মা কি দিল। এই প্রশ্ন করুবার আগে মায়া চলে যায়। সুরঞ্জন খাম খুলে দেখে গত রাতের দু হাজার টাকা। অপমানে লাল হয়ে ওঠে সুরঞ্জনের মুখ। এ কি কিরণময়ীর অহঙ্কার? নাকি তিনি ভেবেছেন বেকার ছেলে চুরি ডাকাতি করে টাকা এনেছে? অভিমানে লজ্জায় সুরঞ্জনের আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। বিরূপাক্ষর সঙ্গেও না।
৫খ.
কিরণময়ীর বাবা ছিলেন ব্ৰাহ্মণবাড়িয়ার নামকরা লোক। বড় উকিল। অখিল চন্দ্ৰ বসু। ষোল বছরের মেয়েকে ডাক্তার ছেলের কাছে বিয়ে দিয়ে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের আশা ছিল মেয়ে জামাইও বুঝি চলে আসবে একসময়। কিরণময়ীও ভেবেছিলেন এক এক করে বাপ মা জ্যাঠা কাকা পিসি মাসি মামা প্রায় সবাই যখন চলে গেছেন, তিনিও বোধহয় যাবেন। কিন্তু এ এক অদ্ভুত ফ্যামিলিতে এসে পড়েছেন তিনি, শ্বশুর শাশুড়ির কাছে ছিলেন ছ’ বছর, ছ’বছরে তাঁরা আত্মীয়স্বজন পাড়া-পড়শিকে চোখের সামনে পাততাড়ি গুটোতে দেখেছেন, তবু ভুলেও কখনও দেশত্যাগের নাম করেননি। কিরণময়ী লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতেন। কলকাতা থেকে বাবার চিঠি আসন্ত-মা কিরণ, তোমরা কি আসিবে না ঠিক করিলে? সুন্ধাময়কে আরও ভাবিতে বল। দেশ ছাড়িয়া আসিতে তো আমাদেরও ইচ্ছা করেনি। কিন্তু আসিতে বাধ্য হইয়াছি। এইখানে আসিয়া খুব যে ভাল আছি তাহা নহে। দেশের জন্য মন কেমন করে। তবু বাস্তবকে তো মানিয়া লইতেই হয়। তোমাদের জন্য চিন্তা হয়। ইতি তোমার বাবা।’ এইসব চিঠি কিরণময়ী কত যে পড়তেন, চোখের জল মুছতেন, রাতে রাতে। সুধাময়কে বলতেন—’তোমার আত্মীয়রা অনেকেই নেই। আমার আত্মীয়রাও চলে গেছে। এখানে থেকে রোগে শোকে মুখ জল দেবার লোক পাব না।’ সুধাময় বিদ্যুপের হাসি হেসে বলতেন-‘জলের এত কাঙালি তুমি। তোমাকে পুরো ব্ৰহ্মপুত্রই দিয়ে দেব। কত জল খেতে পারো দেখব। আন্ধীয়রা কি ব্ৰহ্মপুত্রের চেয়ে বেশি জল ধারণ করে দু’ দেশ ছেড়ে যাবার কথা শ্বশুর নয়, স্বামী নয়, এমনকি পেটের ছেলে সুরঞ্জন, সেও মনোনি কোনও দিন। কিরুণাময়ীকে অগত্যা এই সংসারের স্বাভাবি চরিত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে হয়েছে। তাল মেলাতে গিয়ে কিরণময়ী অবাক হন সংসারের সুখ দুঃখে, সম্পদে দারিদ্রে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন সুধাময়ের চেয়ে বেশি।
কিরণময়ী তাঁর হাতের দুটো বালা বিক্রি করেছেন। হরিপদ ডাক্তারের স্ত্রীর কাছে। বাড়ির কাউকে তিনি জানতে দেননি ঘটনাটি। এসব জানাবারুই বা কি আছে। সোনাদানা তো এমন মূল্যবান কিছু নয় যে প্রয়োজনে বিক্রি করা যাবে না। সুধাময়ের সুস্থ হয়ে ওঠাই এ মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরি। মানুষটির প্রতি কোথেকে যে এত ভালবাসা জন্মায়, কিরণময়ী বুঝতে পারেন না। সেই একাত্তরের পর থেকে সুখময়কে তাঁর গভীর করে পণ্ডিয়া হয় না। মাঝে মধ্যে সুধাময় বলেন—কিরণময়ী, আমি বোধহয় তোমাকে ঠকালাম খুব, তাই না?
কিরণময়ী বোঝেন কিসের ঠিকার কথা বলেন সুধাময়। তিনি চুপ করে থাকেন। কিছু যে বলবেন তিনি, তিনি যে বলকেন-না, আমি আবার ঠিকাছি কোথায়? বলা হয় না। তাঁর। বলবার কোনও কথা তিনি খুঁজে পান না। সুধাময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন-তুমি কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে কিরণ? আমার বড় ভয় হয়।
কিরণময়ী কখনও সুন্ধাময়কে ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে পারেন না। মানুষের কি ওই একটি সম্পর্কই প্রধান? আর তুচ্ছ সব? তুচ্ছ তবে পিঁয়ত্ৰিশ বছর একঘরের জীকন? এত সহজেই স্নান হয়ে যেতে পারে দীর্ঘ আনন্দ-বেদনার সংসারযাপন? না, কিরণময়ী ভাবেন-জীবন মানুষের একটাই। এই জীকন তো আর ঘুরে ফিরে বার বার আসবে না। জীবনে না হয় মেনেই নিলাম কিছুটা দুঃসহবাস। একাত্তর থেকে সুধাময় যৌন জীবন যাপনে অক্ষম একজন মানুষ। এ নিয়ে কিরণময়ীর কাছে তাঁর লজ্জার অন্ত ছিল না। তিনি প্রায়ই গভীর রাতে ফিসফিস করে তাঁকে ডেকে তুলে বলতেন—তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে কিরণ?
—কি কষ্ট? কিরণময়ী বুঝেও বোঝেননি ভাব করতেন।
সুধাময়ের অস্বক্তি হত বলতে। তিনি অক্ষমতার যন্ত্রণায় বালিশে মুখ খুঁজতেন। আর কিরণময়ী দেয়ালের দিকে ফিরে নিঝুম রাত পার করতেন। মাঝে মধ্যে সুধাময় বলতেন—’তুমি যদি ইচ্ছে কর, না হয় নতুন করে সংসার পাতো, আমি কিছু মনে করব না।‘
কিরণময়ীর শরীরে কোনও তৃষ্ণা ছিল না। এ কথা সত্য নয়। ছিল, সুধাময়ের বন্ধুরা যখন আসতেন, সামনে বসে গল্প করতেন, ওঁদের ছায়া পড়ত তাঁর কোলে, কিরণময়ী প্রায়ই তাঁর কোলের ছায়ার দিকে আড়াচোখে তাকতেন। তাঁর হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছেও হত কোলের ছায়াটি যদি সত্যি হত, যদি ছায়াটির মানুষ একবার মাথা রাখত কোলে। শরীরের তৃষ্ণাটি খুব বেশি বছর ভোগায়নি তাঁকে। সংযমে সংযমে পার হয়ে গেছে। বয়স কি থেমে থাকে! একুশ বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। কিরুণাময়ী এর মধ্যে এও ভেবেছেন সুখময়কে ছেড়ে যার কাছে যাকেন সেও যদি এমন অক্ষম পুরুষ হয়। অথবা অক্ষম না হোক, যদি এত হৃদয়বান না হয় সুধাময়ের মত!
কিরণময়ী মাঝে মধ্যেই ভাবেন সুধাময় বুঝি তাঁকে ভালবাসেন খুব। সঙ্গে ছাড়া খেতে বসেন না, মাছের বড় টুকরোটি নিজের পাত থেকে কিরণময়ীর পাতে তুলে দেন। বাড়িতে কাজের লোক না থাকলে বলেন-বাসন মাজ-টাজ কিছু থাকলে বল, আমি বেশ ভাল বাসন মাজতে পারি।
