৬ঘ.
-আচ্ছা মায়া, সুরঞ্জনের হয়েছে কি বল তো? সে এ সময় বাইরে বাইরে ঘুরছে। কোথায় বল তো দেখি। সুধাময় জিজ্ঞেস করেন।
—পুলকদার বাড়ি যাবে বলেছে। ওখানে আড্ডায় বসেছে নিশ্চয়।
—তাই বলে সন্ধের আগে বাড়ি ফিরবে না?
—কী জানি, বুঝতে পারি না। ফেরা তো উচিত?
–সে কি একবারও ভাবে না বাড়িতে মানুষগুলো দুশ্চিন্তা করছে, এবার বাড়ি ফিরি।
মায়া থামিয়ে দেয় সুধাময়কে। —থাক তুমি এত কথা বলে না। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তোমার। উচিতও নয়। চুপচাপ শুয়ে থােক। এখন অল্প একটু খাবে। এরপর কোনও বই-টই যদি পড়ে শোনাতে হয়, শোনাব। ঠিক দশটায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে। এর মধ্যে দাদা ফিরবেই, তুমি ভেব না।
—তুই আমাকে শিগরি ভাল করে তুলছিস মায়া। আমি না হয় আরও কটা দিন পড়ে থাকতাম বিছানায়। ভাল হওয়ার কিন্তু বিপদও আছে।
—কি রকম বিপদ? মায়া বিছানায় বসে ভাত চটকায় আর জিজ্ঞেস করে।
সুধাময় হেসে বলেন–তুই মুখে তুলে খাওয়াচ্ছিস, কিরণময়ী হাত পা মালিশ করছে। মাথা টিপে দিচ্ছে। এত আদর কি ভাল হয়ে গেলে পাব? তখন রোগী দেখ, বাজার কর, মায়ার সঙ্গে দুবেলা ঝগড়া কর। সুধুময় হেসে ওঠেন। মায়া অপলক সুধাময়ের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকেন। অসুখের পর আজ প্রথম হাসতে দেখছে সে সুধাময়কে।
তিনি কিরণময়ীকেও বলছেন—আজ সব জানালা খুলে দাও তো। ঘর এত অন্ধকার হয়ে থাকে, ভাল লাগে না। আজ একটু হাওয়া ঢুকুক। শীতের হাওয়ার স্বাদই পেলাম না। কেবল কি বসন্তের হাওয়ায় সব ভাল লাগা? যৌবনে কনকনে শীতে দেওয়ালে পোস্টার লাগাতাম। গায়ে একটা ফিনফিনে শার্ট থাকত। মনি সিং-এর সঙ্গে সুসং দুগাপুরের পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছি। সে সময়ের টংক আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহের কথা কিছু জানো কিরণময়ী?
কিরণময়ীরাও মন ভাল, বলেন—তুমি বিয়ের পর কত না গল্প করেছ। নেত্রকোণার এক অচেনা বাড়িতে মনি সিং-এর সঙ্গে রাত কাটিয়েছিলে!
—আচ্ছা কিরণ, সুরঞ্জন কি গরম কাপড় পরে গেছে।
মায়া ঠোঁট উল্টে বলে—আরে না। তোমার মতই ফিনিফিনে শার্ট পরা। তিনি তো আবার এ কালের বিপ্লবী। গায়ে তার প্রকৃতির হাওয়া লাগে না। যুগের হাওয়া সামলাতে ব্যস্ত।
কিরণময়ীর কণ্ঠে রাগ ফোটে–সারাদিন কোথায় থাকে, কী খায় না খায়। আন্দেী খায় কি না। ওর উচ্ছঙ্খলতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
তখনই দরজায় খুটি খুঁট শব্দ। সুরঞ্জন এল নাকি? সুধাময়ের শিয়রের কাছে বসেছিলেন কিরণময়ী, উঠে যান দরজার দিকে। সুরঞ্জন ঠিক এভাবেই শব্দ করে। বেশি রাত হলে ও অবশ্য তার ঘরেই সোজা ঢোকে। কখনও দরজায় তালা দিয়ে যায়। তালা না দিলেও বাইরে থেকে ভেতরের ছিটিকিনি খুলবার কায়দা জানে। ও। বেশি রাতে যখন হয়নি, সুরঞ্জনই বোধহয়। মায়া সুধাময়ের জন্য জাউদ্ভাতে ডাল মাখছিল। খাবার ডলে ডলে সে নরম করছিল, সুধাময়ের খেতে যেন অসুবিধে না হয়। অনেক দিন লিকুইড খাওয়ানো হয়েছে। ডাক্তার সেমি সলিড খাবার কথা বলে গেছেন। শিংমাছের ঝোল করা হয়েছে। সামান্য ঝোল নিয়ে মাখছে। যখন মায়া, তখনই দরজায় খুঁট খুঁট শব্দ শোনে। কিরণময়ী দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছেন কে। ওদিক থেকে কি উত্তর আসে কান পেতেছিলেন সুধাময়। কিরণময়ী দরজা খুলবোর সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ঢোকে সাতজন যুবক। চারজনের হাতে মোটা লাঠি, আর বাকি তিনজনের হাতে কি দেখবার আগেই ওরা কিরণময়ীকে ডিঙিয়ে ভেতরের ঘরে ঢোকে। বয়স ওদের একুশ বাইশ হবে। দুজনের মাথারটুপি, পাজামা পাঞ্জাবি পরা। বাকি তিনজনের শার্ট প্যান্ট। ওরা ঢুকে কারও সঙ্গে কোনও কথা নেই টেবিল চেয়ার, কাচের আলমারি, টেলিভিশন, রেডিও, থালাবাসন, গ্লাস, বাটি, বইপত্র, ড্রেসিং টেবিল, কাপড়াচোপড়, পেডেস্টাল ফ্যান যা সামনে পাচ্ছে উন্মত্তের মত ভাঙতে শুরু করে। সুধাময় উঠে বসতে চান, পারেন না। মায়া চিৎকার করে ওঠে বাবা বলে। কিরণময়ী দরজা ধরে স্তব্ধ দাঁড়িয়েছিলেন। কী বীভৎস দৃশ্য। একজন কোমর থেকে একটি রামদা বের করে, বলে—শালারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছিস। তোদের আস্ত রাখব ভেবেছিস?
ঘরের একটি জিনিসও আস্ত থাকে না। ঝনঝনি করে সব ভেঙে পড়তে থাকে। মুহুর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় সব, কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই। মায়াও ছিল স্থির, স্তব্ধ। হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে যখন তার হাত ধরে টান দেয়। ওদের মধ্যে একজন। কিরণময়ীও তার ধৈর্য ভেঙে আর্তনাদ করে ওঠেন। সুধাময় গোঙান কেবল। তাঁর ভাষা ফোটে না। তিনি চোখের সামনে দেখেন মায়াকে ওরা টেনে নিচ্ছে। মায়া খাটের রেলিং ধরে নিজেকে আটকে রাখছে। কিরণময়ী দৌড়ে এসে দু হাতে আটকে রাখেন মায়াকে। দুজনের গায়ের শক্তি, দুজনের আর্তনাদকে ছুড়ে দিয়ে ওরা মায়াকে টেনে নিয়ে যায়। পেছন পেছন দৌড়েন। কিরণময়ী। চিৎকার করে বলতে থাকেনা-বাবারা ছেড়ে দাও। আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও।
রাস্তায় দুটো বেবি ট্যাক্সি দাঁড়ানো ছিল। মায়ার হাতে তখনও সুধাময়ের জন্য ভাত মাখানোর দাগ। ওড়না খুলে পড়ে গেছে। ওর। সে ‘মা গো মা গো চিৎকার করছেই। পেছনে আকুল চোখে তাকাচ্ছে কিরণময়ীর দিকে। কিরণময়ী তাঁর শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়েও মায়াকে ধরে রাখতে পারেননি। ওদের চকচকে রামদাকে তুচ্ছ করে কিরণময়ী ঠেলে সরাতে চেয়েছিলেন দুজনকে। পারেননি। ছুটে যাওয়া বেবি ট্যাক্সির পেছন পেছন তিনি দৌড়োতে থাকেন। পথচারী যাকে পান, বলেন-আমার মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। একটু দেখুন, দেখুন না। দাদা। মোড়ের দোকানে কিরণময়ী থামেন। চুল খোলা, খালি পা, কিরণময়ী মতি মিয়াকে বলেন-একটু দেখবেন দাদা, কারা এইমাত্র ধরে নিয়ে গেল মায়াকে, আমার মেয়েকে। সকলে নিরুজ্ঞাপ চোখে তাকায় কিরণময়ীর দিকে। যেন পথের পাগল আবোল-তাবোল বকছে। কিরণময়ী দৌড়োতে থাকেন।
