সূরঞ্জন কোথায় যাবে ঠিক বুঝে পায় না। এই ঢাকা শহরে তার আপনি কে আছে? কার কাছে গিয়ে দুদণ্ড বসবে, কথা বলবে? আজি মায়া তাকে দেবে না দেবে না বলেও একশ টাকা দিয়েছে। বুক পকেটে নোটটি রাখা, খরচ করতে ইচ্ছে করছে না। দু-একবার ভেবেছে এক প্যাকেট বাংলা ফাইভ কিনবে, কিন্তু কিনলেই তো ফুরিয়ে যাবে। টাকার মায় সে কখনই করে না। সুধাময় তাকে শর্ট-প্যান্ট বানাবার টাকা দিতেন, সেই টাকা সে বন্ধুবান্ধবের পেছনে খরচ করত, কেউ হয়ত পালিয়ে বিয়ে করবে, টাকা পয়সা পাচ্ছে না, সুরঞ্জন বিয়ে করবার খরচ দিয়ে দিল, একবার পরীক্ষার ফিস দিয়ে দিল রহমত নামের এক ছেলেকে। ছেলেটির মা ছিল হাসপাতালে, ওষুধ কিনবার টাকা ছিল না হাতে, ব্যস সুরঞ্জন ফিসের টাকাটি তাকে দিয়ে দিতে সামান্যও দেরি করেনি। একবার কি রত্নার কাছে যাবে। সে স্ট্র রত্না মিত্ৰ? এরকম হয় না বিয়ের পর সে রত্নার পদবী আর বদলালো না? মেয়েরা কেন বিয়ে হলেই পদবী বদলায়? বিয়ের আগে বাবার লেজ ধরে বেঁচে থাকে, বিয়ের পর ধরে স্বামীর লেজ। যত্তসব। সুরঞ্জনেরও ইচ্ছে করে নিজের নাম থেকে দত্ত পদবী তুলে দিতে। মানুষের এই ধর্ম বর্ণ ভেদাই মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাঙালি সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, বাংলা নাম রাখবে। মায়ার নাম সে অনেকদিন ভেবেছে নীলাঞ্জনা মায়া হলে বেশ হত। আর তার নাম হতে পারত, কী হতে পারত, ‘নিবিড় সুরঞ্জন? সুরঞ্জন সুধা’? ‘নিখিল সুরঞ্জন? এরকম কিছু হলেই ধর্মের কালি আর গায়ে মাখতে হয় না। বাঙালি মুসলমানের মধ্যেও সে আরবি নাম রাখবার প্রবণতা লক্ষ করেছে। অতি প্রগতিবাদী ছেলেও যে কি না বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে সেও তার বাচ্চার নাম রাখতে গেলে রাখে ফয়সল রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, ফাইয়জ চৌধুরি। কেন গো? বাঙালি মানুষের আরবি নাম থাকবে কেন? সুরঞ্জন তার মেয়ের নাম রাখবে স্রোতস্বিনী ভালবাসা, অথবা অর্থই নীলিমা; অর্থই নীলিমা বরং মায়ার নীলাঞ্জনা নামের সঙ্গে মেলে। এই নামটি মায়ার মেয়ের জন্য না হয় দিয়ে দেওয়া যাবে।
সুরঞ্জন হাঁটতে থাকে। এলোমেলো হাঁটা, অথচ বাড়ি থেকে বেরোবার সময় মনে হয়েছে কত তার কাজ। বাইরে বেরোলেই আর সে যাবার জায়গা পায় না খুঁজে। যেন সবাই ব্যস্ত, যে যার কাজে ছুটছে সবাই, কেবল তারই কাজ নেই, তারই কোনও ব্যস্ততা নেই। সে এই সন্ত্রাসের শহরে কারও সঙ্গে বসে দুটো কথা বলতে চায়। বংশালে দুলালের বাড়ি যাবে নাকি? নাকি আজিমপুরের মহাদেবদার বাড়ি? ইস্পাহানি কলোনিতে কাজল দেবনাথের বাড়িও যাওয়া যায়। যাবার কথা উঠতেই তার কেবল হিন্দু নাম মনে পড়ছে কেন? কাল বেলাল এসেছিল, সে তো বেলালের বাড়ি একবার যেতে পারে। হায়দার ফিরে গেল সেদিন, হায়দারের বাড়িতেও আডিডা দেওয়া যায়। এদের বাড়িতে গেলে সেই একই কথার ফুলকি উঠবে, বাবরি মসজিদ। ভারতে কী হচ্ছে ক’জন মরল, বি জে পি নেতারা কী বলল, সেনা নামিল কোন কোন শহরে, কারা গ্রেফতার হল, কোন দল নিষিদ্ধ হল—ভবিষ্যৎ কী হবে, এইসব। এগুলো শুনতে আর ভাল লাগে না তার। ওখানে বি জে পি যা, এখানে জামাতি তা। উদ্দেশ্য দু দলের একই। মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা। দুটো দেশ থেকে যদি ধর্মের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যেত! ধৰ্ম এমন জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে, এ থেকে তৃতীয় বিশ্বের নিরন্ন, নিরীহ, নির্যাতিত মানুষের বোধহয় মুক্তি নেই। কার্ল মার্ক্স-এর এই কথাটি বড় প্রিয় তার, ভিড়ের মধ্যে বিড়বিড় করে বলে—’ধমীয় ক্লেশ হল একই বাস্তব ক্লেশের অভিব্যক্তি এবং বাস্তব ক্লেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও। ধর্ম হল নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, ঠিক যেমন সেটা হল আত্মাহীন পরিবেশের আত্মা। ধর্ম হল জনগণের জন্য আফিম। ‘
হেঁটে হেঁটে ওয়ারি, নবাবপুর, নয়াবাজার, তাঁতিবাজার, কোর্ট এরিয়া, রজনী বসাক লেন, গেণ্ডারিয়া, বেগম বাজার ঘুরে ঘুরে দুপুর পার করে সুরঞ্জন শেষ পর্যন্ত কাজলের বাড়িই যায়। তাকে বাড়িতেই পাওয়া যায়, আজকাল সব হিন্দুকে বাড়িতে পাওয়া যায়। হয়। বাড়ির বাইরে কোথাও লুকিয়ে থাকে, নয় ঘাপটি মেরে বাড়িতে বসে থাকে। আড্ডা দিয়ে বেড়ানোর জন্য বেকার সুরঞ্জনের জন্য ভালই হল, কাজলকে পেয়ে সে মনে মনে বলে। কাজলের ঘরে আরও ক’জনকে পাওয়া যায়। সুভাষ সিংহ, তাপস পাল, দিলীপ দে, নির্মল চ্যাটার্জি, অঞ্জন মজুমদার, যতীন চক্রবর্তী, সাইদুর রহমান, কবীর চৌধুরি।
—কি খবর বেশ হিন্দু সমাগম দেখছি।
সুরঞ্জনের কথায় কেউ হাসে না। সে নিজেই বরং হেসে ওঠে।
—কি খবর সবার এত মন খারাপ কেন? হিন্দুদের মারা হচ্ছে বলে? সুরঞ্জনই প্রশ্ন করে।
—মন ভাল থাকবার কোনও কারণ আছে? সুভাষ বলে।
কাজল দেবনাথ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ করে। সুরঞ্জন এই পরিষদকে কখনও সমর্থন করেনি। তার মনে হয়েছে এটিও একটি সাম্প্রদায়িক দল। এই দল সমর্থন করলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করবার দাবিটিতে তেমন জোর থাকে না। এ প্রসঙ্গে কাজল অবশ্য বলেন, চল্লিশ বছর প্রত্যাশায়, প্রতীক্ষায় থেকে নিরাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার, স্বনির্ভরতার তাগিদে এই পরিষদ গঠন করেছি।
