–পালিয়ে যাবে কোথায়?
—দুরে কোনও পাহাড়ের কাছে।
—পাহাড় পাবে কোথায়? পাহাড় পেতে হলে সিলেট নয় চট্টগ্রাম যেতে হয়।
–তাই যাব। পাহাড়ের ওপর ঘর বানিয়ে থাকব।
—খাবে কি? লতাপাতা?
পারভিন হেসে গড়িয়ে পড়ত সুরঞ্জনের গায়ে। বলত—তোমাকে ছাড়া আমি মরেই যাব।
–এরকম কথা মেয়েরা বলে, আসলে কিন্তু মরে না।
ঠিকই তো বলেছিল সুরঞ্জন। পারভিন মরেনি। বরং বাধ্য মেয়ের মত বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। বিয়ের দুদিন আগে জানিয়েছিল, বাড়িতে বলছে তোমাকে মুসলমান হতে হবে। সুরঞ্জন হেসে বলেছিল–আমি নিজে ধর্ম টর্ম মানি না। সে তো তুমি জানোই।
—না তোমাকে মুসলমান হতে হবে।
—আমি মুসলমান হতে চাই না।
–তার মানে তুমি আমাকে চাও না?
–নিশ্চয়ই চাই। কিন্তু সেজন্য আমাকে মুসলমান হতে হবে এ কেমন কথা?
পারভিনের ফর্সা মুখ মুহুর্তে লাল হয়ে উঠেছিল অপমানে। সুরঞ্জন জানত তাকে ত্যাগ করবার জন্য পরিবার থেকে পারভিনের ওপর চাপ আসছে। তার খুব জানতে ইচ্ছে করে হায়দার তখন কোন পক্ষে ছিল। হায়দার পারভিনের ভাই, এদিকে আবার সুরঞ্জনের বন্ধু। সে সব সময় নীরব থেকেছে৷ তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে। নীরব থাকাটা সুরঞ্জনের তখন একদমই পছন্দ ছিল না। যে কোনও একটি পক্ষ তো নেওয়া উচিত। হায়দারের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডাগু হত তখন, পারভিন প্রসঙ্গে কোনও কথা হত না। হায়দার যেহেতু প্রসঙ্গ তুলত না, সুরঞ্জনও তুলত না।
পারভিনের একদিন বিয়ে হয়ে গেল এক মুসলমান ব্যবসায়ীর সঙ্গে। সুরঞ্জন যেহেতু মুসলমান হল না সম্ভবত পারভিনও তাই তাকে নিয়ে পাহাড়ে যাবার স্বল্প বিসর্জন দিল। স্বল্প কি এত সহজে পুজোর মূর্তির মত হাসি আনন্দ শেষ হলে ভাসিয়ে দেওয়া যায় জলে! পারভিন যেমন দিয়েছিল? সুরঞ্জনের ধর্মই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পারভিনের পরিবারে।
আজ সকালে হায়দার বলেছে–পারভিন বোধহয় ডিভোর্স দেবে তার হাসবেন্ডকে।
দু বছরের মধ্যেই ডিভোর্স? সুরঞ্জন বলতে চেয়েও বলেনি। সে পারভিনকে তো ভুলেই গিয়েছিল, তবু ডিভোর্সের খবরটি শুনে বুকের মধ্যে ধ্বক করে ওঠে। পারভিন নামটি কি খুব যত্ন করে বুকের সিন্দুকে রাখা নেপথলিন দিয়ে? বোধহয়। কতদিন সে পারভিনকে দেখে না। বুকের ভেতর কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে। সে ইচ্ছে করেই রত্নীর মুখটি মনে করে। রত্না মিত্র। মেয়েটি চমৎকার। সুরঞ্জনের সঙ্গে মানাবেও ভাল। পারভিন ডিভোর্স দেবে তাতে সুরঞ্জনের কী। মুসলমানের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, পরিবারের পছন্দের বিয়ে, জাত ধর্ম মিললেই বুঝি বিয়ে টেকে? তবে ফেরত আসতে হয় কেন এখন? পাহাড়ে ওঠেনি। স্বামী তাকে নিয়ে? স্বপ্ন পূরণ করেনি? সে বেকার হিন্দু ছেলে, উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়, সে কি আর বিয়ের পাত্র হিসেবে ভাল? সুরঞ্জন একটি ক্লিক্সা নেয় টিকাটুলির মোড়ে উঠে। বুকের সিন্দুক থেকে আরশোলার মত বারবারই লাফিয়ে উঠছে পারভিনের মুখ। পারভিন তাকে চুমু খেত, সে পারভিনকে জড়িয়ে ধরে বলত–তুমি একটা পাখি, চড়ুইপাখি।
পারভিন হেসে গড়িয়ে পড়ত, বলত–তুমি একটা বানর।
আচ্ছা সে কি আসলেই একটা বানর? বানর না হলে পাঁচ বছরে সে যা ছিল তাই কি আর থেকে যায়। বয়স ভেসে গেছে। কচুরিপানার মত, তার পাওয়া হয়নি কিছু। কেউ এসে পারভিনের মত বলেনি-তোমাকে খুব ভাল লাগে আমার। পারভিন যেদিন এই কথা বলেছিল, পারভিনকে সেদিন সে বলেছিল—কারও সঙ্গে বাজি হয়েছে বুঝি?
–মানে?
–এই কথাটি আমাকে বলতে পারো কি না এই নিয়ে?
–মোটেও না।
—তবে কি মন থেকে বলছি?
–আমি মন থেকে ছাড়া কথা বলি না।
সেই ঘাড় শক্ত মেয়েটি বাড়িতে বিয়ের কথা উঠল আর ভেঙে পড়তে লাগল, উৰে গেল তার অদ্ভুত অদ্ভুত স্বল্প আর মন যা চাইবে তা করবার ইচ্ছে। তাকে ধরে বেঁধে যেদিন বিয়ে দিয়ে দিল, পারভিন তো একবারও বলেনি। আমি ওবাড়ির বানরকে বিয়ে করব। দু বাড়ি পার হলেই হায়দারদের বাড়ি, বিয়েতে মায়া গিয়েছিল, কিরণময়ীও, সুরঞ্জন যায়নি।
রিক্সাকে চামেলিবাগের দিকে যেতে বলে। সন্ধে নামছে। ক্ষিদেয় পেট কামড়াচ্ছে। বুক জ্বলা রোগ তার আছেই, টক ঢেকুর ওঠে। সুধাময় এন্টাসিড খেতে বলেন। ঠোঁট সাদা করে ট্যাবলেট খেতে তার বিচ্ছিরি লাগে! তা ছাড়া মনেও থাকে না পকেটে ওষুধ নিয়ে বেরোতে। পুলকের বাড়ি গিয়ে কিছু খেতে হবে। পুলককে ঘরেই পাওয়া যায়। সে পাঁচ দিন ঘর বন্দি, দরজায় তালা দিয়ে ঘরে বসে থাকে। ঘরে ঢুকেই সুরঞ্জন বলে—কিছু খাবার দাও। বাড়িতে বোধহয় রান্না-টান্না কিছু হয়নি আজ।
–কেন রান্না হয়নি?
–ডাঃ সুধাময় দত্তের ষ্ট্রেক হয়েছে। তাঁর স্ত্রী কন্যা আপাতত তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত। এককালের ধনাঢ্য সুকুমার দত্তের পুত্র সুধাময় দত্ত এখন নিজের চিকিৎসার খরচ যোগাতে পারেন না।
–আসলে তোমার কিছু করা উচিত ছিল। চাকরি টাকরি।
–মুসলমানের দেশে চাকরি পাওয়া খুব কঠিন। আর এই মূর্খদের আন্ডারে চাকরি করব কি বল!
পুলক বিস্মিত হয়, সুরঞ্জনের আরও কাছে সরে আসে, বলে–তুমি মুসলমানদের গাল দিচ্ছ সুরঞ্জন?
–ভয় পাচ্ছ কেন? গাল তো তোমার সামনে দিচ্ছি, ওদের সামনে তো আর দিচ্ছি। না। সামনে ওদের গাল দেওয়া কি সম্ভব? ধড়ে কি তবে মুণ্ডুটি থাকবে?
