঘটনা নয়। দাঙ্গা মনুষ্যত্বের বিকার।’ সুধাময় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কিরণময়ী ঘরের কোণে তাঁর ভগবানের কাছে কপাল ঠুকে রাখেন। মাটির ঠাকুরটি নেই। ভেঙে ফেলেছে সেদিন। রাধাকৃষ্ণের একটি ছবি ছিল কোথাও। সেটি সামনে নিয়ে কপাল ঠোঁকেন কিরণময়ী। নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেন। সুধাময় তাঁর চলৎশক্তিহীন শরীর নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাকেন। রাধা বা কৃষ্ণের কি কোনও ক্ষমতা আছে মায়াকে ফিরিয়ে দেবার! এই যে ছবি, এ তো কেবল ছবি। কেবল গল্প। এরা কি করে মায়াকে কঠোর কঠিন নিষ্ঠুর মৌলবাদের কবল থেকে উদ্ধার করবে? এই দেশের নাগরিক হয়েও, ভাষা আন্দোলন করেও, যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের খেদিয়ে দেশ স্বাধীন করেও এই দেশে তাঁর নিরাপত্তা জোটে না। আর কোথাকার কোন রাধা কৃষ্ণ তাঁকে বলা নেই কওয়া নেই নিরাপত্তা দেবে! এদের আর খেয়ে-দোয়ে কাজ নেই। জন্ম থেকে চেনা পড়শিই তোমার বাড়ি দখল করে নিচ্ছে, তোমার পাশের বাড়ির দেশি ভাইয়েরা তোমার মেয়েকে অপহরণ করে নিচ্ছে। আর সেখানে তোমার দুৰ্গতি দূর করতে ননীচোর আসবে! আয়ান ঘোষের স্ত্রী আসবে! দুৰ্গতি যদি দূর করতে হয় সবাই মিলে এক জাতি হবার জন্য যারা যুদ্ধ করেছিল, তারাই করবে।
