নির্মল বলে–কাজলদা, হিন্দুদের মধ্যে কোনও ব্রিগেডিয়ার বা মেজর জেনারেল নেই। কর্নেল সত্তরজনে একজন, লেফটেনেন্ট কর্নেল চারশ পঞ্চাশজনে আটজন, মেজর এক হাজার জনে চল্লিশজন, ক্যাপ্টেন তেরশজনে আটজন, সেকেন্ড লেফটেনেন্ট নয়শীজনে তিনজন, সিপাহি আশি হাজারে মাত্র পাঁচশজন। চল্লিশ হাজার বি ডি আর-এর মধ্যে হিন্দু মাত্র তিনশজন। সেক্রেটারি কেবল হিন্দু নেই বলছেন কেন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানও তো নেই। এডিশনাল সেক্রেটারিও তো নেই। জয়েন্ট সেক্রেটারি আছেন একশ চৌতিরিশজনে মাত্র একজন।
কাজল আবার শুরু করেন—ফরেন সার্ভিসে সংখ্যালঘু কি আছে। একজনও? আমার তো মনে হয় নেই।
সুভাষ মোড়ায় বসেছিল, হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। বলে—না কাজলদা নেই।
ঘরে কার্পেট পাতা। সুরঞ্জন কর্পেটে বসেই একটি কুশনে হেলান দেয়। তার বেশ ভাল লাগছে আলোচনা শুনতে।
কবীর চৌধুরি বলেন–পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের আমলে একমাত্ৰ মনোরঞ্জন ধরকে কিছুদিনের জন্য জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছিল।
—হায়ার স্টাডিজের জন্য, বিদেশে ট্রেনিং এসব ব্যাপারে হিন্দুদের এভিয়েড করা হয়। কোন লাভজনক ব্যবসাই এখন হিন্দুদের হাতে নেই। ব্যবসা বাণিজ্য করতে গেলে মুসলমান অংশীদার না থাকলে কেবল হিন্দু প্রতিষ্ঠানের নামে সব সময় লাইসেন্স পাওয়া যায় না। তা ছাড়া শিল্পঋণ সংস্থা থেকে ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য ঋণ দেওয়া হয় না।
অঞ্জন বলে–হ্যাঁ, আমিই তো গামেন্টস করার জন্য জুতোর সুকতলি খরচ করে ফেললাম। ব্যাঙ্ক-এর কোনও হেলপ পেলাম না। তারপর আফসারকে পার্টনার করে লোন নিতে হল।
সুভাষ বলে–একটা ব্যাপার লক্ষ করেছেন, রেডিও টেলিভিশনে কোরানের বাণী দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। কোরানকে পবিত্র গ্রন্থ বলা হচ্ছে। কিন্তু গীতা বা ত্রিপিটক থেকে পাঠ করার সময় কিন্তু পবিত্র বলা হচ্ছে না।
সুল্লঞ্জন বলে—আসলে কোনও ধর্মগ্ৰন্থই তো পবিত্র নয়। যতসব বদমায়েসি এসব। সব বাদ দিলেই তো হয়। দাবি করা যেতে পারে রেডিও টিভিতে ধর্মপ্রচার বন্ধ করতে হবে।
আসর খানিকটা চুপ হয়ে যায়। সুরঞ্জনের চা খেতে ইচ্ছে করে। সম্ভবত চায়ের কোনও ব্যবস্থা এ বাড়িতে হচ্ছে না। তার শুয়ে পড়তে টুচ্ছে করে কার্পেটটিতে। শুয়ে শুয়ে সবার ভেতরকার কষ্টগুলোর যে উদগীরণ হচ্ছে, তা সে উপভোগ করবে।
কাজল দেবনাথ তার না শেষ হওয়া কথা বলতে থাকেন–সরকারি যে কোনও অনুষ্ঠানে, প্রতিটি সভা-সমিতিতে কোরানের সূরা পাঠ করা হয়। কই, গীতা থেকে তো করা হয় না? সারা বছরে সরকারি হিন্দু কর্মচারীদের জন্য মাত্র দুদিন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের ঐচ্ছিক ছুটির অধিকারও তেমন নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মসজিদ নিমণি করান্ধি ঘোষণা করা হয়, কিন্তু মন্দির নিমণ করার কথা তো বলা হয় না। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন মসজিদ করা হচ্ছে, অথবা পুরনো মসজিদের সংস্কার চলছে, কিজ মন্দির গিজা প্যাগোড়ার জন্য কিছু কি খরচ করা হয়?
সুরঞ্জন শোয়া থেকে মাথা উঠিয়ে বলে—রেডিও টিভিতে গীতা থেকে পাঠ হলে খুশি হন? মন্দির নিমণি হলে খুব মঙ্গল হবে? একবিংশ শতাব্দী এসে যাচ্ছে, আমরা আজও ধমের প্রবেশ চাচ্ছি সমাজে, রাষ্ট্রে। তার চেয়ে বলুন রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি ধর্মীয় অনুপ্রবেশ থেকে মুক্ত থাকবে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষত চাই মানে তো এই নয় যে এখন কোরান পড়লে গীতাও পড়তে হবে। আমাদের চাইতে হবে রাষ্ট্ৰীয় সমস্ত কাহকিলাপে ধমীয় অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ধমীয় প্রার্থনা, পাঠ্য বইয়ে কোনও ধর্মীয় নেতার জীবনী দেওয়াও নিষিদ্ধ করতে হবে। ধমীয় কার্যকলাপে পলিটিক্যাল লিডারদের সহযোগিতা নিষিদ্ধ করতে হবে। যদি কোনও নেতা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, অথবা পৃষ্ঠপোষকতা করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। সরকারি প্রচার মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচার নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনও আবেদন পত্রে আবেদনকারীর ধর্ম জানতে চাওয়া হবে না।
সূরঞ্জনের কথায় কাজল দেবনাথ হেসে ওঠেন, বলেন–তুমি বেশি এগিয়ে যাচ্ছ ভাবনায়। একটি সেকুলার দেশে তোমার প্রস্তাবগুলো চলে, এই দেশে চলে না।
সুভাষ উসখুস করছিল, ফাঁক পেয়ে বলে–আজ বাংলাদেশ ছাত্র-যুব ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে মিটিং করেছি। হোম মিনিস্টারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পুনর্নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের ক্ষতিপূরণ দান, সহায় সম্বলহীনদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি ছিল ওতে।
সুরঞ্জন কুশনে মাথা দিয়ে শুয়ে ছিল, উঠে বলে—তোমার একটি দাবিও এই সরকার মানবে না।
কবীর চৌধুরি বলেন—তা মানবে কেন? হোম মিনিস্টার তো আস্ত একটা রাজাকার। শুনেছি এই লোক একাত্তরে কাঁচপুর ব্রিজে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্প পাহারা দিত।
সাইদুর রহমান বলেন–রাজাকারগুলোই তো এখন ক্ষমতায়। শেখ মুজিব এদের ক্ষমা করেছে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসিয়েছে। এরশাদ এদের আরও শক্তিশালী করেছে। আর খালেদা জিয়া সরাসরি রাজাকারদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় বসেছে।
