—সুপারস্টারে চল কিছু খেয়ে নিই। ক্ষিধে পেয়েছে।
পরোটা মাংসের অডার দেয় হায়দার। দু প্লেট। সুরঞ্জন খেতে চায়, পরোটার টুকরো তার হাতেই রয়ে যায়, মুখে ওঠে না। যত সময় যায়, বুকের মধ্যটা খালি হয় তত। হায়দার গোগ্রাসে খায়। খেয়ে সিগারেট ধরায়। সুরঞ্জন তাড়া দেয়। —চল উঠি, এখনও তো পাওয়া যাচ্ছে না।
–আর কোথায় খুঁজিব, বল। বাকি তো রাখিনি কোনও জায়গা। নিজের চোখেই তো দেখলে!
–ঢাকা একটা ছোট্ট শহর। এখানে মায়াকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, কথা হল? থানায় চল।
থানায় ঘটনাটি জানালে পুলিশের লোক ভাবলেশহীন মুখে ডায়রি করুবার খাতা টেনে নাম-ধাম লিখে রাখে। ব্যস। থানা থেকে বেরিয়ে সুরঞ্জন বলে-ওরা কোনও কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে না।
—করতেও পারে।
–ওয়ারির দিকটা চল যাই। ওখানে চেনা কেউ আছে-তোমার?
–আমি পাটির ছেলেদের লাগিয়ে দিয়েছি। ওরাও খুঁজবে। তুমি ভেব না তো।
হায়দার চেষ্টা করছে, তবু দুশ্চিন্তার বোলতা সুরঞ্জনের সারা শরীর কামড়ায়। সারারাত হায়দারের হোন্ডটি পুরনো শহরে ঘোরে। মস্তানদের মদের আড্ডা, জুয়োর আড্ডা, স্মাগলারদের ঘুপচি ঘর খুঁজতে খুঁজতে একসময় আজান পড়ে। আজানের সুরটি সুরঞ্জনের ভালই লাগত, ভৈরবী রাগে গাওয়া। এটি আজ বড় বিচ্ছিরি লাগে তার। আজান হচ্ছে, তার মানে রাত শেষ হয়ে এল, মায়াকে পাওয়া হল না!! টিকাটুলিতে এসে হোল্ডা থামায় হায়দার। বলে—সুরঞ্জন, মন খারাপ করো না। কাল দেখি কী করা যায়।
লণ্ডভণ্ড ঘরে বসে কিরণময়ী ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে ছিলেন দরজার দিকে, সুরঞ্জন মায়াকে নিয়ে ফিরবে। এই আশায় সুধাময়ও তাঁর চেতনাহীন অঙ্গ নিয়ে নিদ্রাহীন উদ্বিগ্ন সময় পার করছিলেন। ওঁরা দেখেন ছেলে খালি হাতে ফিরেছে। মায়া নেই। ক্লান্ত, ব্যর্থ নতমুখ, বিষন্ন সুরঞ্জনকে দেখে দুজনই বাকরুদ্ধ হন। তবে কি মায়াকে আর পাওয়া যাবে না? দুজনই ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন। বাড়ির দরজা জানোলা সব বন্ধ, কোনও ঘরে ভেন্টিলেটর নেই। হাওয়া আটকে আছে। ঘরে। ভ্যাপসা গন্ধ বেরোচ্ছে। হাত পা মাথা গুটিয়ে বসে আছেন ওঁরা। কেমন ভূতের মত দেখতে লাগে ওঁদের, সুরঞ্জনের ইচ্ছে করে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে। ওঁদের দু চোখে একগাদা প্রশ্ন। সব প্রশ্নের তো উত্তর একটিই, মায়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মেঝোয় পা ছড়িয়ে বসে পড়ে সুরঞ্জন। তার বমি বমি লাগে। এতক্ষণে মায়ার ওপর সম্ভবত গণধর্ষণও সারা। আচ্ছ এরকম কি হতে পারে না, ছ। বছরের মায়া যেমন দু দিন পর ফিরে এসেছিল, সেরকম এবারও ফিরে এল! সুরঞ্জন দরজা খুলেই রেখেছে, মায়া ফিরে আসবে, ফিরে আসুক মায়া, ছোটবেলার মত উদাসীন পায়ে হেঁটে ফিরে আসুক। এই ছোট্ট, বিধ্বস্ত, সর্বস্বাস্ত সংসারে ও ফিরে আসুক। হায়দার কথা দিয়েছে মায়াকে খুঁজবে আরও। কথা যখন দিয়েছে, সুরঞ্জন কি এই স্বপ্ন দেখতে পারে যে মায়া ফিরবে! মায়াকে কেন ধরে নিয়ে গেল ওরা? মায়া হিন্দু বলে? আর কত ধর্ষণ, কত রক্ত, কত ধনসম্পদের বিনিময়ে হিন্দুদের বেঁচে থাকতে হবে এই দেশে? কচ্ছপের মত মাথা গুটিয়ে রেখে! কতদিন? সুরঞ্জন নিজের কাছে উত্তর চায়। পায় না।
কিরণময়ী বসেছিলেন ঘরের এক কোণে, দেওয়ালে পিঠ রেখে, কারও জন্য নয়, নিজেকে শুনিয়ে তিনি বলেন–ওরা বলল, মাসিমা, আপনাদের দেখতে এসেছি কেমন আছেন। আমরা পাড়ারই ছেলে। দরজাটা খুলুন। ওদের বয়স আর কত, কুড়ি একুশ, বাইশ এরকম। আমি কি ওদের সঙ্গে পারি শক্তিতে? পাড়ার বাড়িগুলোয় গিয়ে কেঁদে পড়লাম, সবাই শুনল শুধু। চুক চুক করে দুঃখ করল, কেউ কোনও সাহায্য করল না। ওদের একজনের নাম রফিক, টুপিঅলা একটা ছেলেকে ডাকতে শুনলাম। পারুলের বাড়ি লুকিয়ে ছিল। ক’দিন। ওখানে থাকলে বেঁচে যেত। মায়া কি ফেরত আসবে না? তার চেয়ে বাড়িটা পুড়িয়ে দিত। নাকি বাড়িঅলা মুসলমান বলে পোড়ায়নি। তার চেয়ে মেরে যেত, আমাকেই মেরে যেত। তবু নিরপরাধ মেয়েটিকে রেখে যেত। জীবন তো শেষই ছিল আমার, ওর তো ছিল শুরু।
প্রচণ্ড ঘুরে ওঠে মাথা সুরঞ্জনের। সে গলগল করে বমি করে কলঘর ভাসিয়ে ফেলে।
» লজ্জা (০৭) রোদ পড়েছে বারান্দায়
৭ক.
রোদ পড়েছে বারান্দায়। কালো সাদা বেড়ালটি এদিক ওদিক হাঁটছে। ও কি কাঁটা খুঁজছে, নাকি মায়াকে খুঁজছে। মায়া ওকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত, মায়ার লেপের তলে ও গুটিসুটি ঘুমিয়ে থাকত। ও কি জানে মায়া নেই?
মায়া নিশ্চয় খুব কাঁদছে। ‘দাদা দাদা’ বলেও হয়ত ডাকছে। মায়ার কি হাত পা বেঁধে নিয়েছে ওরা? মুখে কাপড় খুঁজে? ছ’ বছর আর একুশ বছর এক নয়। দু বয়সের মেয়েকে ধরে নেবার উদ্দেশ্যও এক নয়। সুরঞ্জন অনুমান করতে পারে একুশ বছর বয়সের একটি মেয়েকে নিয়ে সাতজন পুরুষ কি করতে পারে। তার সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে ওঠে ক্ষোভে, যন্ত্রণায়। মরে গেলে যেমন কাঠ হয়ে পড়ে থাকে শরীর, অনেকটা সেরকম। সুরঞ্জন কি বেঁচে আছে? বেঁচে তো আছেই। মায়া নেই। মায়া নেই বলে মায়ার আত্মীয়রা বেঁচে থাকবে না? জীবনের ভাগ কেউ কাউকে দেয় না। মানুষের মত স্বার্থপর প্রাণী জগতে আর নেই।
হায়দার খুঁজেছে ঠিকই। তবু সুরঞ্জনের মনে হয়, হায়দার যেন ঠিক মন দিয়ে খোঁজেনি! সুরঞ্জন মুসলমান দিয়ে মুসলমানদের খুঁজিয়েছে, কাঁটা দিয়ে যেমন কাঁটা তুলতে হয়, তেমন। শুয়ে শুয়ে উঠোনের রোদে শোয়া বেড়ালটি দেখতে দেখতে সুরঞ্জনের হঠাৎ সন্দেহ হয়, হায়দার আসলে জানে মায়াকে কারা নিয়ে গেছে। ও যখন সুপারস্টারে খাচ্ছিল, হাপুস হুপুস করে, ওর মুখে কোনও দুশ্চিস্তার ভাঁজ ছিল না। বরং খাবার পর বেশী তৃপ্তির ঢেকুর ছিল, সিগারেটের ধোঁয়াও যখন ছাড়ল, এত আয়েশ ছিল ওর ধোঁয়া ছাড়ায়, মনে হয়নি ও কাউকে খুঁজতে বেরিয়েছে, এবং খুঁজে পাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। গুর আবার রাতভর নিশাচরের মত শহর ঘুরুবার শখ আছে। ও কি শখ মেটালো। তবে? মায়াকে ফিরে পাবার সত্যিকার কোনও উৎসাহ ছিল না? যেটুকু ছিল তা যেন তেন করে বাঞ্ছাস্ট্রের দায় শোধ। থানার লোককেও তেমন জোর দিয়ে বলেনি, পাটির যে ছেলেদের সঙ্গে সে কথা বলেছে, আগে পার্টির কথা সেরে পরে বলেছে, যেন মায়ার বিষয়টি জরুরি কুতুব এক নম্বরে নয়, দুই নম্বরে। হিন্দুৱা দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তাই বলেই কি?
