সুরঞ্জনের বিশ্বাস হয় না মায়া পাশের ঘরে নেই, যেন সে এক্ষুণি ওঘরে গেলেই দেখতে পাৰে মায়া সুধাময়ের ডান হাতটির ব্যায়াম করিয়ে দিচ্ছে। যেন ওঘরে গেলেই শ্যামলা মেয়েটির মুখে দাদা কিছু একটা করা-র আকুলতা ফুটে উঠবে। মেয়েটার জন্য কিছুই করা হয়নি। থাকে না দাদার কাছে আবদার, বেড়াতে নাও, ওটা কিনে দাও, এটা দাও। আবদার তো করেই ছিল মায়া, সুরঞ্জন রাখেনি, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে৷ দিনরাত। বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, পার্টি-কে মায়া, কে কিরণময়ী, কে সুধাময়, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনে তার দরকার কী! সে এই দেশকে মানুষ বানাতে চেয়েছিল, সুরঞ্জনের সাধের দেশটি কি মানুষ হয়েছে আদৌ?
নটা বাজলেই হায়দারের বাড়ি ছোটে সুরঞ্জন। কাছেই বাড়ি।–তখনও ঘুমোচ্ছে হায়দার। বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে সে। অপেক্ষা করতে করতে তার সন্দেহ হয়, ওদের সাতজনের একজনের নাম ছিল রফিক, ছেলেটিকে বোধহয় চেনে হায়দার। এমনও হতে পারে রফিক তার আত্মীয় হয়। গা শিউরে ওঠে সুরঞ্জনের। দুঘণ্টা পর ঘুম ভাঙে হায়দারের। সুরঞ্জনকে বসে থাকা দেখে সে জিজ্ঞেস করে–ফিরেছে?
—ফিরলে কি আর এসেছি তোমার কাছে?
—ও। হায়দারের কণ্ঠে নির্লিপ্তি। সে লুঙ্গি পরা, খালি গা, গা দু হাতে চুলকোয়। বলে–এবার শীত পড়েনি তেমন, তাই না? আজও সভানেত্রীর বাড়িতে মিটিং আছে। সম্ভবত মিছিল করার প্রস্তুতি চলবে। গোলাম আজমের ব্যাপারটা যখন তুঙ্গে, তখনই শাল দাঙ্গা বাঁধল। আসলে এগুলো হচ্ছে বি এন পি-র চাল, বুঝলে! ইস্যুটািকে ঘুরিয়ে দেওয়াই তাদের ইচ্ছে।
—আচ্ছা হায়দার, রফিক নামের কোনও ছেলেকে চোন? ওদের মধ্যে রফিক নামের একটি ছেলে ছিল।
—কোন পাড়ার?
—জানি না। বয়স একুশ বাইশ হবে। এ পাড়ারও হতে পারে।
—এরকম কাউকে চিনি না তো! তবু লোক লাগাচ্ছি।
—চল বেরোই। দেরি করাটা তো ঠিক হচ্ছে না। মা বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। বাবার স্ট্রোক হয়েছে, এই টেনশনে আবার না বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
—এ সময় আমার সঙ্গে ঘোরাটা তোমার ঠিক হবে না।
—কেন, ঠিক হবে না কেন?
–বুঝতে পারছি না কেন। বোঝার চেষ্টা কর।
সুরঞ্জন বুঝবে না কেন, ঠিকই বুঝতে পারছে হায়দার কেন বলছে তার না থাকবার কথা। তার সঙ্গে থাকাটা এখন ঠিক হবে না। কারণ সুরঞ্জন হিন্দু, হিন্দু হয়ে মুসলমানদের গাল দেওয়া ঠিক ভাল ঠেকে না। সেই মুসলমান চোর হোক, কী বদমাশ হোক, কী খুনি হোক। মুসলমানের কবজ থেকে হিন্দু মেয়েকে ছিনিয়ে আনাটাও বোধহও বেশি ঔদ্ধত্য দেখানো হয়ে যায়।
সুরঞ্জন ফিরে আসে। কোথায় ফিরবে। সে? বাড়িতে? ওই খাঁ খাঁ করা বাড়িতে তার ফিরতে ইচ্ছে করে না। সুরঞ্জন মায়াকে ফিরিয়ে আনবে এই আশায় চাতক পাখির মত তৃষ্ণা নিয়ে বসে আছেন ওঁরা। মায়াকে ছাড়া বাড়ি ফিরতে তার ইচ্ছে করে না। হায়দার নাকি লোক লাগিয়েছে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে ওর লোকেরা মায়াকে একদিন উদ্ধার করবে, আবার সংশয় দানা বাঁধে, মায়া নেই তাতে ওদের কী, ওদের তো আর মায়ার জন্য কানও মায়া নেই। হিন্দুদের জন্য মুসলমানের মায়া থাকবে কেন, মায়া থাকলে আজ পাশের মুসলমান বাড়ি তো লুট হয় না, ওদের বাড়ি ভাঙা হয় না, ভাঙা হয় কেবল রঞ্জনের বাড়ি, পোড়ানো হয় গোপাল হালদারের বাড়ি, কাজলেন্দু দে’র বাড়ি। সুরঞ্জন বাড়ি ফেরে না। পথে পথে ঘোরে। সারা শহর ঘুরে মায়াকে খোঁজে। কী অপরাধ ছিল মায়ার যে ওকে ওরা জোর করে ধরে নিয়ে যাবে? হিন্দু হবার অপরাধ এত বেশি? এত বশি যে তার বাড়িঘর ভাঙা যায়, তাকে ইচ্ছেমত পেটানো যায়, তাকে ধরে নেওয়া যায়, তাকে ধর্ষণ করা যায়। সুরঞ্জন এদিক ওদিক হাঁটে, দৌড়োয়। রাস্তায় একুশ বাইশ বছরের যে কোনও ছেলেকে দেখেই মনে হয় এই ছেলেই বোধহয় মায়াকে নিয়েছে, তার ভতর সংশয় জমা হয়। হতেই থাকে।
ইসলামপুরের এক মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে সে এক ঠোঙা মুড়ি কেনে। দোকানচঅলা তার দিকে আড়ে আড়ে তাকায়, সুরঞ্জনের মনে হয় এই লোকটিও বোধহয় জানে যে তার বোন অপহৃত। সে এলোমেলো হাঁটে, নয়াবাজারের ভাঙা মঠের ওপর বসে থাকে। কিছুক্ষে স্বস্তি পায় না। সুরঞ্জন। কারও বাড়িতে গেলে সেই বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গ। সেদিন তো সেলিম বলেই বসল, তোরা আমাদের মসজিদ ভাঙতে পারিস, আমরা মন্দির ভাঙলে ক্ষতি কী? সেলিম অবশ্য হাসতে হাসতে বলছিল, হেসেছে বলে সেলিমের মনে যে এই প্রশ্নটি কাজ করেনি তা নয়।
মায়া যদি এর মধ্যে বাড়ি ফেরে, ফিরতেও তো পারে। ধর্ষিতা হয়েও সে ফিরে আসুন তবু ফিরে তো আসুক। মায়া ফিরেছে, ফিরেছে এই ভাবনায় সুরঞ্জন বাড়ি ফেরে, দেখে দুটো মানুষ চোখ কান নাক সজাগ রেখে বসে আছে নিম্পন্দ নিথর, মায়ার অপেক্ষায়। মায়া যে ফেরেনি। এর চেয়ে নিষ্ঠুর নির্মম ভয়ঙ্কর সংবাদ আর কী আছে! বালিশে মুখ ডুবিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে সুরঞ্জন। ওঘর থেকে সুধাময়ের গোঙানোর শব্দ আসে। রাতের স্তব্ধতা ফুঁড়ে বিঝির ডাকের মত ভেসে আসা কিরণময়ীর মিহি কান্না সুরঞ্জনকে একফোঁটা ঘুমোতে দেয় না। তার চেয়ে যদি বিষ পাওয়া যেত, তিনজনই খেয়ে মরে যেতে পারত। কষ্টগুলো এভাবে ফালি ফালি কাটত না তাদের। কী দরকার বেঁচে থেকে? হিন্দু হয়ে এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকবার কোনও অর্থ হয় না।
