সুরঞ্জন সিগারেট ধরায়। বিরূপক্ষের আলোচনায় সে অংশ নিতে চায় না। তবু সে লক্ষ করে অল্প অল্প জড়িয়ে যাচ্ছে ঘটনায়। সিগারেট ঠোঁটে চেপে সে বলে-পিয়লা এপ্রিল স্বপন চন্দ্ৰ ঘোষের নিউ জলখাবারে সাত-আটজন লোক পিস্তল দেখিয়ে দশ হাজার টাকা চাঁদা চায়। চাঁদা না পেয়ে দোকানের কর্মচারীদের পেটাতে শুরু করে। পিটিয়ে ক্যাশ ভেঙে বিশ হাজার টাকা নিয়ে যায়। অবশ্য এসব ঘটনা মুসলমানদের দোকানেও ঘটছে। চাঁদাবাজাদের অত্যাচার দিন দিন বাড়ছে। তারপর ধর সিদ্দিক বাজারের মানিক লাল থুপীর নিজস্ব সম্পত্তির অর্ধেক অংশ এলাকার সাহাবুদ্দিন, সিরাজ, পারভেজ, সালাউদ্দিন এরা জোর করে দখল করে নিয়েছে। এখন তারা মানিক লালের পুরো সম্পত্তি নিয়ে নেবার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সুরঞ্জন কিছুক্ষণ থেমে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে—ধান কেটে নেওয়া, মেয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া, রেপ করা, জমি দখল, মেরে ফেলার হুমকি, পিটিয়ে বাড়ি ছাড়া করা, দেশ ছাড়া করা এসব কি আর এদিক সেদিক উদাহরণ দিয়ে হবে! এ তো সারা দেশ জুড়ে হচ্ছে। আমরা আর কটা অত্যাচারের খবর রাখি, দেশত্যাগের খবর আর কটা রাখি, বল।
—নোয়াখালির সেনাবাগে কৃষ্ণলাল দাসের বউ স্বর্ণবালা দাসকে আবুল কালাম মুলি, আবুল কাশেম সহ কয়েকজন কিডন্যাপ করে, রেপ করে, তারপর অজ্ঞান অবস্থায় বাড়ির পাশের ধানক্ষেতে ফেলে রেখে যায়। বিরূপাক্ষ বলে।
সুরঞ্জন বিছানা ছেড়ে কালতলায় যায়। মুখ ধুতে গিয়ে কিরণময়ীকে দুটো চায়ের কথা বলে। কাল রাতে কিরণময়ীর হাতে সে দু হাজার টাকা দিয়েছে। সুতরাং ছেলে যে একেবারই দায়িত্বজ্ঞানহীন এ কথা নিশ্চয়ই বলবেন না। তিনি। কিরণময়ীকে অন্য দিনের তুলনায় ফ্রেশ লাগছে। সম্ভবত অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা ঘুচেছে বলে। বিরূপাক্ষ শুকনো মুখে চেয়ারে বসেছিল। সুরঞ্জন ঘুরে ঢুকেই বলে–চিয়ার আপ, চিয়ার আপ।
বিরূপাক্ষ ম্লান হাসে। সুরঞ্জনেরও আজ অনেকটা তাজা লাগছে হাত পা। সুধাময়ের ঘরে একবার টু দিয়ে আসবার কথা ভাবে সে। এর মধ্যেই চা চলে আসে। মায়া নিয়ে আসে দু কাপ চা ৷
–কিরে তুই এ ক’দিনে বেশ শুকিয়ে গেছিস মনে হচ্ছে। পারুলের বাড়িতে খাওয়া-টাওয়া দেয়নি বুঝি? মায়া কোনও উত্তর না দিয়ে চলে যায়। সুরঞ্জনের এই রসিকত্ৰা সে গায়ে মাখে না। সুধাময় অসুস্থ। এ সময় এমন হাস্যরস করা বোধহয় উচিত হয়নি সুরঞ্জনের। মায়ার নীরবতা তাকে খানিকটা ভাবায়।
এই ভাবনা থেকে বিরূপাক্ষ তাকে সরিয়ে আনে। সে চা পান করতে করতে বলে—সুরঞ্জনদা, আপনি তো ধর্ম মানেন না। পুজো করেন না, গরুর মাংস খান, মুসলমানদের বলুন আপনি সত্যিকার হিন্দু নন, অর্ধেক মুসলমান।
—আমি যে সত্যিকার মানুষ, ওদের আপত্তি তো ওখানেই। উগ্ৰ মৌলবাদী হিন্দু আর মুসলমানে কোনও বিরোধ নেই। এখানকার জামাত নেতার সঙ্গে ভারতের বি জে পি নেতাঙ্গের বন্ধুত্ব দেখছ না? দুই দেশে দুই মৌলবাদী দল ক্ষমতাবান হতে চাইছে। ভারতের দাঙ্গার জন্য দায়ী বি জে পি নয়, দায়ী কংগ্রেস এ কথা তো বায়তুল মোকাররমের সভায় নিজামি নিজেই বলেছে।
—ভারতের দাঙ্গায় এক হাজার লোক নিহত হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, আর এস এস, বজরঙ্গ, জামায়াত, ইসলামি সেবক সংঘ দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এদিকে সিলেটে হরতাল হচ্ছে, পিরোজপুরে একশ চুয়াল্লিশ ধারা, ভোলায় কার্ফু, তা ছাড়া টুকরো টুকরো শান্তি মিছিল তো হচ্ছেই। মিছিলে শ্লোগান উঠছে ‘নিজামি আদভানি ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই।’ আজ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সর্বদলীয় শান্তি সভা। ব্রিটেনের মন্দিরে ও নাকি হামলা হয়েছে। তোফায়েল আহমেদ ভোলা ঘুরে এসে বলেছেন ভোলায় বি ডি আর পাঠানো দরকার। এলাকার অবস্থা খারাপ।
–কেন, পুড়ে সব ছাই হয়ে গেলে বি ডি আর গিয়ে কি করবে ওখানে? ছাই-এর গাদা জমাবো? কোথায় ছিলেন তোফায়েল ছয় তারিখ রাতে? সে রাতেই তিনি কেন প্রটেকশনের ব্যবস্থা করলেন না?
সুরঞ্জন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলে–আওয়ামি লিগকে ধোয়া তুলসীপাতা ভেব না।
–এরকম কি হতে পারে, এই সরকারের ওপর দোষ পড়ার জন্য আওয়ামি লিগও দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেনি?
-জানি না। হতে পারে। তবে সবার হচ্ছে ভোটের প্রয়োজন। এই দেশে চলে ভোটের রাজনীতি, এখানে আদর্শ ফাদর্শের ধার কেউ ধারে না, ছলে-বলে-কৌশলে ভোট পেলেই হল। আওয়ামি লিগ তো ভেবেছে হিন্দুর ভোট তারা পাবেই। কী যেন বলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক না কি। কোথাও কোথাও নাকি ওরাই লুটপাট করেছে।
–কোথাও এমনও হয়েছে, যেসব এলাকা থেকে আওয়ামি লিগ ভোটে জেতে, সেসব এলাকার বি এন পি-র লোকেরা হিন্দু বাড়ি লুট করে মন্দির ভেঙে-পুড়িয়ে বলছে যাদের ভোট দাও, তারা কোথায় এখন? একইরকম বি এন পি যেখানে জেতে, আওয়ামি লিগ করেছে। ভোলায় করেছে বি এন পি-র লোকেরা, এদিকে আবার মহেশখালি, ঘিওর, মানিকগঞ্জে করেছে আওয়ামি লিগের লোক।
—রাজনীতির ব্যাপার তো আছেই। কিন্তু মৌলবাদীদের বাদ দিয়ে কিছু হয়নি। আচ্ছা, আজ নাকি অভিন্ন সম্পাদকীয় বের হয়েছে প্ৰায় সব পত্রিকায়? সাম্প্রদায়িক সম্প্ৰীতি রক্ষার আবেদন আছে নাকি ওতে?
–আপনি কি পত্রিকা পড়েন না?
—ইচ্ছে করে না। এ সময় মায়া ঢেকে ঘরে। একটি খাম রাখে টেবিলে, বলে—মা দিয়ে দিল, বলল লাগবে না!
