বিকেলে-টিকেলে কিরণময়ী উদাস বসে থাকলে সুধাময় বলেন-চুলে তোমার জট। পড়েছে কিরণ, এস ছাড়িয়ে দিই। আজ বিকেলে রমনা ভবনে গিয়ে ভাল দুটো শাড়ি কিনে এন। ঘরে পরিবার শাড়ি তোমার নেই-ই তেমন। টাকা থাকলে তোমার নামে বড় একটি বাড়ি বানিয়ে দিতাম কিরণ। তুমি বাড়ির উঠোনে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে। বাড়ি ভরে ফল ফলাস্তির গাছ লাগাতে। মৌসুমের সবজি লাগাতে, ফুলগাছ লাগাতে। শিমগাছে শিম, লাউয়ের মাচায় লাউ, জানালার ধার ঘেষে হাসনুহেনা, আসলে তোমাকে ব্ৰাহ্মাপল্লীর বাড়িতেই মানাত বেশি। কিন্তু আমার সমস্যাটা কি জানো তো, টাকার লাইনের দিকে আমি মোটে গেলামই না। চাইলে যে টাকা করা যেত না তা নয়। বাড়ি বিত্ত দেখে তোমার বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন, সেই বাড়িও আর নেই, বিত্তও নেই। অনেকটা হ্যান্ড টু মাউথ অবস্থা। এ নিয়ে আমার কোনও দুঃখ নেই। তোমার বোধহয় কষ্ট-টষ্ট হয় কিরণ।
কিরণময়ী বুঝতে পারতেন এই সরল সোজা, নিরীহ ভালমানুষটি তাঁকে ভালবাসেন বড়। কোনও ভালমানুষকে ভালবেসে জীবনের ছোটখাট সুখ যদি ত্যাগ করা যায়, অথবা ছোটখাট নয়, বড় কোনও স্বার্থও, তবে ক্ষতি কী। কিরুণময়ী তাঁর আঠাশ বছর বয়স থেকে এক অতৃপ্তি পুষছেন শরীরে, কিন্তু মনের ভেতর যে গোঙরায় এক সমুদ্র ভালবাসার জল, এই জল তাঁর শরীরের অসুখগুলো, ব্যথা ও বেদনাগুলো ধুয়ে দেয় বার বার।
সুরঞ্জন টাকা দিয়েছে। সম্ভবত ধার করে। উপার্জন করে না বলে এক ধরনের হীনমন্যতায় বোধহয় ভোগে ও। কিন্তু দেওয়ালে এখনও পিঠ ঠেকে যায়নি। কিরণময়ীর। এখনও চালিয়ে নেবার মত কিছু টাকা আছে হাতে, সুধাময় কখনও নিজের কাছে একটি পয়সা রাখেননি, উপার্জনের সবটুকুই কিরণের হাতে তুলে দিতেন। তা ছাড়া এখনও সোনাদানও কিছু অবশিষ্ট আছে। তিনি মায়ার হাত দিয়ে সুরঞ্জনের টাকা কটি ফেরত পাঠান। ফেরত পাঠানোয় ও যে কষ্ট পাবে ভাবেননি কিরণময়ী। আচমকা ঘরে ঢুকেই সুরঞ্জন বলে-ভেবেছ চুরি-ডাকাতি করে টাকা এনেছি? নাকি বেকারের টাকা নিতে লজ্জা হয়? কিছুই হয়ত করতে পারি না। কিন্তু করতে তো ইচ্ছে করে আমার। এ কথা কি বোঝা উচিত ছিল না কারও?
নিথর বসেছিলেন কিরণময়ী। কথাগুলো বেঁধে তাঁর বুকে।
৫গ.
রত্নার বাড়িতে কড়া নাড়ে সুরঞ্জন। রত্নাই দরজা খোলে। দেখে খুব চমকায় না। সে। যেন সুরঞ্জনের আসবার কথাই ছিল। সোজা তাকে শোবার ঘরে নিয়ে যায়। যেন কতকালের আত্মীয় সে। এক প্যাঁচে সুতি শাড়ি পড়েছে রত্না। কপালে লাল একটি টিপ হলে চমৎকার মানাত। আর যদি সিঁথিতে সিঁদুরের দাগ থাকত অল্প। সুরঞ্জন কুসংস্কার মানে না, কিন্তু শাঁখা সিঁদুরের, উলুধ্বনির, শাঁখ বাজানোর বাঙালিয়ানা তাকে মুগ্ধই করে। বাড়িতে তাদের পুজো-আচ্চা একেবারেই নিষেধ ছিল, কিন্তু দল বেধে পুজো দেখতে যাওয়া, আরতিতে শখের নাচা, পুজো মণ্ডপের গানে তাল দেওয়া, দু-চারটে নাডু টাডু খাওয়া এসবে সে আপত্তি করেনি।
রত্না তাকে বসিয়ে রেখে চা করতে গেছে। কেমন আছেন ছাড়া একটি বাক্যও সে বলেনি। সুরঞ্জনও বলেনি। কথা খুঁজে পায়নি সে। সে ভালবাসতে এসেছে। ইঞ্জি করা একটি শার্ট পরে, অনেকদিন পর শেভ করে, স্নান করে, গায়ে একটু সুগন্ধি লাগিয়ে এসেছে। বুড়ো বাবা মা, বড় ভাই আর রত্না, এই নিয়ে সংসার। ভাই-এর বউ ছেলে মেয়ে আছে। ছেলে মেয়েগুলো ঘুরঘুর করছে, নতুন মানুষটি কে, কি চায় এখানে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর তারা পায় না বলে দরজা থেকে তারা খুব দূরেও যায় না। সুরঞ্জন একটি সাত বছরের মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করে নাম কি?
মেয়েটি ঝটপট উত্তর দেয়–মৃত্তিকা।
—বাহ, সুন্দর নাম তো। কী হয় রত্না তোমার?
—পিসি।
–ও।
—তুমি বুঝি পিসির অফিসে চাকরি কর?
–না। আমি কোনও চাকরি টাকরি করিনা। ঘুরে বেড়াই।
ঘুরে বেড়াই বাক্যটি মৃত্তিকার পছন্দ হয়। সে আরও কিছু কথা বলতে যাবে এমন সময় রত্না ঢেকে ঘরে, হাতে ট্র, ট্রেতে চা বিস্কুট, চানাচুর, দুরকম মিষ্টি।
—কি ব্যাপার হিন্দুদের ঘরে আজকাল তো খাবার থাকার কথা নয়। তারা ঘরের বাইরে যেতে পারছে না। আর এখানে তো দিব্যি দোকান খুলে বসা হয়েছে। তা সিলেট থেকে এলেন কবে?
—সিলেটে না। গিয়েছিলাম হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভিবাজার। আমার চোখের সামনে হবিগঞ্জের মাধবপুর বাজারে তিনটে মন্দির ভেঙে ফেলেছে।
-কার ভেঙেছে?
-টুপি দাড়িঅলা মুসল্লিরা। এরপর বাজারের কালী মন্দির ভেঙে ফেলেছে। আমার আত্মীয় হন তপন দাশগুপ্ত, ডাক্তার, তার চেম্বারও লুট করে ভেঙে দিয়েছে। সুনামগঞ্জে দুটো মন্দির ভেঙে ফেলল। আট তারিখে। নয় তারিখে চারটে মন্দির, পঞ্চাশটা দোকান, ভেঙে লুট করে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। মৌলভিবাজারের রাজনগর ও কুলাউড়ায় ছটা মন্দির আর আখড়া ভেঙে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ব্ৰাহ্মণবাজারের সাতটি দোকানও লুট করেছে।
–নিশ্চয় হিন্দুর দোকান!
রত্না হেসে বলে-তো আর বলতে।
চাচানাচুর এগিয়ে দিয়ে রত্না বলে-বলুন তো, এ দেশে কি আর থাকা যাবে?
—কোন যাবে না? এ দেশ কি মুসলমানের বাপের সম্পত্তি?
রত্না হাসে। হাসিতে বিষগ্নতা খেলা করে। বলে-ভোলায় নাকি টিপসই দিয়ে জায়গা বেচে চলে যাচ্ছে মানুষ। কেউ টাকা পয়সা পাচ্ছে সামান্য, কেউ পাচ্ছে না।
