সুরঞ্জন বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে অবাক হয়। দরজা হাট করে খোলা! জিনিসপত্র সব তছনছ, টেবিল উল্টে পড়ে আছে, বইপত্র মেঝোয় গড়াচ্ছে। বিছানার তোষক চাদর বিছানায় নেই। আলনা ভেঙে পড়ে আছে, কাপড়চোপড় ছড়িয়ে আছে। সারা ঘরে। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ঢোকে। মেঝে ভর্তি ভাঙা কাচের টুকরো, চেয়ারের ভাঙা হাতল, ছেড়া বই, ওষুধের শিশি। সুখময় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন ঘরের মেঝোয়। কাতরাচ্ছেন। মায়া, কিরণময়ী কেউ নেই। সুরঞ্জনের জিজ্ঞেস করতে ভয় হয় বাড়িতে কী হয়েছে’। সুধাময় নীচে পড়ে আছেন কেন? ওরাই বা কোথায়? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে সুরঞ্জন ট্রের পায় তার গলা কাঁপছে। সে হতভম্ব দাঁড়িয়ে থাকে।
সুধাময় ধীরে, বেদনায় উচ্চারণ করেন-মায়াকে ধরে নিয়ে গেছে।
সুরঞ্জন আমূল কেঁপে ওঠে–ধরে নিয়ে গেছে? কারা নিয়েছে, কোথায়? কখন?
সুধাময় পড়ে আছেন, না পারছেন নড়তে, না পারছেন কাউকে ডাকতে। সুরঞ্জন আলগোছে সুধাময়কে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেয়। দ্রুত শ্বাস ফেলছেন তিনি, কুলকুল ঘামছেন।
—ম কোথায়? সুরঞ্জন অক্ষুট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
সুধাময়ের নীল হয়ে গেছে মুখ শঙ্কায়, হতাশায়। সারা শরীর কাঁপছে তাঁর। প্রেসার বাড়লে যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সে এখন সুধাময়কে দেখবে, নাকি মায়াকে খুজতে যাবে। কিছুই স্থির করতে পারে না। সুরঞ্জন। তারও গা হাত পা কাঁপে। তার মাথার ভেতর পাক খায় ক্রুদ্ধ অস্থির জল। পাক খায় একপাল হিংস্ৰ কুকুরের মুখে পড়া একটি আদুরে বেড়ালী ছানার মায়াময় মুখ। সুরঞ্জন দ্রুত বেরিয়ে যায়। সুধাময়ের অচল হাতটি ছুঁয়ে বলে যায়–মায়াকে যে করেই হোক নিয়ে আসব বাবা।
হায়দারের বাড়ির দরজা জোরে ধাক্কায় সুরঞ্জন। এত জোরে যে হায়দার নিজে দরজা খোলে।
সুরঞ্জনকে দেখে চমকে ওঠে। বলে–কী খবর সুরঞ্জন? হয়েছে কি তোমার?
সুরঞ্জন প্রথম কিছু বলতে পারে না। গলার কাছে আটকে থাকে দালা-পাকানো কষ্ট। –মায়াকে ধরে নিয়ে গেছে। কলবার সময় কণ্ঠ বুজে আসে সুরঞ্জনের। তার আর বোঝাতে হয় না। মায়াকে কারা ধরে নিয়ে গেছে।
–কখন নিয়েছে?
সুরঞ্জন উত্তরে কিছু বলে না, কখন নিয়েছে এই খবরটির চেয়ে মায়াকে যে নিয়ে গেছে, এটিই কি জরুরি নয়? হায়দারের কপালে ভাঁজ পড়ে ভাবনার। দলের মিটিং ছিল, মিটিং সেরে সে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে। এখনও কাপড় পাল্টানো হয়নি। শার্টের বোতাম খুলছে কেবল। সুরঞ্জন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হায়দারের দিকে। বানে সৰ ভেসে গেলে যেমন দেখতে হয় মুখ, তাকে ঠিক লাগছে তেমন। সূরঞ্জন দাঁড়িয়েছিল। দরজা ধরে, যে হাতে দরজা ধরা সে হাতটি কাঁপছে তার। কপিন থামাবার জন্য সে মুঠি করে ধরে হাতটি। হায়দার তার কাঁধে হাত রেখে বলে-শান্তু হয়ে ঘরে বস, দেখি কি করা যায়।
কাঁধে হাত পড়তেই ডুকরে কেঁদে ওঠে সুরঞ্জন। হায়দারকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলে–মায়াকে এনে দাও হায়দার। মায়াকে দাও।
সুরঞ্জন কাঁদতে কাঁদতে নত হয়। নত হতে হতে সে হায়দারের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। হায়দার অবাক হয়। এই লোহার মত শক্ত ছেলেটিকে কখনও সে কাঁদতে দেখেনি। তুলে তাকে দাঁড় করায় সে। হায়দার তখনও রাতের খাবার খায়নি, ক্ষিদে পেটে। তবু চল দেখি বলে বেরিয়ে যায়। হোন্ডার পেছনে সুরঞ্জনকে বসিয়ে টিকাটুলির অলিগিলিতে খোঁজে। সুরঞ্জন চেনে না। এমন সব ঘরে ঢেকে। টিমটিম করে বাতি জ্বলছে এমন কিছু পান বিড়ির দোকানঅলার সঙ্গেও ফিসফিস করে কথা বলে। টিকাটুলি পার করে ইংলিশ রোড, নবাবপুর, লক্ষ্মীবাজার, লালমোহন সাহা স্ট্রিট, বকশি বাজার, লালবোগ, সূত্রপুর, ওয়াইজ ঘাট, সদরঘাট, প্যারীমোহন দাস রোড, অভয় দাস লেন, নারিন্দা, আলু বাজার, ঠাঁটারি বাজার, প্যারীদাস রোড, বাবুবাজার, উর্দু রোড, চক বাজারে বোঁ বোঁ করে ঘুরুল হায়দারের হোন্ডা। এঁদো গলির ভেতর কাদাজলে হাঁটু ডুবিয়ে গিয়ে এক-একটি অস্বীকার বাড়ির কড়া নেড়ে হায়দার কাকে যে খোঁজে, সুরঞ্জন বুঝে পায় না কিছু। হায়দার এক-এক জায়গায় নামে আর সে ভাবে এখানেই বুঝি আছে মায়া। মায়াকে বোধহয় এখানেই হাত পা বেঁধে ওরা পেটাচ্ছে, কেবল কি পেটাচ্ছেই নাকি আরও কিছু করছে। সুরঞ্জন কান পেতে থাকে মায়ার কান্নার শব্দ কোথাও থেকে ভেসে আসে কি না।
লক্ষ্মী বাজারের কাছে একটি কান্নার শব্দ শুনে সুরঞ্জন হোল্ডা থামাতে বলে। বলে–শোন তো, মায়ার কান্না মনে হচ্ছে না?
কান্নাটির পেছন পেছন যায়। তারা দেখে টিনের একটি দোচালা বাড়িতে বাচ্চা কাঁদছে। বিলি কেটে কেটে খোঁজে হায়দার। রাত গভীর হতে থাকে। সুরঞ্জন থামে না। গলিতে গলিতে দিলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লাল চোখের ছেলেরা, দেখে সুরঞ্জনের মনে হয়, বুঝি। এরাই নিয়েছে, এরাই বুঝি তার নিরীহ মায়া মায়া মুখের বোনটিকে আটকে রেখেছে।
—হায়দার, পাচ্ছ না কেন? এখনও পাচ্ছ না কেন মায়াকে?
–আমি তো চেষ্টা করছিই।
—যে করেই হোক মায়াকে আজ রাতের মধ্যেই পেতে হবে।
—এমন কোনও মস্তান ছেলে নেই যাকে খুঁজছি না। না পেলে কি করব বল। সুরঞ্জন একটির পর একটি সিগারেট ধরায়। মায়ার টাকায় কেনা সিগারেট।
