–ভোলা থেকে কারা যাচ্ছে? হিন্দুরা তো?
–তা তো নিশ্চয়ই।
—তবে উল্লেখ করছেন না কেন? সুরঞ্জন চানাচুর খেতে খেতে বলে।
হিন্দু শব্দটি উল্লেখ করবার কোনও প্রয়োজন পড়ছে না। তারপরও সুরঞ্জনের ইচ্ছে যারা যাচ্ছে তারা যে হিন্দু, যাদের লুট হচ্ছে বাড়িঘর দোকানপাট, তারা যে ভোলা বা হবিগঞ্জের ‘মানুষ’ নয়, কেবল হিন্দু—এ কথাই রত্নাকে বোঝায়।
রত্না কী বোঝে কে জানে সে গভীর দুচোখ মেলে সুরঞ্জনের চোখে তাকায়। সে ভেবে এসেছিল, কোনও রকম রাখঢাক না করেই আজ সে কথা পড়বে। বলবে–আপনাকে আমার ভাল লাগে, বিয়ে-টিয়ে করতে চাইলে বলুন করে ফেলি।
রত্না জল আনতে ওঠে। ওর শাড়ির আঁচল সুরঞ্জনের বাঁ হাত ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ লেগে থাকে বাহুতে। আচ্ছা রত্না তো ইচ্ছে করলেই পারে বউ হতে তার, উড়নচণ্ডী জীবনটিকে একটি সংসারে স্থির করা উচিত এই জন্য যে তার বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে তা কিন্তু নয়। সারাদিন শুয়ে শুয়ে রত্নার আঙুল নিয়ে খেলা করা যাবে, খেলতে খেলতে ন্যাংটোকালের গল্প করতে করতে এমন হবে যে দুজনের মধ্যে না জানা কিছু, দেয়াল কিছু থাকবে না। সে আসলে ঠিক বউ হবে না তার, বন্ধু হবে।
রত্নার গভীর চোখদুটো কি চায়? সুরঞ্জন বিব্রত হয়। বলে ওঠে–দেখতে এসেছিলাম অক্ষত আছেন কি না?
–অক্ষত? অক্ষতার তো আবার দুরকম অর্থ, নারীর বেলায় এক, পুরুষের বেলায় আরেক। কোনটি দেখতে এসেছিলেন?
–দুটোই।
রত্না হেসে মাথা নীচু করে। সে হাসলে মুক্তে হয়ত ঝরে না, কিন্তু বেশ লাগে দেখতে। ওর মুখ থেকে চোখ সরতে চায় না সুরঞ্জনের। তার কি বয়স বেশি বেড়ে গেছে? এই বয়সের ছেলেদের কি খুব বুড়ো বুড়ো লাগে দেখতে? বিয়ের জন্য একেবারেই বেমানান? ভাবতে গিয়ে সুরঞ্জন লক্ষ্য করে রত্না তাকে দেখছে। দৃষ্টিতে মোহঘোর।
—আপনার সেই বিয়ে না করার সিদ্ধান্তটি এখনও আছে? রত্না হোসে জিজ্ঞেস করে।
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে সুরঞ্জন বলে—জীবন হচ্ছে নদীর মত জানেন তো? নদী কোথাও থেমে থাকে? সিদ্ধান্তও সব সময় অনড় থাকে না। বদলায়।
শুনে বাইরে হিন্দুর ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, আর এই চরম দুঃসময়ে রত্না হাসতে হাসতে বলে–বাঁচলাম।
সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করে না ‘বাঁচলাম’ অর্থ কী। সে বুঝে নেয়। রত্না তাকে আমল এক আনন্দ দিচ্ছে। তার ইচ্ছে করে রত্নার সরু সরু আঙুলগুলো খুঁয়ে বলে-চলুন আজ শালবন বিহার যাই। সবুজ ঘাসে সারারাত শুয়ে থাকি। চাঁদ আমাদের পাহারা দেবে। চাঁদকে আমরা তার জ্যোৎস্না লুকোতে বলব না। সুরঞ্জন সিঁড়ির কাছে গিয়েও ভাবে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা রত্নাকে সে বলবে–আমাদের অনড় সিদ্ধান্তগুলো পাল্টে চলুন কিছু একটা করে ফেলি দুজন।
সুরঞ্জনের বলা হয় না। রত্না দুসিঁড়ি নেমে বলে—আবার আসবেন। আপনি এলেন বলে মনে হল পাশে দাঁড়াবার কেউ একজন আছে। একেবারে একা হয়ে যাইনি।
সুরঞ্জন স্পষ্ট বুঝতে পারছে পারভিনের জন্য যেমন হত, ওই চঞ্চল চড়ুইটি তাকে যেমন সুখে ভাসিয়ে রাখত, তেমনই সুখ হচ্ছে তার।
লজ্জা (০৬) পত্রিকা হাতে নেয় সুরঞ্জন
৬ক.
সকালে চায়ের সঙ্গে পত্রিকা হাতে নেয় সুরঞ্জন। আজ মন ভাল তার। রাতেও ভাল ঘুম হয়েছে। পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে মায়াকে ডাকে সে।
—ফিরে তোর হয়েছে কি! এত মন খারাপ করে বসে থাকিস কেন?
—আমার আবার কী হবে। তুমিই তো ঝিম ধরেছ। একবারও বাবার কাছে বস না।
—আমার ওসব দেখতে ভাল লাগে না। সুস্থ সকল মানুষটি মড়ার মত বিছানায় পড়ে আছে দেখলে আমার রাগ ধরে। আর তোরা পাশে বসে মিউ মিউ করে। সারাক্ষণ কাঁদিস, এসব আরও ভাল লাগে না। আচ্ছা, মা টাকা রাখেনি কেন? খুব টাকা বুঝি তাঁর?
–মা গয়না বিক্রি করেছে।
—এ কাজটা অবশ্য ভাল করেছে। গয়না-টয়না। আমি একদম পছন্দ করি না।
—পছন্দ কর না। পারভিন আপকে তো ঠিকই মুক্তোবসানো আংটি দিয়েছিলে?
—তখন কাঁচা বয়স ছিল, মনে রঙ ছিল, এত বুদ্ধি হয়নি তো, তাই।
—এখন বুঝি খুব পেকেছ? মায়া হেসে বলে।
মায়ার মুখে কতদিন পর হাসি দেখল সুরঞ্জন। হাসিটিকে আরও কিছুক্ষণ দেখবে বলে সে পত্রিকার প্রথম পাতার খবরটি দেখায়। বলে-দেখেছিস, নগরীতে শান্তি মিছিল হয়েছে, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা আছি বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়াও—সর্বদলীয় শান্তি মিছিলের দৃপ্ত ঘোষণা। যে কোনও মূল্যে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও লুটেরাদের প্রতিরোধ করার আহ্বান। ভারতে সহিংসতা স্তিমিত। উত্তরপ্রদেশ সরকারের মসজিদের জমি দখলকে হাইকোর্টে অবৈধ ঘোষণা। নরসিমা রাও বলেছেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্য কেন্দ্র নয়, উত্তরপ্রদেশ সরকারই দায়ী। পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে এখনও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের জেহাদ ঘোষণা। আজ পল্টন মোড়ে সি পি বি-র সমাবেশ আছে। আওয়ামি লিগ বলেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শান্তি ব্রিগেড গঠন করতে হবে। নগর সমন্বয় কমিটি বলেছে দাঙ্গা বাঁধানোর দায়ে নিজামি কাদের মোল্লাদের গ্রেফতার করুন। নির্মূল কমিটিরও সমাবেশ আজ। টঙ্গীতে সর্বদলীয় শান্তি মিছিল। সাংস্কৃতিক জোটের শ্লোগোন-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজাদের রুখবে এবার বাংলাদেশ। পনেরো জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি সাম্প্রদায়িক সম্প্ৰীতি সবার নাগরিক দায়িত্ব। কর্নেল আকবর বলেছেন ফ্যাসিবাদী শক্তি জামাতকে নিষিদ্ধ করতে হবে। বরিশালে সম্মিলিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা পরিষদ গঠিত। ঢাকা ভার্সিটির শিক্ষক সমিতি সাম্প্রদায়িক সমিতি বিনষ্ট হলে বিজয়ের মাসের পবিত্ৰতা নষ্ট হবে বলেছেন। ধামরাইয়ে মন্দির ভাঙার অভিযোগে আঠাশ জন গ্রেফতার। জ্যোতি বসুর অনুশোচনা ভারতের মুখ দেখাবার জায়গা নেই। –কেবল ভাল খবরগুলো পড়ে গেলে? মায়া বিছানায় পা তুলে আসন করে বসে। পত্রিকাটি টেনে নিয়ে সে বলে—আর বাকি খবরগুলো? ভোলার দশ হাজার পরিবার গৃহহারা। চট্টগ্রামে সাতশ বাড়ি ভস্মীভূত। কিশোরগঞ্জে মন্দির ভাঙচুর। পিরোজপুরে একশ চুয়াল্লিশ ধারা। সীতাকুণ্ড মিরসরাই-এ সাতশ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
