পুলক দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুরঞ্জন দরজার দিকে এগোয়। কিরণময়ী একবার বলেছিল ময়মনসিংহে রইসউদ্দিনের কাছে একবার যেতে, এত অল্প টাকায় বাড়িটি নিয়েছেন, তিনি যদি এ সময় কিছু সাহায্য করেন। সুরঞ্জন টাকা ধার চায় না কারও কাছে। মুন্দির দোকানে বাকি পড়ে, মাস শেষে দিয়ে দেয়। পুলকের কাছে সে সহজে চাইতে পেরেছে। সম্ভবত একসময় তাকে দিয়েছে সে, সে কারণে, এও হতে পারে পুলক হিন্দু ছেলে, সে যত বুঝবে সংখ্যালঘুর কষ্ট, তত আর কেউ বুঝবে না। অন্যদের কাছে চাইলে হয়ত দেবে কিন্তু মন থেকে দেবে না। সুরঞ্জন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার সে কেনিও মুসলমানের কাছে হাত পাতবে না। বাড়ি থেকে তাকে কোনও দায়িত্ব দিচ্ছে না কেউ। ভাবছে দেশপ্রেমিক ছেলে, দেশের মঙ্গল চিন্তায় দিনরাত খেয়ে না খেয়ে জীবন পার করছে, একে খামোক বিরক্ত করে কী লাভ। টাকা কটি সে কিরণময়ীর হাতে দেবে। কী করে যে সংসারের হাল ধরে আছে মানুষটি, কারও প্রতি তার কোনও অভিযোগ নেই। অকৰ্মণ্য ছেলেটির প্রতিও। এত যে দারিদ্র গেছে, তিনি কোনও দিন বিরক্ত হননি।
পুলকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে হনহন হাঁটতে থাকে টিকাটুলির দিকে। তার হঠাৎ মনে হয় কী লাভ মানুষের বেঁচে থেকে। এই যে সুধাময় বেঁচে আছেন ধুঁকে ধুঁকে, তাঁকে অন্যরা পেচ্ছাব পায়খানা করাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে দাওয়াচ্ছে, কী লাভ তার এরকম বেঁচে থেকে? সুরঞ্জনই বা কেন বেঁচে আছে। একবার ভাবে টাকা তো আছেই প্যান্টের পকেটে, কয়েক এস্পপুল পেথিডিন কিনে একবার পুশ করলে কেমন হয় শিরায়। মরে যাবার ব্যাপারটি সে বেশ উপভোগ করে। মরে গেলে, ধরা যাক বিছানায় শুয়ে মরে পড়ে আছে, বাড়ির কেউ জানবে না, ভাববে ঘুমিয়ে আছে ছেলে, তাকে বিরক্ত করা ঠিক নয়। একসময় মায়া হয়ত ডাকতে আসবে, দাদা ওঠ, বাবার জন্য আমাদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা কর, দাদা তখন আর সাডা দেবে না। এরকম সে ভাবছে যখন, তখনই বিজয় নগরের মোড়ে দেখে মিছিল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিছিল। হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই জাতীয় শ্লোগান। সুরঞ্জনের ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি খেলে যায়।
বাড়ি যাবার আগে সে গৌতমের বাড়ি যায়। গৌতম শুয়ে ছিল। আগের চেয়ে ভাল এখন। কিন্তু তার চোখে মুখে সেই আশঙ্কাটুকু আছেই। কোথাও শব্দ হলে চমকে ওঠে। সাদাসিধে ছেলে, মেডিকেলে পড়ে, রাজনীতি করে না, পাড়ায় শত্ৰু নেই কোনও, আর তাকেই মার খেতে হল, ভারতের বাবরি মসজিদ কোন ভাঙল সেই অপরাধে!
গৌতমের মা কাছেই বসেছিলেন। কেউ যেন না শোনে এমন সতর্ক কণ্ঠে বললেন–বাবা, আমরা তো চলে যাচ্ছি।
–চলে যাচ্ছেন? সুরঞ্জন চমকে ওঠে।
–হ্যাঁ, বাড়ি বিক্রি করার ব্যবস্থা হচ্ছে।
ওরা কোথায় চলে যাবে তা আর শুনতে ইচ্ছে করে না। সুরঞ্জনের। সে জিজ্ঞেসও করে। না। ওরা কি দেশ ছেড়ে চলে যাবে? বসে থাকলে এই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদটি সুরঞ্জনকে শুনতে হবে বলে সে হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে পড়ে। বলে-যাই। গৌতমের মা বলেন, বস বাবা, যাবার আগে আর দেখা হয়। কিনা। দুটো কথা বলি বস। তাঁর কণ্ঠে দলা পাকানো কান্না।
–না মাসি, বাড়িতে কাজ আছে, যাই। আরেকদিন না হয় আসব।
সুরঞ্জন না মাসির দিকে তাকায়, না গীেতমের দিকে। চোখ নামিয়ে চলে যায়। সে একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে চায়, পারে না।
লজ্জা (০৫) বিরূপাক্ষ সুরঞ্জনের পার্টির ছেলে
৫ক.
বিরূপাক্ষ সুরঞ্জনের পার্টির ছেলে। নতুন ঢুকেছে। বেশ মেধাবী ছেলে। সুরঞ্জন তখনও বিছনা ছাড়েনি, বিরূপাক্ষ ঢোকে।
—দশটা বাজে এখনও ঘুমোচ্ছেন?
–ঘুমোচ্ছি। কই। শুয়ে আছি। কিছুই করার না থাকলে শুয়ে থাকতেই হয়। আমাদের তো আর মসজিদ ভাঙার সাহস নেই। তাই শুয়ে থাকতেই হবে।
–ঠিকই বলেছেন। শত শত মন্দির ভাঙছে ওরা। যদি আমরা একটা চিল ছুঁড়ি কোনও মসজিদে, কী উপায় হবে! চারশ বছরের পুরনো রমনা কালীবাড়িটি পাকিস্তানিরা ধুলোয় মিশিয়ে দিল, কোনও সরকারই তো বলেনি ওটি গড়ে দেবে!
—হাসিনা বার বার বলছেন বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষতিপূরণের কথা বললেও ভাঙা মন্দির পুনর্নির্মাণের কথা কিন্তু একবারও বলেননি। বাংলাদেশের হিন্দুরা বানের জলে ভেসে আসেনি। তারা এ দেশের নাগরিক। তাদের বেঁচে থাকবার অধিকার, নিজের জীবন, সম্পত্তি, উপাসনালয় রক্ষা করবার অধিকার কারও চেয়ে কম নয়।
–কেবল কি বাবরি মসজিদ ইস্যু নিয়ে ওরা লুটপাট ভাঙচুর করে? বিরানব্বইয়ের একুশে মার্চ ভোরবেলা বাগেরহাটের বিশারিহাটা গ্ৰাম থেকে কলিন্দ্রনাথ হালদারের মেয়ে পুতুল রানীকে ওই এলাকারই মোখলেসুর রহমান আর চাঁদ মিয়া তালুকদার কিডন্যাপ করেছে। পটুয়াখালির বগা ইউনিয়নের ইউ পি চেয়ারম্যান ইউনুস মিয়া আর ইউ পি সদস্য নবী আলি মৃধার অত্যাচারে গ্রামের মণি আর কানাই লালের পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। রাজনগর গ্রামের বীরেনের জমি দখল করার জন্য বীরেনকে ধরে নিয়ে যায়, আজও বীরেনের কোনও খবর পাওয়া যায়নি। সুধীরের জায়গা জমি দখল করার জন্য অত্যাচার চালালে সুধীরও দেশ ত্যাগ করে। সাবুপুরা গ্রামের চন্দন শীলকে চেয়ারম্যান নিজেই ধরে নিয়ে যায়। আজও তার কোনও খোঁজ নেই। বামনকাঠি গ্রামের দীনেশের কাছ থেকে জোর করে সাদা স্ট্যাম্পে সই নিয়েছে। বগা গ্রামের চিত্তরঞ্জন চক্রবতীর ক্ষেতের ধান কেটে নিয়ে যায়। চিত্তবাবু মামলা করলে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। এমনকি মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছে।
