১৯৬৬-র পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার সারাদেশে জরিপ চালিয়েছিলেন, এতে দেখা যায়’৪৭-এর দেশত্যাগ, ‘৫০ ও’৫৪-র দাঙ্গার পর যারা তাদের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের পরিবারের সদস্য, সহঅংশীদার, বা অন্য আত্মীয়স্বজনদের বা অন্য নাগরিকের সঙ্গে শাসন সংরক্ষণ বা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত চলে গেছে কেবল তাদের বাড়িঘর, পুকুর বাগান, পারিবারিক শ্মশান, মঠ, মন্দির, কৃষিজাত অকৃষিজাত সম্পত্তি শত্ৰু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এ ছাড়াও যে হিন্দুরা ভারতে যায়নি, ভারতের বাইরে যারা বিদেশে থাকেন অস্থায়ীভাবে ভারতে থাকে, তাদের সম্পত্তিও শক্ৰ সম্পত্তির আওতায় আনা হয়। অথচ যে মুসলমানরা ভারত বা ভারতের বাইরে চলে গেছে তাদের সম্পত্তি কিন্তু শত্ৰু সম্পত্তির আওতায় আনা হয়নি। এ জন্য কোনও জরিপ ও চালানো হয়নি। হিন্দু যৌথ পরিবারের আইনের বিধান অনুযায়ী পরিবারের অনুপস্থিত সদস্যের সম্পত্তির মালিকানা যৌথ পরিবারের সারভাইভিং সদস্যদের ওপর ন্যস্ত হবে এবং তারা ভোগদখল করবে। অথচ এইসব সম্পত্তি সরকারের ওপর ন্যস্ত হচ্ছে।
সুধাময় ভাবেন, নিয়াজ হোসেন, ফজলুর আলম, আনোয়ার আহমেদরা ফ্যামিলিসহ তো তাঁর চোখের সামনেই লন্ডন আমেরিকায় চলে গেলেন, তাঁদের দেশের বাড়িতে দুল্পসম্পর্কের আত্মীয়রা বাস করছে, কেয়ারটেকার রেখে গেছেন, কেউ আবার ভাড়া দিয়ে গেছেন বাড়ি, কারও মাধ্যমে ভাড়া তুলে নেন। তাঁদের সম্পত্তিকে তো শত্ৰু সম্পত্তি বলা হয় না। সুধাময় উঠে দাঁড়াতে চান, তাঁর গা ঘামছে। কেউ নেই ঘরে, মায়া, কিরণময়ী সব গেল কোথায়?
৬গ.
সুরঞ্জন পুরনো ঢাকার রাস্তায় হাঁটে আর ভাবে এই শহরে এত হেঁটে বেড়িয়েও ময়মনসিংহকে সে ভুলতে পারেনি। ওই শহরে তার জন্ম, শুই ছোট্ট শহরে কেটেছে তার শৈশব, কৈশোর। বুড়িগঙ্গায় পা ডুবিয়ে রেখে ব্ৰহ্মপুত্রের কথাই সে ভাবে বেশি। মানুষ যদি তার জন্মকে অস্বীকার করতে চায়। তবেই বোধহয় ভুলতে পারে জন্মের মাটিকে, জন্মপাড়ের নদীকে। গৌতমরা চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে। তারা ভাবছে। এই দেশ তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়। কিন্তু যাবার আগে হু হু করে কাঁদছে কোন! পাঁচ বছর আগে তার মামা এসেছিলেন। কলকাতা থেকে, ব্ৰাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে কী যে শিশুর মত কাঁদলেন। তিনি। কিরণময়ী বলেছিলেন–সুরঞ্জন, যাবি নাকি তোর মামার সঙ্গে কলকাতায়? শুনে ছিঃ ছিঃ করে উঠেছিল সুরঞ্জন।
চার-ছয় বছর আগে পার্টির কাজে তাকে যেতে হয়েছিল ময়মনসিংহ। জানালায় বসে বুজ ধানক্ষেত, দিগন্ত অবধি বৃক্ষরাজি, কুড়েঘর, খড়ের গাদা, বিলে দৌড়ঝাপ করে উলঙ্গ শিশুদের গামছা পেতে মাছ ধরা, ট্রেন দেখে ফিরে চাওয়া সরল কৃষকের মুখ, দেখতে দেখতে তার মনে হয়েছে সে বাংলার মুখ দেখছে। জীবনানন্দ এই মুখ দেখেছিলেন বলে পৃথিবীর আর কোনও রূপ দেখতে চাননি। সুরঞ্জনের মুগ্ধতা হঠাৎ হোঁচটি খেল রামলক্ষ্মণপুর নামের স্টেশনটি আহমদ বাড়ি হয়ে গেছে দেখে, এক এক করে সে দেখল বালীর বাজারের নাম ফাতেমা নগর, কৃষ্ণনগরের নাম আওলিয়া নগর। ইসলামাইজেশন চলছে। সারাদেশ জুড়ে, ময়মনসিংহের ছোট্ট স্টেশনগুলোও বাদ গেল না। ব্ৰাহ্মণবাড়িয়াকে লোকে বলে বি বাড়িয়া, বরিশালের ব্ৰজমোহন কলেজকে বলে বি এম কলেজ, মুরারি চাঁদ কলেজকে ডাকা হয় এম সি কলেজ, হিন্দু নামগুলো বেরিয়ে আসে বলেই বুঝি সংক্ষেপের আশ্রয়? সুরঞ্জন আশঙ্কা করে। অচিরে এই সংক্ষেপগুলোও বিদেয় হয়ে মোহাম্মদ আলি কলেজ, সিরাজউদ্দৌলা কলেজ হয়ে যাবে ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হলের নাম গল্টে সূর্য সেন হল করায় স্বাধীনতার একুশ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধী লোকেরা বলছে সূর্য সেন ডাকাত ছিল, ডাকাতের নামে কী করে হলের নাম হয়? এর মানে নাম পল্টানোর আবদার। সরকার যে কখনও এই আবদার রাখবেন না, তা মনে হয় না। কারণ মৌলবাদী শক্তির সহায়তায় বি এন পি ক্ষমতায় বসেছে, তারাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মীেলাবাদীদের স্বার্থরক্ষা করছে।
পুরনো ঢাকার অলিগিলিতে হাঁটতে হাঁটতে সুরঞ্জন দেখে অক্ষত হিন্দু দোকানগুলো বন্ধ, ওরা যে কপাট খুলবে, কী ভরসায় খুলবে। তবু নব্বই-এর পর খুলেছিল, বিরানব্বইয়ের পরও হয়ত খুলবে। হিন্দুর গায়ের চামড়া বোধহয় গণ্ডারের। তা না হলে ওরা ভাঙা ঘর আবার বাঁধে। কী করে। ভাঙা দোকান আবার জোড়া লাগায় কী করে!! ঘরবাড়ি দোকানপাট না হয় চুন সুরকি দিয়ে জোড়া লাগে। ওদের ভাঙা মন কি জোড়া লাগে?
নব্বই-এ পাটুয়াটুলির ব্ৰাহ্ম সমাজ, শাঁখারি বাজারের শ্ৰীধর বিগ্ৰহ মন্দির, নয়াবাজারের প্রাচীন মঠ, কায়েতটুলির সাপ মন্দিরে লুটপাট, ভাঙচুর আগুন লাগানো হয়েছে। পটুয়াটুলির বিখ্যাত এম ভট্টাচার্য এন্ড কোং, হোটেল রাজ, ঢাকেশ্বরী জুয়েলার্স এভারগ্রীন জুয়েলার্স, নিউ ঘোষ জুয়েলার্স, আল্পনা জুয়েলার্স, কাশ্মীরি বিরিয়ানি হাউজ, রূপশ্রী জুয়েলার্স, মানসী জুয়েলার্স, মিতালি জুয়েলার্স, শাঁখারি বাজারের সোমা স্টোর, অনন্যা লন্ড্রী, কৃষ্ণা হেয়ার ড্রেসার, টায়ার টিউব রিপেয়ারিং, সাহা কেন্টিন, সদরঘাটে ভাসমান হোৱাটল উজালা, পান্থনিবাস লুট করে ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছে। নয়াবাজারের মিউনিসিপ্যালিটি সুইপার কলোনি লুট করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা আদালতের সুইপার ব্যক্তিটা পুরো জ্বলিয়ে দেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া পূর্বপাড়ার হরিসভা মন্দির, কালী মন্দির, মীর বাগ-এর মন্দির, গোশম বাজার আখড়া, শুভাঢ়া গোসাইর বাগের দুর্গ মন্দির, চন্দ্রাণিকারার মন্দির, পশ্চিম পাড়ার কালী মন্দির, শ্মশানঘাট, তেঘরিয়া পূকনদীর রামকানাই মন্দির, কালিন্দী বাড়ীশুর বাজারে দুর্গ মন্দির, কালী মন্দির, মনসা মন্দিরে হামলা, লুটপাট মুর্তি ভাঙা সবই ঘটেছে। শুভাঢ্যার খেজুর বাগ-এর প্যারীমােহন মিশ্রের ছেলে রবি মিশ্রেীর বাড়ি সহ পঞ্চাশটি ভাড়া বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেঘরিয়ার ভাবতোষ ঘোষ, পরিতোষ ঘোষ, কালিন্দীর মান্দাইল হিন্দু পাড়ায়, আর বনগাঁও ঋষিপাড়ায় তিনশ বাড়ি ভেঙে লুট করে পুড়িয়ে ফেলেছে। সুরঞ্জন এসব কিছু দেখেছে, কিছু শুনেছে।
