—খালেদা কি একবারও স্বীকার করেছে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা হচ্ছে? একবারও তো বিধবন্ত এলাকা দেখতে গেলেন না। তিনি। আসরের একজন এই কথা বলতেই কাজল বলেন-আওয়ামি লিগই বা কি করেছে। বিবৃতি দিয়েছে। এরকম বিবৃতি জামাতে ইসলামি দিয়েছে আগে। গত নিবাচনে আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় এলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ রাখবে না বলে এক ধরনের অপবাদ প্রচার হয়েছে। তারা এখন ক্ষমতায় না। যেতে পেরে ভাবছে। এইটথ এমেন্ডমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বললে জনপ্রিয়তা কমে যাবে।
আওয়ামি লিগ কি ভোটে জিততে চায় নাকি নীতিতে অটল থাকতে চায়? অটল থাকলে এই বিলের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলছে না কেন?
—ভেবেছে ক্ষমতায় আগে তো যাই, তারপর যা রদবদল করা দরকার, করা যাবে। সাইদুর রহমান আওয়ামি লিগের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করান।
–কাউকে বিশ্বাস নেই। সবাই ক্ষমতায় গিয়ে ইসলামের গান গাইবে আর ভারতের বিরোধিতা করবে। এ দেশে ভারত বিরোধিতা এবং ইসলাম লোকে খায় ভাল। কাজল মাথা নেড়ে বলেন।
হঠাৎ সুরঞ্জন আলোচনার প্রসঙ্গে না গিয়ে তার পুরনো প্রশ্নটিই করে—কিন্তু কাজলদা, আপনাদের এই সাম্প্রদায়িক পরিষদটি না করে অসাম্প্রদায়িক মানুষের একটি দল করলে ভাল হত না? আর এই পরিষদে সাইদুর রহমান নেই কেন, জানতে পারি?
যতীন চক্রবর্তী ভারী কণ্ঠে বলেন–সাইদুর রহমানকে না নিতে পারা আমাদের ব্যর্থতা নয়। ব্যৰ্থতা রাষ্ট্রধর্ম যারা তৈরি করেছে, তাদের। এতকাল তো আমাদের এরকম পরিষদ করতে হয়নি, এখন করতে হয় কেন? বাংলাদেশটি এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সকলেরই অবদান ছিল, কিন্তু একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা মানে অন্য ধর্মের মানুষদের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম দেওয়া। স্বদেশের প্রতি ‘ভালবাসা কারও চেয়ে কারও কম নয়। কিন্তু যারা দেখে ইসলাম তাদের ধর্ম না। হওয়ায় রাষ্ট্রের চোখে তাদের পৈত্রিক ধর্ম দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর ধর্ম বলে বিবেচিত হয়, এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক কারণেই তারা দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে গেছে, তখন তাদের অভিমান মারাত্মক হয়। এ কারণে যদি তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বদলে সাম্প্রদায়িকতার চেতনাই প্রবল হয়ে ওঠে, তবে তাদের দোষ দেওয়া যায় কি?
উত্তরটি যেহেতু সুরঞ্জনের দিকে ছুড়ে দেওয়া, সুরঞ্জন আই নীচু কণ্ঠে বলে-কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে এরকম একটি সম্প্রদোয়ভিত্তিক সংগঠন থাকার যুক্তি কি?
যতীন চক্রবর্তী মুহূর্ত দেরি না করে বলেন—কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এ রকম সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন করতে বাধ্য করেছে। কারা? যারা রাষ্ট্ৰীয় ধর্মের প্রবক্তা, তারা নয়? একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের রিলিজিয়নকে রাষ্ট্রধর্ম বানালে সেই রাষ্ট্রটি তো আর জাতীয় রাষ্ট্র থাকে না। যে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রধর্ম আছে, সে রাষ্ট্র ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হতে পারে যে কোনও মুহুর্তে। এই রাষ্ট্র দ্রুত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হচ্ছে, এখানে জাতীয় সংহতির কথা বলা হাস্যকর। এইটথ এমেন্ডমেন্ট যে আসলে বাঙালিকে কলা দেখানো তা সংখ্যালঘুরা বুঝতে পারছে কারণ তারা ভুক্তভোগী।
–আপনি কি ভাবছেন মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়া, বা ধর্মীয় রাষ্ট্র হওয়া কল্যাণকর? আমি কিন্তু তা মনে করি না।
—-নিশ্চয়ই না। এটা তারা আজ না বুঝলেও একদিন বুঝবে।
—আওয়ামি লিগ কিন্তু এ সময় ভাল একটি ভূমিকা রাখতে পারত। অঞ্জন বলে।
সুরঞ্জন বলে—হ্যাঁ আওয়ামি লিগের বিলেও অষ্টম সংশোধনী বাতিলের প্রস্তাব নেই। যে কোনও আধুনিক গণতন্ত্রী মানুষ জানে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আমি বুঝি না যে দেশের শতকরা ছিয়াশি জন মুসলমান, সে দেশে ইসলামকে রাষ্ট্ৰীয় ধর্ম করার দরকার কী। বাংলাদেশের মুসলমানেরা এমনিতেই ধর্ম পালন করে, তাদের জন্য রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার কোনও দরকার পড়ে না।
যতীনবাবু নড়েচড়ে বসে বলেন–নীতির প্রশ্নে কোনও আপিস হয় না। আওয়ামি লিগ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে বলে এক ধরনের আপিস করছে।
সুভাষ চুপচাপ কথা শুনছিল। এবার বলে—আসলে জামাতি আর বি এন পি-র সমালোচনা না করে আমরা খামোক আওয়ামি লিগকে নিয়ে পড়েছি। ওরা কি আওয়ামি লিগের চেয়ে ভাল কাজ করছে। কাজল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন–আসলে যারা চিহ্নিত শত্ৰু, তাদের সম্পর্কে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যাদের ওপর আশা করি, তাদের স্খলন দেখলেই মনে লাগে বেশি।
কবীর চৌধুরি হঠাৎ মাঝখান থেকে বলেন—এত যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলছে সবাই, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কিন্তু সকল ধর্মের প্রতি একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা, এখানে পক্ষপাতিত্ব বলে কিছু নেই। আর সেকুলারিজম শব্দটির মানে হচ্ছে ইহজাগতিকতা, সোজা ভাষায়, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না।
কাজল দেবনাথ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, বলেন–দেশ বিভাগের সময় মুসলিম মৌলবাদ জিতে পাকিস্তানের জন্ম দেয়। ভারতে হিন্দু মৌলবাদ। কিন্তু হেরে যায়। হেরে যায় বলেই ভারত একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হতে পেরেছে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এ দেশের হিন্দুদের জিম্মি বলে ঘোষণা হয়েছিল। কেবল হিন্দু বিতাড়নের অজুহাত হিসেবে, মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সম্পত্তি দখল। পাকিস্তান আমলের কায়দায় আবার যখন ইসলামি ব্যবস্থার জিগির শোনা যায়। তখন হিন্দুল্লা ভয় পাবে না কেন? এ দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র না করলে হিন্দুদের বাঁচা অসম্ভব। আমাদের আরও দাবি শত্ৰু সম্পত্তি আইন বাতিল করতে হবে। এডমিনিষ্ট্রেশনে কোনও হিন্দু নেই। পাকিস্তান আমল থেকে কোনও সেক্রেটারি পদে হিন্দুদের নেওয়া হচ্ছে না। আমিতে হিন্দু সংখ্যা খুবই কম। যারা আছে কারোরই প্রমোশন হয় না। নেভি বা এয়ারফোর্সে হিন্দু কেউ আছে বলে তো মনে হয় না।
