-আজ কোনও মন্দ খবর শুনতে চাই না। আজ আমার মন ভাল।
–কেন পারভিন আপা ডিভোর্স দিচ্ছে বলে? এসেছিল কাল, বলল স্বামী নাকি তাকে প্রতি রাতে পেটায়।
—এখন কেন? মুসলমানকে বিয়ে করলেই নাকি অপার শান্তি? নারে পারভিন না। আমার মন মজেছে অন্য কোথাও। এবার আর মুসলমান নয়, যেন বিয়ের আগে কাঁদো কাঁদো গলায় না বলতে পারে, তুমি ধর্ম পাল্টাও।
মায়া হেসে ওঠে। অনেকদিন পর মায়া হাসছে।
সুরঞ্জন হঠাৎ গভীর হয়ে বলে–বাবার অবস্থা এখন কেমন? ভাল হয়ে উঠবেন না শিগরি?
—আগের চেয়ে ভাল এখন। ভাল কথা বলতে পারছেন। ধরে ধরে বাথরুমে নিচ্ছি। নরম খাবারও খেতে পারছেন। ও শোনো, কাল সন্ধ্যায় বেলাল ভাই এসেছিলেন। তোমার খোঁজে। বাবাকে দেখে গেলেন। বললেন তুমি যেন বাইরে না বেরোও। বাইরে বের হওয়া এখন রিস্কি।
–ও।
সুরঞ্জন হঠাৎ এক লাফে দাঁড়িয়ে যায়। মায়া বলে–কি ব্যাপার কোথাও যাচ্ছ মনে হয়?
–আমি কি ঘরে বসে থাকার ছেলে?
—তুমি বাইরে গেলে মা যে কি দুশ্চিন্তা করেন। দাদা, তুমি যেও না। আমারও খুব ভয় ভয় লাগে।
—পুলককে টাকাটা ফেরত দিতে হবে। তোর কাছে কিছু টাকা হবে নাকি? তুই তো আবার রোজগোরে মেয়ে। দে না তোর ফান্ড থেকে সিগারেট কেনার টাকা?
—উহু, সিগারেট কেনার টাকা আমি দেব না। তুমি খুব শিগরি মরে যাও এ আমি চাই না।
মায়া বলে কিন্তু দাদার জন্য ঠিকই একটি একশ টাকার নোট এনে দেয়। ছোটবেলায় এই মায়া একবার কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল। তাকে স্কুলের মেয়েরা ক্ষেপাত ‘হিন্দু হিন্দু তুলসীপাতা, হিন্দুরা খায় গরুর মাথা।’ মায়া বাড়ি ফিরে কেঁদেকেটে সুরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করেছিল—আমি নাকি হিন্দু। আমি কি হিন্দু দাদা?
–হ্যাঁ। সুরঞ্জন বলেছিল।
–আমি আর হিন্দু হব না। হিন্দু বলে ওরা আমাকে ক্ষেপায়।
সুধাময় শুনে বলেছিলেন–তুমি হিন্দু কে বলল? তুমি হচ্ছে মানুষ। মানুষের চেয়ে বড় কিছু জগতে নেই। সুধাময়ের প্রতি শ্ৰদ্ধায় নুয়ে আসে সুরঞ্জনের প্রাণ। সে এত মানুষ দেখেছে, সুধাময়ের মত আদর্শবান, যুক্তি বুদ্ধি বিবেকসম্পন্ন মানুষ সে খুব কমই দেখেছে। ঈশ্বর যদি সে কাউকে মানে, সুধাময়কেই মানবে। এত উদারতা, সহনশীলতা, যুক্তিবাদী মানুষ সংসারে ক’জন হয়?
৬খ.
চৌষট্টিতে সুধাময় শ্লোগান দিয়েছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। সেদিনের সেই দাঙ্গা বাড়তে পারেনি। শেখ মুজিব এসে থামিয়েছিলেন। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন যেন বাড়তে না পারে, সে কারণেই দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল সরকার নিজে। সরকার-বিরোধী আন্দোলনের জন্য সরকার ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করল। সুধাময় ছিলেন মামলার একজন আসামী। সুধাময় অতীত নিয়ে ভাবতে চান না। তবু অতীত এসে মনের ওপর নগ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দেশ দেশ করে কী হয়েছে দেশের? কতটুকু কল্যাণ? পাঁচাত্তরের পর থেকে দেশটি মৌলবাদীদের মুঠোর মধ্যে চলে যাচ্ছে। সব জেনে বুঝেও মানুষগুলো নিস্পন্দ, স্থির। এই প্রজন্ম কি চেতনাহীন? এদের রক্তে কি সেই রক্ত বইছে না, বাহাম্নোয় রাষ্ট্রভাষা করবার দাবিতে যে রক্ত ঝরেছে রাস্তায়, উনসত্তরের গণঅভু্যুত্থানের রক্ত, একাত্তরের ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত? সেই উত্তাপ কোথায়? যে উত্তাপ উত্তেজনায় সুধাময় ঝাঁপিয়ে পড়তেন আন্দোলনে? কোথায় টগবগে যুবকেরা এখন? কেন এরা আজ সাপের মত শীতল? কোন ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশে মৌলবাদ খুঁটি গাড়ছে? কেউ কি বুঝতে পারছে না কি ভীষণ দুযোগের দিন আসছে? সুধাময় সমস্ত শক্তি খরচ করে বিছানা থেকে উঠতে চান। পারেন না। মুখ তাঁর বেদনায়, অক্ষমতায়, আক্ৰোশে নীল হয়ে ওঠে।
আইয়ুব খানের শত্ৰু সম্পত্তি আইন আওয়ামি লিগের আইন মন্ত্রী আবার বহাল করলেন সংসদে। অবশ্য নাম পাল্টে। তিনি নাম রাখলেন ‘অৰ্পিত সম্পত্তি আইন। দেশ ছেড়ে হে হিন্দুল্লা চলে গেছে, তাদের সম্পত্তিকে বলা হত শক্রির সম্পত্তি। সুধাময়ের কাক, জাঠা, মামারা কি দেশের শত্রু ছিল? এই ঢাকা শহরে জ্যাঠা মামাদের বড় বড় বাড়িঘর ছিল, সোনারগাঁয়ে ছিল, নরসিংদি, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুরে ছিল, এগুলো কোনওটি কলেজ হয়েছে, কোনওটি হয়েছে পশু হাসপাতাল, পরিবার পরিকল্পনা অফিস, আয়কর রেজিস্ট্রি অফিস। অনিল কাকার বাড়িতে ছোটবেলায় আসতেন। সুধাময়। রামকৃষ্ণ রোডের মন্ত বন্ড বাড়িটিতে দশটি ঘোড়া ছিল, অনিল কাকা তাকে ঘোড়ায় চড়াতেন। সুধাময় দত্ত এখন টিকাটুলির একটি অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে বাড়িতে দিন কাটান, অথচ কাছেই নিজের ককার বাড়ি এখন সরকারের নামে। অৰ্পিত সম্পত্তি আইন বদল হয়ে সম্পত্তি উত্তরাধিকার অথবা সগোত্রে অর্পিত হলে অনেক হিন্দুর দুর্দশা ঘুচত। সুধাময় এই প্রস্তাবটি অনেক হোমরাচোমরা ব্যক্তিকে করেছিলেন, কাজ হয়নি। তিনি তাঁর অচল। অথর্ব। জীবনে আজকাল ক্লান্তি বোধ করেন। বেঁচে থাকবার কোনও অর্থ খুঁজে পান না। জানেন, এই বিছানায় এখন নিঃশব্দে মরে গেলে কারও কোনও ক্ষতি হবে না। বরং নিরস্তুর রাত্রি জাগরণ আর সেবাশুশ্ৰুষার দায়িত্ব থেকে বাঁচবে কিরণময়ী। ‘
১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের বিশেষ পরিবেশে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে শক্ৰ সম্পত্তি আইন হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে সুকৌশলে সেই আইনের টিকে থাকা দেখে অবাক হন সুধাময়। স্বাধীন একটি দেশের জন্য, বাঙালি জাতির জন্য এ কলঙ্কের ঘটনা নয়? এই আইন দু কোটি মানুষের মৌলিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করেছে, শাসনতন্ত্রের সমঅধিকার আর সামাজিক সাম্য নীতির পরিপহী এ আইন বহাল রেখে দু কোটি মানুষকে তাদের ভিটে বািড় থেকে উচ্ছেদ করে অসহায় সৰ্ব্বনাশা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই কারণে হিন্দুদের মধ্যে যদি চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, এ দোষ কি হিন্দুদের? সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ হচ্ছে সমাজের গভীর মাটিতে। বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমনিরাপত্তা ও সমঅধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা হলেও সরকার অর্পিত (শত্রু) সম্পত্তি আইন বহাল রেখে শাসনতন্ত্রের বিধান লঙ্ঘন করে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা দেখাচ্ছে। অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের মৌলিক অধিকার এই ধারার কথা বলে—
