কে একজন সুরঞ্জনকে ডাকে-ওঠ, ওঠ সুরঞ্জন, খেয়ে নাও! ভাত দিয়েছে।
কাজলদাই ডাকছেন মনে হয়। মায়া এরকম ডাকে, দাদা এস, ভাত দিয়েছি, খেয়ে নাও। মায়ার নোটটি রাতে সে ভাঙাবো। কটা ঘুমের ওষুধ কিনবে। কতদিন মনে হয় ঘুমানো হয় না। তার। রাত হলেই ছারপোকা কামড়ায়। বিছানা ভরা ছারপোকা, ছোটবেলায় সুরঞ্জন দেখত কিরণময়ী হাতপাখা মেঝোয় টুকে ঠুকে ছারপোকা মারতেন। মায়াকে বলে আজ রাতেই ঘরের সব ছারপোকা মেরে ফেলতে হবে। টুকটুক করে কামড়ায় সারারাত। মাথার ভেতর কামড়ায়। সুরঞ্জনের আবার বিমঝিম করে ওঠে মাথা। বমি আসতে চায়। এর মধ্যে কে একজন বলে, তার বাড়ি রাজবাড়ি, সম্ভকত তাপসের গলা। এটি, আমাদের ওখানে তিরিশটি মন্দির আর মন্দিরের আশেপাশের বাড়িঘরে আগুন জ্বলিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে একটি কণ্ঠ সন্ধের ঝোঁকে গলগল করে বলে-নোয়াখালির খবর বলি শোন, সুন্দলপুর গ্রামে সাতটি বাড়ি আর অধরচাঁদ আশ্রম লুট করে আগুন জ্বলিয়ে দেয়। জগন্নানন্দ গ্রামে তিনটি বাড়িতে লুটপাটের পর আগুন লাগিয়ে দেয়। গঙ্গাপুর গ্রামেও তিনটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ছাই করে দিয়েছে। রাগারগাঁও গ্রাম, দৌলতপুর গ্রাম, ঘোষবাগ, মাইজদি, সোনাপুরের কালী মন্দির, বিনোদপুর আখড়া, চৌমুহুনির কালী মন্দির, দুৰ্গাপুর গ্রাম, কুতুবপুর, গোপালপুর, সুলতানপুরের অখণ্ড আশ্রম, ছয়আনি বাজারের কয়েকটি মন্দির ভেঙে ফেলেছে। বাবুপুর তেতুইয়া, মহদিপুর, রাজগঞ্জ বাজার, টঙ্গির পাড়, কাজির হাট, রসূলপুর, জমিদারহাট, চৌমুহঁনি পোড়াবাড়ি, ভবভদ্রী গ্রামে দশটি মন্দির আঠারোটি বাড়িতে আগুন জ্বালানো হয়। কোম্পানিগঞ্জে বড় রাজপুর গ্রামে উনিশটি বাড়িতে লুটপাট, মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটানো হয়। রামদি গ্রামে আজ বিপ্লব ভৌমিক নামের এক লোককে দা দিয়ে কোপানো হয়েছে।
সুরঞ্জন যদি তুলো দিয়ে কানের ফুটো দুটো বন্ধ করে রাখতে পারত। চারদিকে বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গ, চারদিকে ভাঙা পোড়ার গল্প। আহ, যদি কোনও নির্জনতা পেত সুরঞ্জন। এই সময় ময়মনসিংহে চলে যেতে পারলে ভাল হত। এইসব ভাঙাভাঙিগুলো ওখানে কম। ব্ৰহ্মপুত্রে সারাদুপুর স্বান করতে পারলে বোধহয় শরীরে যে জ্বালা ধরছে, কিছু জুড়তো। ঝাঁট করে উঠে পড়ে সে। ঘরের লোক অনেকে এর মধ্যে চলে গেছে। সুরঞ্জনও যাবার জন্য পা বাড়ায়। কাজলদা বলেন–টেবিলে ভাত আছে, খেয়ে নাও। এই অসময়ে ঘুমোলে যে! শরীর খারাপ?
সূরঞ্জন আড়মোড়া ভেঙে বলে—না কাজলদা, খাব না। ইচ্ছে করছে না। শরীরটা যেন কেমন কেমন লাগছে।
–এর কোনও মানে হয়?
—মনে হয়ত হয় না। কিন্তু করব কি বলুন। একবার ক্ষিদে লাগে, একবার ক্ষিদে চলে যায়। টক ঢেকুর উঠছে, বুক জ্বলছে। ঘুম পায়, কিন্তু ঘুমোতে গেলে ঘুমও আসে না আর।
যতীন চক্রবর্তী সুরঞ্জনের কাঁধে হাত রেখে বলেন—তুমি ভেঙে পড়ছি সুরঞ্জন। আমাদের কি এভাবে হতাশ হলে চলবে? শক্ত হও। বেঁচে তো থাকতে হবে।
সুরঞ্জন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল, যতীনন্দার কথাগুলো সুধাময়ের কথার মত শোনায়। বাবার অসুস্থ শিয়রে তার কতদিন বসা হয় না। আজ আর দেরি করবে না বাইরে। কাজলদার বাড়ি এলেই এই হয়, নানারকম লোক আসেন। ধুম আড্ডা হয়। রাজনীতি, সমাজনীতির কঠিন কঠিন কথাবাত চলে অর্ধেক রাত পর্যন্ত। সুরঞ্জন কতক শোনে, কতক শোনে না।
টেবিলে বাড়া ভাত রেখেই সে চলে যায়। অনেকদিন বাড়িতে খায় না, আজ খাবে। আজি মায়া, কিরণময়ী, সুধাময়কে নিয়ে সে একসঙ্গে খেতে বসবে। এতদূরত্ব তৈরি হচ্ছে বাড়ির সবার সঙ্গে, দূরত্ব তৈরির কারণ অবশ্য সে নিজে। সামনে আর দেওয়াল রাখবে না। সুরঞ্জন। সকালে যেমন খুব মন ভাল ছিল, তেমন ভাল মন নিয়ে সে সবার সঙ্গে হাসবে, কথা বলবে, ছোটবেলার সেই রোদে বসে ভাপা পিঠে খাওয়ার দিনের মতা-মনেই হবে না। কেউ কারও পিতা পুত্র, কেউ কারও ভাই বোন, যেন বন্ধু সব, খুব কাছের বন্ধু। আজ আল্প কারও বাড়িতে যাবে না। সে, পুলকের বাড়ি না, রত্নার বাড়ি না। সোজা টুিকটুলি গিয়ে ডাল ভাত যা হোক খেয়ে সবার সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করবে, তারপর ঘুম দেবে।
কাজলদা নীচের গেট অদি এগিয়ে দেন। খুব আন্তরিক কষ্ঠেই বলে-তোমার কিন্তু এভাবে বাইরে বের হওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমরা এই বাউন্ডারির ভেতরেই যা চলাফেরা করছি, এর বাইরে নয়। এ বাড়িতে যারা এসেছে তারা কেউ দূর থেকে আসেনি। আর তুমি দিব্যি একা একা শহর ঘুরে বেড়ােচ্ছ। কখন কি ঘটে যায় বলা যায় না।
সুরঞ্জন কোনও কথা না বলে দ্রুত সামনে হাঁটে। পকেটে টাকা আছে, দিব্যি রিক্সা নেওয়া যায়। কিন্তু মায়ার টাকাটায় রীতিমত মায়া বসে গেছে, খরচ করতে ইচ্ছে করছে। না। সারাদিন সিগারেট ফোঁকেনি সে। টাকার মায়া ফুঁড়ে সারাদিন পর রাত ঘন হয়ে এলে তার সিগারেটের তৃষ্ণা হয়; দোকানো দাঁড়িয়ে এক প্যাকেট বাংলা ফাইভ কেনে, রাজা রাজা লাগে নিজেকে। হেঁটে হেঁটে কাকরাইলের মোড়ে এসে সে রিক্সা নেয়। শহর যেন অনেক আগেই আজকাল ঘুমিয়ে পড়ে। অসুস্থ থাকলে মানুষ যেমন সকাল সকাল ঘুমায়, শহরও তেমনি। শহরের রোগটা কি? ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে তার এক বন্ধুর পাছায় বড় এক ফোঁড়া হয়েছিল, দিনরাত চিৎকার করত, কিন্তু ওষুধ দেখলে ভয় পেত, ইনজেকশন দেখে তার রীতিমত কাঁপুনি উঠত। শহরের পাছায় কি তেমন একটি ফোঁড়া হয়েছে। সুরঞ্জনের সেরকমই মনে হয়।
