–না।
মায়ার যেন কেমন করে উঠেছিল মন। দেশের বড় একটি স্কুলের এসেম্বলিতে মুসলমানের ধর্ম পালন হয়, আর সেই স্কুলের হিন্দু মেয়েদেরও নীরবে সেই ধর্ম পালনে অংশগ্ৰহণ করতে হয়-এ নিশ্চয়ই এক ধরনের অনাচার।
মায়ার আর একটি টিউশনি ছিল, পারুলেরই আত্মীয় হয় মেয়েটি, সুমাইয়া, ও একদিন বলল-দিদি, আপনার কাছে আর পড়ব না।
–কেন?
–আব্বা বলেছেন একজন মুসলমান টিচার রাখবেন।
–ও আচ্ছা।
টিউশনি দুটো যে আর নেই মায়া বাড়ির কাউকে জানায়নি সে কথা। সুরঞ্জন সংসার থেকে নিচ্ছে, এখন মায়াকেও যদি হাত পাততে হয়, কিরণময়ী সামলাবেন কী করে! সংসারের এত বড় একটি দুর্ঘটনার ওপর সে আর এই দুঃসংবাদটি পাড়ে না।
কিরণময়ীও চুপ হয়ে গেছেন। হঠাৎ। নিঃশব্দে দুটো ডাল ভাত রাঁধেন। সুধাময়ের জন্য ফলের রস, সুপ করতে হয়। ফলই বা কে এনে দেবে এত, সুরঞ্জন সারাদিন শুয়ে থাকে, মানুষ এত শুয়ে থাকতে পারে! মায়ার খানিকটা অভিমােনও আছে দাদাকে নিয়ে। সাত তারিখে এত সে বলেছে—দাদা, চল কোথাও যাই বাড়ি ছেড়ে, সে গা করল না। এখনও কি আর বিপদ কেটে গেছে? বাড়ির সবার নির্লিপ্তি দেখে মায়াও অনেকটা নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। সেও ভাবতে চাচ্ছে যা হয় হোক আমার কী। সুরঞ্জনই যদি না ভাবে মায়া একা ভেবে কী করবে!! তার তো এমন কোনও বন্ধু নেই। যেখানে সবাই মিলে উঠতে পারে। পারুলের বাড়িতেই তার অস্বত্তি হচ্ছিল। এমনিতে পারুল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন, দিন রাত ওবাড়িতে কেটেছে তার আড্ডা দিয়ে, কেউ কখনও প্রশ্ন করেনি ও কেন এসেছে। কিন্তু সেদিন, মায়া এত চেনা ওবাড়িতে, তবু ওরা অচেনা চোখে তাকাল তার দিকে, এত যায় সে ওবাড়িতে, তবু চোখে চোখে প্রশ্ন ছিল কেন এসেছে। পারুল অবশ্য বারবারই বলেছে-এ সময় ওর বাড়িতে থাকা নিরাপদ না।
নিরাপদ অনিরাপদের কথা কেবল মায়াকে নিয়ে ওঠে, কই পারুলকে নিয়ে তো ওঠে। না! পারুলকে কি কখনও বাড়ি ছেড়ে মায়ার বাড়িতে উঠতে হবে? মায়া কুষ্ঠিত হয়, কুঞ্চিত হয়, তবু বেঁচে থাকবার প্রয়োজনে সে পারুলের বাড়িতেই অবাঞ্ছিত অতিথির মত পড়ে থেকেছে। পারুল আতিথেয়তা কম করেনি তবু তার আত্মীয়রা বেড়াতে এসে অনেকেই যখন জিজ্ঞেস করেছে–কী নাম তোমার?
—মায়া।
-পুরো নাম কি?
পারুল মায়াকে পুরো নাম বলতে না দিয়ে নিজে বলেছে–ওর নাম জাকিয়া সুলতানা।
মায়া চমকেছে নাম শুনে। পরে আত্মীয়রা বিদেয় হলে পারুল বলেছে—তোর নাম মিথ্যে বলতে হল, কারণ এরা আবার অন্যরকম, মুন্সি টাইপের। বলে বেড়াবে আমরা হিন্দুদের শেল্টার দিচ্ছি।
–ও।
মায়া বুঝেছে। কিন্তু মনে খুব কষ্ট হয়েছে তার। হিন্দুকে শেল্টার দেওয়া বুঝি অন্যায় কাজ? আর আরেকটি প্রশ্নও তাকে প্রায় রাতেই ঘুমোতে দেয়নি যে হিন্দুকে কেন শেল্টার দিতে হয়? মায়া ইন্টারমিডিয়েট স্টার পাওয়া মেয়ে, আর পারুল সাধারণ দ্বিতীয় বিভাগ। তবু প্রায়ই মনে হয় পারুল বুঝি তাকে করুণা করছে।
–বাবা, আঙুলগুলোকে মুঠি কর তো। হাত একটু ভুলতে চেষ্টা করে তো।
মায়ার কথা লক্ষ্মী ছেলের মত শোনেন সুধাময়। মায়ার মনে হয় একটু একটু জোর ফিরছে। সুধাময়ের আঙুলে।
–দাদা কি খাবে না?
—কি জানি, ঘুমোচ্ছে দেখলাম। কিরণময়ী বিরস মুখে বলেন।
কিরণময়ী নিজে খান না। মায়ার জন্য ভাত বেড়ে রাখেন। দরজা জানোলা বন্ধ করা ঘর, আঁধার আঁধার লাগে। মায়ারও ঘুম ঘুম লাগে। হঠাৎ আধা-স্কুমেই চমকে ওঠে মিছিলের শব্দ শুনে। মিছিল যায়-হিন্দু যদি বাঁচতে চাও, এ দেশ ছেড়ে চলে যাও। ‘ সুধাময়ও শোনেন, মায়ার হাতে ধরা ছিল সুধাময়ের হাত, হাতটি তার কেঁপে ওঠে, সে টের পায়।
৪ঘ.
সুরঞ্জনের পেট মোচড় দিয়ে ওঠে ক্ষিদেয়। আগে তো খাক না খাক টেবিলে তার ভাত বাড়া থাকত। সে আজ কারও কাছেই বলবে না ক্ষিদের কথা। পাকা উঠোনের কলতলায় গিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে তারে ঝোলানো তোয়ালে দিয়ে মুখ মেছে। ঘরে এসে শার্ট পাল্টে বেরিয়ে যায় বাইরে। বাইরে যে বেরোয় সে ভেবে পায় না যাবে কোথায়? হায়দারের বাড়িতে? হায়দারের তো এ সময় বাড়ি থাকবার কথা নয়। তবে কি বেলাল, কামাল কারও বাড়িতে? সুরঞ্জন এদের বাড়িতে গেলে ওরা যদি ভাবে বিপদে পড়েছে বলে এসেছে আশ্রয় বা অনুকম্প চাইতে? না সুরঞ্জন যাবে না। সে সারা শহর ঘুরে বেড়াবে একা একা। শহরটি তো তার নিজেরই। একসময় সে ময়মনসিংহ ছেড়ে আসতে চায়নি, আনন্দমোহনে বন্ধুবান্ধব ছিল প্রচুর, ওদের ছেড়ে হঠাৎ করে নতুন একটি শহরে কেন আসতে চাইবে সে। কিন্তু কোনও এক গভীর রাতে রইসউদ্দিনের কাছে বাড়ি যখন বিক্রি করে এলেন সুধাময়, তার পরদিন ভোরে সুরঞ্জন জানত না তার জন্মের এই বাড়িটি, কামিনী ফুলের গন্ধ ভরা, স্বচ্ছ পুকুরে সাঁতার কাটা দত্ত বাড়িটি আর তাদের নেই। সুরঞ্জন যখন শুনল এ বাড়ি তাদের ছেড়ে দিতে হবে সাত দিনের মধ্যে, অভিমানে সে বাড়িই ফেরেনি দুদিন।
সুরঞ্জন বুঝে পায় না। এত অভিমান কেন তার। বাড়ির সবার ওপর তা ছাড়া নিজের ওপরও মাঝে মধ্যেই তার তীব্র অভিমান হয়। পারভিনের ওপরও অভিমান হত তার। মেয়েটি তাকে ভালবাসত, লুকিয়ে চলে আসত তার ঘরে, বলত–চল পালাই।
