সুরঞ্জন দাঁতে দাঁত চেপে সোফার হাতলটি চেপে ধরে। পুলকও কেমন হতভম্ব বসে থাকে। নীলা ভাত তরকারি গরম করে টেবিলে দেয়। কষ্ট-কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে–সুরঞ্জনদা, সারাদিন কিছুই খাননি?
সুরঞ্জন ম্লান হাসে। বলে–আমার আবার খাওয়া। আমার খাওয়ার জন্য ভাবে কে বল।
—বিয়ে-টিয়ে করে নেন।
–বিয়ে? সুরঞ্জন বিষম খায়। —আমাকে কে করবে বিয়ে?
—সেই পারভিনের কারণে বিয়ে থেকেই মন উঠে গেল? এ কিন্তু ঠিক না।
—না না। তা হবে কেন? আসলে বিয়ে যে করতে হবে এ আমি এতদিন ভুলেই বসেছিলাম।
কষ্টের মধ্যেও পুলক আর নীলা হাসে।
সূরঞ্জনের তেমন রুচি নেই খাবারে। তবু সে ক্ষিদেটাকে চাপা দেবার জন্য খায়।
—আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পারবে পুলক? খেতে খেতেই সে জিজ্ঞেস করে।
–কত টাকা?
—যত পারে। বাড়িতে কেউ আমাকে কিছু জানাচ্ছে না। টাকা পয়সা দরকার কি না। কিন্তু টের পাচ্ছি মা’র হাত খালি।
–তা না হয় দিচ্ছি। দেশের খবর জানো তো? ভোলার, চট্টগ্রামের, সিলেটের? কক্সবাজারের? পিরোজপুরের?
–এই তো বলবে যে সব মন্দির ভেঙে গুড়িয়ে ফেলেছে। হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুট করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে। পুরুষদের মেরেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে। এ ছাড়া নতুন কোনও খবর থাকলে বল।
—এগুলো তোমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
—নিশ্চয় স্বাভাবিক। কী আশা কর তুমি এই দেশ থেকে? পিঠ পেতে বসে থাকবে আর তারা কিল দিলে গোসা করবে, এ তো ঠিক নয়।
খাবার টেবিলে সুরঞ্জনের মুখোমুখি চেয়ারে বসে পুলক। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলে—সিলেটে চৈতন্যদেবের বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছে। পুরনো লাইব্রেরীটিও রাখেনি। সিলেট থেকে আমার দাদা এসেছে। কালীঘাট কালীবাড়ি, শিকবাড়ি, জগন্নাথ আখড়া, চালি বন্দর ভৈরব বাড়ি, চালি বন্দর শ্মশান, ষন্তরীপুর মহাপ্রভুর আখড়া, মীরা বাজার রামকৃষ্ণ মিশন, মীরা বাজার বলরামের আখড়া, নির্মলবালা ছাত্রাবাস, বন্দর বাজার ব্রাহ্ম মন্দির, জিন্দাবাজার জগন্নাথের আখড়া, গোবিন্দজীর আখড়া, লামা বাজার নরসিংহের আখড়া, নয়া সড়ক আখড়া, দেবপুর আখড়া, টিলাগড় দুৰ্গাবাড়ি, বিয়ানি বাজার কালীবাড়ি, ঢাকা দক্ষিণ মহাপ্রভুর বাড়ি, গোটাটিকর শিব বাড়ি, মহালক্ষ্মী বাড়ি মহাপীঠ, ফেঞ্চুগঞ্জ, সারকারখানা দুৰ্গর্বিাড়ি, বিশ্বনাথে শাজিবাড়ি, বৈরাগী বাজার আখড়া, চন্দগ্রাম শিব মন্দির, আকিলাপুর আখড়া, কোম্পানিগঞ্জ জীবনপুর কালীবাড়ি, বালাগঞ্জ যোগীপুর কালীবাড়ি, জকিগঞ্জ আমলসী কালীমন্দির, বারহাটা আখড়া, গাজীপুর আখড়া, বীরশ্ৰী আখড়া ভেঙে আগুন লাগিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। বেণুভূষণ দাস, সুনীল কুমার দাস, কানুভুষণ দাস আগুনে পুড়েছে।
—তাই নাকি?
—ক’ত যে কাণ্ড হচ্ছে সুরঞ্জন, আমরা এ দেশে থাকব কি করে বুঝি না। চট্টগ্রামে তো জামাত আর বি এন পি মিলে বাড়িঘর মন্দির পুড়িয়েছে। হিন্দুদের ঘটিবাটি, পুকুরের মাছ পর্যন্ত ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। সাত-আট দিন পেটে ভাত নেই হিন্দুদের। সীতাকুণ্ডের খাজুরিয়া গ্রামের কানুবিহারী নাথ আর তার ছেলে অৰ্জ্জুন বিহারী নাথের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে জামাত শিবিরের লোকেরা বলেছে বিশ হাজার টাকা না দিতে পারলে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে না। তারা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মীরেরসরাই কলেজের অধ্যাপকের মেয়ে উৎপলা রানী ভৌমিককে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিয়ে যায়, ফেরত দেয় শেষ রাতে। আচ্ছা বল তো এসবের প্রতিবাদ কি আমরা করব না?
—করলে কি হবে জানো? ডি এল রায়ের কবিতাটা জানো তো, আমি যদি পিঠে তোর ঐ লাথি একটা মারিই রাগে, তোর তো স্পর্ধা বড় পিঠে যে তোর ব্যথা লাগে?
সুরঞ্জন সোফায় হেলান দেয়। চোখ বোজে।
–ভোলায় তো কয়েক হাজার বাড়ি লুট হয়েছে, কয়েক হাজার বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আজ সকালে কার্ফ ভেঙেছিল বারো ঘন্টার জন্য। তিনশ লোক শাবল কুড়াল নিয়ে লক্ষ্মী নারায়ণ আখড়ায় থার্ড টাইম হামলা করে। পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বোরহানউদ্দিনে দেড় হাজারের বেশি ছাই হয়ে গেছে। দু হাজার বাড়ির ক্ষতি হয়েছে। তজমুদ্দিনে ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে দু হাজার দুশ, অর্ধেক ধ্বংস দু হাজার। ভোলায় মন্দির ধ্বংস করেছে। দুশ ষাটটি।
সুরঞ্জন হেসে বলে—একদমে রিপোর্টারের মত কথা বলে গেলে। তোমার বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছে এসব ঘটনায়?
পুলক অবাক চোখে তাকায় সুরঞ্জনের দিকে। বলে—তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
সুরঞ্জন ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। বলে—একবিন্দু না। কষ্ট হবে কেন?
পুলক সামান্য চিন্তিত হয়। বলে—আসলে ওদিকে আমার অনেক আত্মীয় আছেন তো, খুব ভাবনা হচ্ছে ওদের জন্য।
—মুসলমানের কাজ মুসলমান করেছে, আগুন দিয়েছে ঘরে, তাই বলে কি মুসলমানের ঘর পোড়ানো হিন্দুর শোভা পায়? তোমাকে আমি কোনও রকম সাল্কনা দিতে পারছি না পুলক। আই অ্যাম সরি।
পুলক দু হাজার টাকা ভেতর ঘর থেকে নিয়ে সুরঞ্জনের হাতে দেয়। টাকা কটি পকেটে পুরে সুরঞ্জন বলে–অলকের খবর কি, খেলায় নিয়েছে। ওকে?
–না। সারাদিন সে মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকে। করার কিছু নেই। ও জানোলা দিয়ে দেখছে ওর বন্ধুরা মাঠে খেলছে। ও একা একা ঘরে ছটফট করে।
—শোন পুলক, যাদের অসাম্প্রদায়িক ভাবি, নিজেদের মানুষ ভাবি, বন্ধু ভাবি, তারা ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িক। এ দেশের মুসলমানের সঙ্গে এমন ভাবে মিশেছি যে আমরা এখন অনর্গল আসসালামু আলায়কুম বলি, খোদা হাফেজ বলি, জলকে পানি বলি, স্নানকে গোসল বলি, যাদের রমজান মাসে আমরা বাইরে চা সিগারেট খাই না, এমন কি প্রয়োজনে হোটেল রেস্তোরাঁয় খেতে পারি না দিনের বেলা, তারা আসলে আমাদের কতটুকু আপন? কাদের জন্য আমাদের এই স্যাক্রিাফাইস, বল? পুজোয় কদিন ছুটি পাই? আর দুটো ঈদে তো সরকারি হাসপাতালগুলোয় ঘাড় ধরে হিন্দুদের দিয়ে কাজ করানো হয়। অষ্টম সংশোধনী হয়ে গেল, আওয়ামি লিগ কদিন চেঁচালো ব্যাস, হাসিনা নিজেই তো এখন মাথা ঢেকেছে ঘোমটায়। হজ্ব করে আসার পর চুল দেখা যায় না। এমন ঘোমটাই দিয়েছিল। সবার চরিত্র এক পুলক, সবার। এখন আমাদের সবার হয় আত্মহত্যা করতে হবে, নয় দেশ ছাড়তে হবে।
